জটিল হচ্ছে খালেদার মুক্তি প্রক্রিয়া

আজ আপিল শুরু, দিল্লি যাচ্ছেন লর্ড কার্লাইল

ঢাকা ব্যুরো

মঙ্গলবার , ৩ জুলাই, ২০১৮ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
357

কারাবন্দি বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যাচ্ছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় জামিন পেলেও আরো বেশ কয়েকটি মামলায় তিনি গ্রেফতার আছেন। আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হচ্ছে জিয়া অরফানেজ ট্রস্ট দুর্নীতি মামলার আপিল শুনানি। সাজার বিরুদ্ধে খালেদার আপিল এবং সাজা বাড়ানোর জন্য দুদকের রিভিশন দু’টোর শুনানিই আজ শুরু হবে। এদিকে গতকাল সোমবার কুমিল্লার এক মামলায় হাইকোর্টের জামিন স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আশংকা প্রকাশ করছেন, আইনী প্রক্রিয়া খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। অপরদিকে খালেদা জিয়ার জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আইনসভা হাউস অব লর্ডসের সদস্য বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যালেক্স কার্লাইল আগামী ১৩ জুলাই দিল্লি আসছেন। সেখানে তিনি খালেদা জিয়ার কারাবন্দি সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরবেন।

কুমিল্লার মামলায় জামিন স্থগিত : কুমিল্লায় পেট্রোল বোমায় বাস পুড়িয়ে মানুষ হত্যার মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের ওপর স্থগিতাদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে এ মামলায় জারি করা রুল চার সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের করা লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে গতকাল সোমবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ রায় দেন।

গত ২৮ মে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি জে বি এম হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ কুমিল্লার মামলায় খালেদা জিয়াকে জামিন দেন। এ জামিনাদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর ২৯ মে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত জামিন স্থগিত রেখে ৩১ মে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির আদেশ দেন। সে অনুযায়ী ৩১ মে শুনানির পর আপিল বিভাগ খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন স্থগিত রেখে রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিল করতে আদেশ দেন এবং ২৪ জুন শুনানির জন্য দিনও ধার্য করেন। সে দিন খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিনের বিরুদ্ধে কুমিল্লার হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের করা লিভ টু আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়। পরে এ বিষয়ে রায়ের জন্য ২ জুলাই (গতকাল) দিন ধার্য? করেন আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগ খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে দেয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যাওয়ার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন তার আইনজীবীরা। খালেদা জিয়ার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে যে আইনি প্রক্রিয়া চলছে এবং যে ধরনের আদেশ দেওয়া হচ্ছে তাতে আমার মনে হয় সরকারের ইচ্ছাই প্রতিফলিত হচ্ছে। এখানে খালেদা জিয়াকে আইনি প্রক্রিয়ায় বের করা সম্ভব হবে না। তাছাড়াও তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা হচ্ছে না। এমনও হতে পারে, তার অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হতে পারে।

কারাগারে খালেদা জিয়াকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমার মনে হয় সরকার খালেদা জিয়াকে জেলখানায় তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা আদালতের কাছ থেকে কোনোরকম ন্যায় বিচার পাবো এ বিশ্বাস দিন দিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কুমিল্লায় একই ঘটনা থেকে দুটি মামলা হয়েছিল। হাইকোর্ট বিভাগ আমাদের জামিন দিয়েছিল। সে জামিনাদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপ আপিল করে। তার পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে একটি মামলার গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে বলেন হাইকোর্টকে এবং জামিন থাকবে বলেও রায় দেন আদালত। কিন্তু আজকে অত্যন্ত আশ্চর্যজনকভাবে একই ঘটনায় আরেকটি মামলায় জামিন স্থগিত করে আদেশ দিয়েছেন। জামিন প্রশ্নে দেওয়া রুল প্রথমে দুই সপ্তাহের মধ্যে হাইকোর্টকে নিষ্পত্তি করতে বলেন। পরে অ্যাটর্নি জেনারেলের আবেদনে চার সপ্তাহ সময় বাড়িয়ে দেন আপিল বিভাগ। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

আজ আপিল শুরু :

এদিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার খালাস চেয়ে করা আপিলের সঙ্গে তার সাজা বৃদ্ধি চেয়ে করা দুদকের আবেদন (রিভিশন) এক সঙ্গে শুনানির জন্য আজ মঙ্গলবার (৩ জুলাই) দিন ধার্য করা আছে। খালেদা জিয়ার আপিল ও দুদকের রিভিশন আবেদনসহ মামলার আরও দুই আসামি কাজী সলিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমদের করা পৃথক দুটি আপিলসহ মোট চারটি আবেদনের ওপর ওই শুনানি করা হবে। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এই শুনানি হবে।

এর আগে গত ২১ জুন হাইকোর্টের ৫৮টি বেঞ্চ পুনর্গঠন করেন প্রধান বিচারপতি। এ সময় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে বিচারপতি সহিদুল করিমকে অন্য একটি বেঞ্চে যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের সঙ্গে বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে যুক্ত করা হয়। এছাড়া পুনর্গঠিত এই বেঞ্চে দুদকের মামলার শুনানির মতা বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি ড. কে. এম. হাফিজুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চকে দেওয়া হয়।

এদিকে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার খালাস চেয়ে করা আপিল আবেদন ছাড়া খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধি চেয়ে দুদকের রিভিশন আবেদন শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ।

দুদক আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, খালেদা জিয়ার সাজা বৃদ্ধি চেয়ে করা আমাদের (দুদক) আবেদন হাইকোর্ট শুনতে অপারগতা প্রকাশ করে দুদকের মামলার জন্য নির্ধারিত বেঞ্চে শুনানি করতে বলেন। কিন্তু আমরা উভয়পক্ষের আবেদন একসঙ্গে শুনানি করতে চেয়েছি। তাই এ বিষয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদন জানাই। এর ফলে খালেদা জিয়ার আপিল আবেদনের সঙ্গে আমাদের রিভিশন আবেদন ও অন্য দুই আসামির পৃথক দু’টি আপিল আবেদন একসঙ্গে শুনানির জন্য ৩ জুলাই তারিখ নির্ধারণ করেন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ।

প্রসঙ্গত, গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ দুর্নীতি ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন বিচারিক আদালত। রায় ঘোষণার পরপরই খালেদা জিয়াকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ মামলায় খালেদা জিয়া জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেফতার থাকায় তিনি মুক্তি পাচ্ছেন না।

দিল্লি আসছেন লর্ড কার্লাইল :

খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য নিয়োজিত ব্রিটিশ আইনসভা হাউস অব লর্ডসের সদস্য বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যালেক্স কার্লাইল আগামী ১৩ জুলাই দিল্লি আসছেন বলে জানা গেছে। তিনি বাংলাদেশে আসতে পারবেন না এ আশংকায় দিল্লিতে এসে সংবাদ সম্মেলন করবেন। সেখানে বাংলাদেশে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কীভাবে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে, তা কতটুকু আইনসম্মত সেসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিবেন। আগামী ১৩ জুলাইঞ্জ বেলা একটায় তিনি রাজধানী দিল্লির বিদেশী সাংবাদিকদের সংগঠন ফরেন করেসপন্ডেটস ক্লাবে (এফসিসি) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হবেন। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে বাংলাদেশের কয়েকজন আইনজীবীও ভারতে যাবেন, যাঁরা খালেদা জিয়ার হয়ে মামলা লড়ছেন।

খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য লড়তে আলেক্স কার্লাইলকে নিযুক্ত করা হয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার বিচারকে তিনি ইতিমধ্যেই ‘রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বলেছেন, সরকারের ইচ্ছায় কোনো রকম সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের আইনের শাসনের হাল কী রকম দিল্লিতে এসে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে লর্ড কার্লাইল তা জানাতে চান। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর উদ্দেশ্য ভারতে এসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলা।

x