জটের কবলে বন্দর

পাঁচ দিন ধরে কাজ হচ্ছে না ।। বহির্নোঙরে বাড়ছে অলস জাহাজের সারি

হাসান আকবর

বৃহস্পতিবার , ১১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
209

লাইটারেজ জাহাজের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) গত শুক্রবার শেষ বার্থিং মিটিং করে জাহাজ বরাদ্দ দিয়েছিল। এরপর গত পাঁচ দিনে আর কোনো বার্থিং সভা করেনি সংস্থাটি। কোনো লাইটারেজ জাহাজও বরাদ্দ দেয়া হয়নি। কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করে রাখা শত শত লাইটারেজ জাহাজের একটিও বহির্নোঙরে পণ্য খালাস করতে যায়নি। এতে বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের সব কার্যক্রমই গত পাঁচদিন ধরে মুখ থুবড়ে রয়েছে। তুমুল বর্ষণের পাশাপাশি সাগর উত্তাল হওয়ায় লাইটারেজ জাহাজের পক্ষে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে বহির্নোঙরে অলস জাহাজের সারি ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে। গতকাল চল্লিশটিরও বেশি জাহাজ অলস বসেছিল। আজ কালের মধ্যে আরো বেশ কয়েকটি খোলা পণ্যবাহী লাইটারেজ জাহাজ বহির্নোঙরে পৌঁছবে। খোলা পণ্যবাহী জাহাজের এই জট সামাল দিয়ে পণ্য খালাস স্বাভাবিক করতে বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে। অপরদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের অভ্যন্তরেও পণ্য খালাস মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বৃষ্টির কারণে। বিশেষ করে খোলা পণ্যবাহী জাহাজের হ্যান্ডলিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কন্টেনার খালাসের কার্যক্রমেও চলছে স্থবিরতা। রাস্তার যানজট পরিস্থিতিও বন্দর থেকে কন্টেনার খালাসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বন্দরের ইয়ার্ডে ইয়ার্ডে কন্টেনারের পাহাড় গড়ে উঠছে। বহির্নোঙরে কন্টেনারবাহী জাহাজের সারিও ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে।
ডব্লিউটিসির দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিশ্বের নানা দেশ থেকে ভোগ্য পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের লাখ লাখ টন পণ্য নিয়ে আসা বড় বড় মাদার ভ্যাসেলগুলো বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। এসব জাহাজ থেকে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে কর্ণফুলী নদীর ষোলটি ঘাটের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজের সাহায্যে বিদেশি মাদার ভ্যাসেলের পণ্য খালাস কার্যক্রম চলে। প্রতিদিন বার্থিং সভা করে ডব্লিউটিসি মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে চাহিদানুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়।
শুক্রবারে যেসব জাহাজ পণ্য খালাস করতে বহির্নোঙরে গিয়েছিল সেগুলোও পণ্য বোঝাই করতে পারেনি। উত্তাল সাগরে মাদার ভ্যাসেলের পাশে নোঙর করা সম্ভব না হওয়ায় সব ধরনের পণ্য খালাসই বন্ধ করে দিয়ে জাহাজগুলোকে অলস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। লাইটারেজ জাহাজ ও মাদার ভ্যাসেল সবগুলোই অলস বসে আছে। বহির্নোঙরে কয়েক লাখ টন পণ্য নিয়ে অলস ভাসছে একচল্লিশটি মাদার ভ্যাসেল। বিভিন্ন ধরনের ভোগ্য পণ্য, ক্লিংকার এবং পাথর রয়েছে জাহাজগুলোতে। সাগর স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এসব জাহাজে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না বলে ডব্লিউটিসি সূত্র জানিয়েছে।
অপরদিকে বন্দরের অভ্যন্তরে ১২টি কন্টেনার জাহাজ নোঙর করার সুযোগ রয়েছে। জেটিতে ১২টি জাহাজই রয়েছে। বহির্নোঙরে আরো অন্তত ১৩টি কন্টেনার জাহাজ অপেক্ষা করছে। কন্টেনার জাহাজের জট তীব্র না হলেও বৃষ্টি এবং রাস্তার যানজটের কারণে বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনার জটের পাশাপাশি জাহাজ জটও শুরু হচ্ছে। বন্দরে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ৪৯ হাজার ১৮ টিইইইউএস কন্টেনার রাখার ইয়ার্ড রয়েছে। গতকাল বিকেলে বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনার রয়েছে ৪৫ হাজারেও বেশি। আর মাত্র দুই তিনটি জাহাজের কন্টেনার খালাস করলেই বন্দরে ইয়ার্ড সংকট প্রকট হয়ে উঠবে। বন্দর থেকে কন্টেনার খালাস প্রক্রিয়া স্বাভাবিক না থাকায় প্রতিদিনই কন্টেনার আটকা পড়ছে। এতে গত কয়েকদিনের মধ্যেই বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনারের পাহাড় তৈরি হয়েছে। কন্টেনার খালাসে ধীরগতি, প্রবল বৃষ্টি, ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, অসহনীয় যানজটসহ বিভিন্ন প্রতিকুল পরিস্থিতিতে কন্টেনারের যেই জট তৈরি হয়েছে তা সামাল দিতে বেশ কিছুদিন সময় লাগবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেছেন, জট হওয়ার কোন কারণ নেই। বৃষ্টি ও রাস্তার যানজটের কারণে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। বন্দরের ভেতরে জেটির জাহাজগুলো চলে গেলে বাইরের জাহাজগুলো জেটিতে চলে আসবে। ফলে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, বর্ষাকালে স্বাভাবিক কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়। তবে জট হওয়ার কোন কারণ নেই। আমাদের ইয়ার্ড অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছে। আমরা ইচ্ছে করলে ৫৫ হাজার টিইউইএস কন্টেনার রাখতে পারবো। বৈরি আবহাওয়া ও বৃষ্টির কারণে কিছুটা সমস্যা হলেও আসলে বড় কোন সংকট তৈরি হবে না। আমাদের সক্ষমতা আরো বাড়ানোর জন্য ইক্যুপমেন্ট সংগ্রহ, ইয়ার্ড ও টার্মিনাল নির্মাণের কার্যক্রম দ্রুতগতিতে চলছে।

x