জঠরলীনা: দেখার বাইরে অন্য এক দেখা

লুসিফার লায়লা

মঙ্গলবার , ৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ
35

রমা চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে নানাজনের লেখায় ফিরেফিরে এসেছেনে একাত্তরের বীরঙ্গনা, দারিদ্র জর্জরিত অসহায় এবং কোনরকম আনুকূল্যের মুখাপেক্ষি না হওয়া এক নারী হিসেবে। তাকে নিয়ে ব্যাতিক্রম লিখলেন লেখক ফেরদৌস আরা আলীম। তিনি রমাদির আর সবকিছু থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে দৃষ্টি রাখলেন রমা চৌধুরীর লেখক সত্তার উপর। লেখাটা পড়ে এত ভাল লেগেছিল তার কারণ বীরঙ্গনা খেতাব, দুঃখ-জরায় ক্লিষ্ট রমা চৌধুরীর সাধারণ চেহারার আদলে ঢাকা পড়ে যাওয়া লেখক সত্তাটির উপর আলো ফেলেছিলেন ফেরদৌস আরা আলীম। পড়া শেষ করে বার বার মনে হয়েছে কেন এমন করে রমাদিকে দেখিনি এতদিন।
তারও অনেকদিন পরে এসে দৃশ্যশিল্পী দিলারা বেগম জলির ‘জঠরলীনা’ দেখতে গিয়ে সেই একই অনুভূতির ভেতর হেঁটে এলাম। বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী বিষয়বস্তু। আর মাধ্যম হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন চলচ্ছবি। ২০১৩ সালে কাজটি যখন শুরু করেছিলেন রমা চৌধুরী তাঁকে বলেছিলেন তুমি আমাকে নিয়ে কাজ করবে অত সোজা না, তোমার পাঁচ বছর লাগবে! সত্যি তাই হলো। ২০১৩ থেকে ১৮ পুরো পাঁচ বছর লেগেছে ছবিটি গুছিয়ে আনতে। পাঁচ বছর ধরে একটু একটু করে ধারণ করে আটত্রিশ মিনিট তিরিশ সেকেন্ডের ছায়াছবিতে রমা চৌধুরীকে তিনি উপস্থাপন করেছেন। এখানে রমাদি কেবল রোগ দুঃখ শোকে কাতর বীরাঙ্গনা নয়, রমাদি এখানে মৃত আত্মার ভেতর থেকে জেগে ওঠা লড়াকু জীবন। যিনি তার জীবনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর নিজেকে নির্মাণ করা অন্য মানুষ।
যেহেতু এই ছবিটি রমা চৌধুরীর উপর নির্মিত তথ্যবহুল ছবি নয় তাই এটিকে তথ্যচিত্র হিসেবে বলতে চাননি দিলারা বেগম জলি। তাহাদের কথা কিংবা উদ্ভাস শিরোনামের কাজগুলোর মতোই এটাও তার কাজ। ‘জঠরলীনা’ নামের এই ছবিটি তথ্য অনুসন্ধিৎসু দর্শকের জন্যে কেবল আলেখ্য হলেও, সংবেদনশীল দর্শকের কাছে এটি রমা চৌধুরীকে নতুন করে খুঁজে নেবার আখর। এবং সত্যিকার অর্থেই এটি একটি পরীক্ষামুলক তথ্যচিত্র যেখানে রমা চৌধুরীর জীবনের নানান সত্তার ছবি ধরা আছে। যে সত্তাগুলো কেবল বীরঙ্গনা খেতাবের তলায় চাপা পড়ে গিয়ে ধুসর হয়ে পড়েছিল এতদিন।

যদিও ছবির নাম ‘জঠরলীনা’ এবং যুদ্ধে নারীর জঠরের ব্যাবহার নিয়ে একধরনের প্রতিবাদ সেখানে আছে তবু এই ছবিটিকে কেবল নারীবাদী অবস্থান থেকে দেখবার অবকাশ নেই। মুক্তিযুদ্ধে রমা চৌধুরী যে বর্ণনাতীত যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে গেছেন যুদ্ধ পরবর্তী সময়েও সে দুঃসময় তাঁকে ছেড়ে যায়নি। যুদ্ধ শেষ হয়েছে কিন্তু তার লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। তাঁকে তার জীবন যাপনের লড়াইয়ের ময়দানে ক্রমাগত লড়ে গিয়ে জানান দিতে হয়েছে তার অবস্থান। আর এই লড়াই তার জীবন বোধকে শাণিত করেছে প্রতিপদক্ষেপে। শিল্পী দিলারা বেগম জলি রমা চৌধুরীর লড়াকু জীবন থেকে লব্ধ অভিজ্ঞতার উপর তার আলো ফেলেছেন। যে আলোতে রমা চৌধুরী একজন মানবিক বোধে উদ্ভাসিত সতন্ত্র সত্তা। যে সত্তার স্বত:স্ফূর্ত উচ্চারণ আমরা পাই তার ব্যাক্তিগত চিঠিতে। ‘ আমি ভালবাসি এই সংসারের কর্মব্যাস্ততা আর মানুষ। ভালবাসি চন্দ্র, সূর্য, আকাশ ও সমুদ্র, ভালবাসি সব। পৃথিবী আমার দেশ, মানুষ আমার জাতি। ভালবাসা আর সাম্য আমার ধর্ম। আমি আর্য অনার্য বা নিগ্রো কোনটাই নই। আমি মানুষ, আমার রক্তের রঙ লাল।’ একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের যুদ্ধ আক্রান্ত নারীর এমন সাম্যবাদী উচ্চারণ খুব সহজ নয়। এই লাইনগুলোই রমা চৌধুরীর স্বতন্ত্র জীবন বোধের সাক্ষী হয়ে থেকে যাবে।
তথ্যচিত্রের একটি ছোট্ট অংশে পারফরমেন্সের মধ্য দিয়ে নিজেকে যুক্ত করেছেন শিল্পী। যুদ্ধের ভয়াবহতাকে ধরতে গিয়ে, রমাদির কানের পাশে অল্পকটা চুলের ভেতর খেলতে থাকা হাওয়াকে হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ার রূপ দিয়ে তার ভেতর যে ভয় জাগানো অশরীরী তান্ডব আমরা ছবিতে দেখতে পাই সেই দৃশ্যে শিল্পী নিজে অভিনয় করেছেন। এই দৃশ্যটির অর্থপুর্ণ উপস্থাপন ছিল ভীষণ প্রাসঙ্গিক এবং শিল্পীর নিজের এইভাবে নিজেকে যুক্ত করাটা ছবিটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাঁর প্রতি হয়ে যাওয়া নির্মমতার কথা বলতে গিয়ে রমাদি এক জায়গায় বলেছেন ‘ পাকিস্তানী আর্মি আমার শরীরি মৃত্যু না ঘটালেও আমার আত্মার মৃত্যু ঘটিয়েছে।’ এত গভীর এই লাইনটির অনুরণন। আমরা তো কেবল হিসেব রেখেছি তিরিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ নির্যাতিতার, আমরা তো ভেবে দেখিনি এই সব মৃত আত্মার কথা। ভেবে দেখিনি মৃত আত্মা নিয়ে শরীরি বেঁচে থাকার কি নিদারুণ মুল্য তাদের দিতে হয়েছে। ধর্মযুদ্ধই হোক বা স্বাধীনতা সংগ্রাম অথবা গৃহযুদ্ধ, সব কালে সব যুগে যুদ্ধে নারীকে ব্যাবহারের আদিমতম বর্বর রীতি আজও একই নির্মমতা নিয়েই টিকে আছে। সারা পৃথিবী জুড়ে এখন যুদ্ধে নারীকে ব্যাবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছে। সেদিক থেকে এই ছবিটিও সেই প্রতিবাদে সামিল।
প্রায় ঊনচল্লিশ মিনিটের ছবিটায় রমা চৌধুরীর জীবনের অভিজ্ঞতা আর স্মৃতিতে ঠাসা। সেই জীবনের গল্পের ভেতর যুদ্ধের সময়কার পোষা ময়নার কথা উঠে এলে আমাদের একটু থামতে হয়। পাখিটির আসল মালিক পাখিটিকে ফেরত চেয়ে না পেয়ে ফিরে আসার সময় পাখিটি যখন তার মালিককে ডেকে বলে ‘মা ওরা আমারে আল্লাহ ডাকতে শিখাইসে।’ পোষা পাখিটিও যেন মুক্তি পায়না এই ধর্মীয় আগ্রাসন থেকে। যুদ্ধ পরবর্তী সেই বাস্তবতা থেকে আমরা কি আসলেই এগিয়েছি? বরং ধর্মীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে আমাদের চারপাশ। তবু যুদ্ধে বিধ্বস্ত মন শরীর আর পোড়াভিটে মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রবল বর্ষণ শেষে আধপোড়া ফলের বীজ থেকে চারা গজিয়ে ওঠার ভেতর জীবনের অনিবার্যতাই যেন ঘোষিত হয়। ধ্বংসযজ্ঞের ভেতর দাঁড়িয়েও তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। লেখক সত্তা তাঁর সঞ্জীবনী। শিক্ষিকা চরিত্র তাঁর ব্যাক্তিগত দৃঢ়তার হাতিয়ার।
রমাদির নানান সময়, তাঁর মনের অবস্থা এবং তাঁর পরিবেশের সাথে তাঁর সম্পৃক্ততাকে শিল্পী এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তা কোথাও গিয়ে কোন গগনবিদারী চিৎকারে পরিণত না হয়। পুরো ছবি জুড়ে শিল্পীর উপলব্ধি এবং উপস্থাপনের সাযুজ্য দর্শকের ভাবনাকে আলাদা পরিসর করে দেবে। রমা চৌধুরীর ভাবনা, দর্শন, তার জীবনযাপনকে ঘিরে কোনো তাড়াহুড়ো করেননি জলি বরং দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একটু একটু করে দৃশ্যায়নের কাজটি করতে গিয়ে রমা চৌধুরীর জীবন যাপনকে ব্যাক্তিগত উপলব্ধিতে নেবার আন্তরিক প্রয়াস ছিল কাজে। পুরো ছবিতে শিল্পীর চমৎকার পরিমিতি বোধের পরিচয় মেলে।
তথ্যচিত্রটির সাবটাইটেলে মৌসুমি ভৌমিকের গাওয়া ‘না ফোটা ফুল’ আর চিত্রাদেব বর্মনের গাওয়া রাধা রমনের গানটি ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে। ছবিটির সঙ্গীত আয়োজন করেছেন সুকান্ত মজুমদার। আউটডোরের কোন কোন দৃশ্যায়ন একটু বাহুল্য মনে হলেও ইনডোরের দৃশ্যায়ন অসাধারণ। আলোর ব্যাবহার চোখে পড়বার মতোই চমৎকার। ছবির এসব ভিডিওচিত্র ধারণ করেছেন পংকজ চৌধুরী রনি। আর ছবিটি সম্পাদনাও প্রশংসার দাবি রাখে। সম্পাদনার কাজটি করেছেন হাবিবুল বাশার পাপ্পু।
তথ্যচিত্রের নানান পরীক্ষামূলক কাজ হচ্ছে দুনিয়া জুড়ে। কেবল তথ্য নির্ভরতা বা রিপোটিং-এর জায়গা থেকে সরে গিয়ে ডকুমেন্টারি ছবিতে যুক্ত হচ্ছে নানান বিষয়। এবং নান্দনিক উপস্থাপনও আগের চাইতে বেশী গুরুত্ব পাচ্ছে। বিষয় নির্বাচন বা বায়োগ্রাফির উপস্থাপনে এসেছে বৈচিত্র্য। সেদিক থেকে বিচার করলে ‘জঠরলীনা’ সেরকমেই একটি ডকুমেন্টারি, যেখানে তথ্যের প্রাবল্যের চাইতে তথ্য অনুসন্ধিৎসার আকাঙ্ক্ষাকে উস্কে দেবার রসদ রয়েছে প্রচুর।

x