জনগণই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উৎস!

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ
11

সৈয়দ আবুল মকসুদ আমার খুব প্রিয় লেখক তাঁর লেখায় রসবোধ থাকার কারণে বেশি ভাল লাগে। প্রথম আলোয় তাঁর লেখা ‘বিতর্কে শেষ সময়’ পড়ছিলাম। সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়েই লেখা। পাঠকের জন্য তাঁর লেখা থেকে কিছু অংশ উল্লেখ করলাম। বাঙালির অভিনবত্বের অন্ত নেই।

একমাত্র আমাদের প্রজাতন্ত্রেই রয়েছে বিশ্বের প্রথম পাতানো বিরোধী দল। পাতানো বিরোধী দলের মাননীয় সাংসদ এবারও মনোনয়ন পেলেন। একই আসনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী কুতুবউদ্দীন আইবেক এবং বিএনপির প্রার্থী ইকতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজী। সেখানে ডিসি এসপির বিপন্নতার শেষ নেই। সাংসদের সার্কিট হাউস ও পুলিশ প্রটেকশন প্রাপ্য। ওদিকে আইবেক সাহেব কোনো অনুমতির তোয়াক্কা না করেই সার্কিট হাউসের সব কক্ষ দখল করে ফেলবেন। তাঁর কর্মীদের মোটর সাইকেলে সার্কিট হাউসের চত্বর ভরে যাবে। বাগানের ফুল গাছগুলো সব শেষ। দখলকৃত সার্কিট হাউসের কক্ষগুলো থেকে তাঁকে সরানো কোন এনডিসির পক্ষে অসম্ভব। ওদিকে বিএনপির বখতিয়ার খিলজীর দিকে ঘোর আওয়ামী পন্থী ডিসিও যদি তাকান এবং সার্কিট হাউসে তাঁর রাত যাপনের ব্যবস্থা করেন রাত পোহানোর আগেই রটে যাবে তাঁর বাবা ছিলেন রাজাকার। অথচ তাঁর বাবা একজন ‘বীর প্রতীক তাঁর পরিবারে রয়েছে দুজন শহীদ।’ নষ্ট রাজনীতির কারণে যদি হাজার বছরের বাঙালি সমাজের রীতিনীতি শিষ্টাচার নষ্ট হয়ে যায়, সামাজিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে তার পরিণতি ভয়াবহ ক্ষতিকর।

নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। গণতন্ত্রে নির্বাচনের মূল শক্তিই হচ্ছে জনগণ। দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নিজ নিজ জোটের পরিসর বাড়াতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে। আবার কেউ কেউ তৃতীয় ধারার চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে। নির্বাচনের মূল লক্ষ্য হলো জনগণের প্রতিনিধি বাছাইয়ের সুযোগ। আর সেসুযোগ নিশ্চিত হতে পারে যখন নির্বাচনের একটি সুষ্ঠু ও সুস্থ পরিবেশ থাকবে। প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাবেন। নির্বাচনী প্রচারের ক্ষেত্রে কেউ বাঁধার সম্মুখীন হবেন না। কিন্তু বাস্তবতা হলো মাঠে বিরোধী দলের সুযোগ সীমিত। প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী কারাগারে।

রাজনীতির গতি প্রকৃতি কলাকৌশল সবকিছুই বদলে গেছে। আবারও সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহেবের নিবন্ধে ফিরে আসি। “২০১৬ সালের এপ্রিলে সংশোধিত সংবিধানের আওতায় ভবিষ্যতে যে নির্বাচন হবে, তা হবে পৃথিবীর ইতিহাসে অভিনব পদ্ধতির নির্বাচন। অভিনব সংবিধানে বলা ছিল জাতীয় সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন করতে হবে। এবার সংসদ ভেঙে দেওয়ার কোনো বিধান নেই। সংসদ থাকবে, সাংসদেরা বেতন ভাতা, সুযোগসুবিধা পাবেন। তার মধ্যেই মহাসমারোহে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হবে।”

এই নির্বাচন কেমন হবে? আবারও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো হবে কিনা বিরোধী দলকে আদৌ ছাড় দেবে কিনা গণতন্ত্র, সুশাসন এদেশের মানুষ সহজে দেখবে কিনাএরকম একটি অনিশ্চিত পরিবেশ আমাদের সামনে। সবচেয়ে বড় কথা মানুষ বুঝে ফেলেছে ক্ষমতার নীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একই আদর্শে বিশ্বাসী। ক্ষমতায় যেযায় সে আর ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। মরণ কামড় দিয়ে চেয়ার আটকে রাখে। ৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আমাদের বিস্তর অভিজ্ঞতা হয়েছে। নীতি ও আদর্শ ক্ষমতার প্রশ্নে সব বিসর্জন। আগে গ্রামে গঞ্জে দেখা যেত এক পক্ষ অন্য পক্ষের সাথে তর্কবিতর্কে লিপ্ত হতো। পর্যায়ক্রমে মারামারি সর্বশেষ পরিস্থিতি হচ্ছে যেই দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের লোক ছাড়া বাকীরা সব ফেরারী অথবা জেলে। একদেশ, একদল মোটর সাইকেলের ধুলো উড়িয়ে বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

এরশাদ সাহেবের পতনের পর নির্বাচন আসলে এরশাদ সাহেবের চাহিদা বেড়ে যায় দুই প্রধান দলের কাছে। ৯১ সালের পর থেকে এরশাদ সাহেবকে নিয়ে কম টানা হেঁচড়া হয়নি। অনেক নাটকীয়তা আমরা দেখিছি। সামনে আরও কি হয় দেখার অপেক্ষায়। এটাও সত্য নব্বইয়ের এরশাদের পতনের পরবর্তী সময়ে এককভাবে এই দুই প্রধান দল এককভাবে ক্ষমতায় আসতে পারেনি অন্য দলের সহায়তা নিয়েই ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। এটি যেমন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য সত্য তেমনি বিরোধী দল বিএনপির বেলায়ও প্রযোজ্য। মাঝে মাঝে মনে হয় জনগণ খুব বেশী নির্লিপ্ত। সহিংস রাজনীতির প্রতি মানুষের এক ধরনের বিতৃষ্ণা আছে, ক্ষোভ আছে কিন্তু ঈদ উৎসবের মতো নির্বাচনী উৎসব চায়। নিজের পছন্দমতো সিল মারার অধিকার চায়। চায় গণতন্ত্র, চায় সুশাসন, চায় স্থিতিশীলতা, চায় সহনশীলতা। কিন্তু এটা কীভাবে আসবে বা এটার সহজ কোন সমীকরণ আছে কিনা তাদের জানা নেই। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যাযা করার প্রয়োজন সবই করবে। আর বিএনপি যদি সৌভাগ্যক্রমে ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে আওয়ামী লীগকে কয়েকশ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করবে। আর বিএনপিকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলাম কি করতে পারে সেটা কল্পনা করতেও শিউরে উঠতে হয়। প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে সহজে পারবে বলে মনে হয় না।

অবশ্য রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আমরা আশায় ঘর বাঁধছি নিরাশার বালুচরে। রাজনৈতিক দলের নেতারা জনগণের চাওয়াপাওয়ার বিষয়টি ধারণ করুক। গণতান্ত্রিক দলগুলো গণতান্ত্রিক নীতিমালা সমুন্নত রাখুক। নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের সময় আন্দোলনরত তিন রাজনৈতিক জোট যে পাঁচ দফা রূপরেখা দিয়েছিল সেটা অনুসৃত হলে অনেক রাজনৈতিক সমস্যা সহজে এড়ানো যেত। জনগণই হচ্ছে সকল ক্ষমতার উৎস!

x