জটিল মানসিক রোগ সিজোফ্রেনিয়া

ডা. প্রধীর রঞ্জন নাথ

শনিবার , ২৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
278

সিজোফ্রেনিয়া একটি তীব্র মাত্রায় জটিল মানসিক রোগ। যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় সাইকোটিক ডিস-অর্ডার বলে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির চিন্তা, আবেগ-অনুভূতি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও ব্যক্তি সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এক সময় সিজোফ্রেনিয়া রোগকে মানসিক রোগের ক্যান্সার বলা হতো। রোগীরা বুঝতে পারে না কি তার সমস্যা, কেন ওষুধ খাচ্ছে, কেন ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে। বর্তমান আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক সময়ে এই রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হলে এটি নিরাময়যোগ্য রোগ। সুইডেনের মনোচিকিৎসক ইউজেন বিউলার ১৯১১ সালে সিজোফ্রেনিয়া শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। শব্দটি এসেছে মূলতঃ গ্রিক ভাষা থেকে। এর প্রথম অংশটিকে বলা হয় ‘সাইজো’ বা ‘সিজো’। যার অর্থ ভাঙা বা টুকরো। দ্বিতীয় অংশ হলো ‘ফ্রেনিয়া’ অর্থাৎ মন। কাজেই সিজোফ্রেনিয়ার পুরো শাব্দিক অর্থ দাড়ায় ভাঙা মন বা যে মন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
সিজোফ্রেনিয়ার কারণ : বংশগতি ও জেনেটিক কারণ, গর্ভ ও প্রসবকালীন জটিলতা, শারীরিক ও জৈবিক কারণ (মস্তিস্কের রসায়ন ডোপামিনের আধিক্য, পরিবেশগত কারণ (শীতকালে জন্ম ও ফ্লু সংক্রমণ), নগরায়ন, আর্থ সামাজিক অবস্থা, মানসিক চাপ, পারিবারিক কারণ, বিকাশজনিত সমস্যা এবং মনোসামাজিক কারণ সিজোফ্রেনিয়ার জন্য দায়ী। সাধারণত তরুণ বয়সে (১৫-৪৫ বছর) এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং পুরুষদের মধ্যে এই রোগের হার কিছুটা বেশি।
সিজোফ্রেনিয়ার প্রধান লক্ষণ : ১. চিন্তার মধ্যে গন্ডগোল, ২. আচরণের সমস্যা, ৩. অনুভূতির সমস্যা।
চিন্তার মধ্যে গন্ডগোল
অহেতুক সন্দেহ করা : রাস্তা দিয়ে মানুষ যাচ্ছে মনে হচ্ছে তার দিকে বিশেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে হাসছে, সমালোচনা করছে। তখন তাকে মারতে উদ্ধত হয়।
ভ্রান্ত বিশ্বাস করা : এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রকাশভঙ্গি বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেতে পারে। এটা রোগীর বয়স, ধর্মীয় চেতনাবোধ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবস্থার ওপর নির্ভর করছে। যেমন- আশপাশের লোকজন তার ক্ষতি করছে, খাবারে ও পানিতে বিষ মিশিয়ে তাকে হত্যা করার চেষ্টা করছে। তাকে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। রোগীর মনের গোপন কথা না বললেও আশপাশের লোকজন জেনে যায় কেউ কেউ তারের মাধ্যমে, ফোনের মাধ্যমে, টেলিস্কোপের মাধ্যমে অথবা অন্য কোনো অজানা যন্ত্রের মাধ্যমে জেনে যায়।
রোগীর কাজকর্ম, চিন্তা চেতনা এগুলো তার নিজের না বাইরে থেকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে।
* মঙ্গলগ্রহ থেকে কেউ যেন তার সঙ্গে কথা বলছে।
সে স্বপ্নের মধ্য দিয়ে উপর থেকে বিশেষ ক্ষমতা লাভ করছে আর তাকে নির্দেশ দিয়েছে মানুষের সেবা করার জন্য। তার নিজের বিশেষ ক্ষমতা আছে, কারণ সে অমুক ফেরেস্তা কিন্তু রোগীর পোশাক পরিচ্ছদ ও চালচলন ঐ রকম নয়। অনেকে বলে আমার সঙ্গে পরীর যোগাযোগ আছে। এমনও দেখা গেছে নিজের বাবার নাম পরিবর্তন করে অন্য একজনের নাম বলে কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর আবার নিজের বাবার নাম ঠিক বলছে।
২. আচরণের সমস্যা : এই হাসছে আবার কোনো কারণ ছাড়াই কাঁদছে।
হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া, মারতে উদ্যত হওয়া। বকাবকি ও গালিগালাজ করা। বাথরুমে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকা। মানুষের সঙ্গে মিশতে না চাওয়া। একা ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ জীবন যাপন করা। হঠাৎ করে কাপড় বা অন্য কিছুতে আগুন ধরিয়ে দেয়া। বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ানো (দিনের পর দিন) অথচ আগে এমন আচরণ ছিল না। হারিয়ে যাওয়া যেমন ব্রিজের নিচে, মাজারে, গোপন জায়গায় লুকিয়ে থাকা। আত্মহত্যার চেষ্টা করা। উল্টাপাল্টা আচরণ করা ও কথা বলা। গায়ের কাপড়-চোপড় সবার সামনে খুলে ফেলা। নিজের পায়খানা-প্রস্রাব সুখে দেখা ও দেয়ালে লাগানো। নিজের খাওয়া দাওয়া ঘুম ও শরীরের প্রতি খেয়াল না রাখা।
অনুভূতির সমস্যা
গায়েবি আওয়াজ শোনা : আশপাশে কোনো লোকজন নেই অথচ রোগীরা কথা শুনতে পায়। কেউ কেউ একদম স্পষ্ট কথা শুনতে পায় ২/৩ জন লোক রোগীকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছে।
আবার কখন ফিসফিস আওয়াজ পাখির ডাকের মতো শব্দ শুনতে পায়। এই কথা শোনার কারণে অনেকে কানে তুলো বা আঙ্গুল দিয়ে বসে থাকে। নাকে বিশেষ কিছুর গন্ধ পাওয়া। শিরঃপীড়া, ক্ষুধামান্দ্য, দুর্বলতা, উদ্বেগ, রুঢ়তা ও অন্যমনস্কতা, ঋতুকালীন যন্ত্রণা দেখা দিতে পারে। চামড়ার নিচে কি যেন হাঁটছে। এইরকম অনুভূতি লাগা। উপরের লক্ষণগুলোর কারণে রোগীর যদি শিক্ষাজীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মজীবন ও সামাজিক জীবনের ব্যাঘাত ঘটে এবং লক্ষণগুলো ৬ মাসের অধিক সময় থাকে, তখন তাকে আমরা সিজোফ্রেনিয়া হিসেবে ধারণা করতে পারি।
মনোসামাজিক প্রশিক্ষণ : এই রোগের বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক চিকিৎসার জন্য ওষুধ (অ্যান্টিসাইকোটিক মেডিকেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ওষুধ ছাড়া এই রোগের উপসর্গের উপশম সম্ভব নয়। চিকিৎসার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের ইতিবাচক ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য মনোসামাজিক প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসার গুরুত্ব অপরিসীম। সঠিক চিকিৎসা ও পরিবারের আন্তরিকতার মাধ্যমে রোগীরা ফিরে পেতে পারে কর্মজীবন ও সংসার জীবন।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিবিধান : সিজোফ্রেনিয়া রোগ নিরাময়ে হোমিওপ্যাথিতে ফলদায়ক ওষুধ আছে। যা অন্যপ্যাথিতে নেই। লক্ষণ সাদৃশ্যে নির্দিষ্ট মাত্রায় এই রোগে ব্যবহৃত ওষুধ নিম্মে প্রদত্ত হল। যথা : ১. একোনাইট, ২. এব্রাটেনাম, ৩. এবসিন্থিয়াম, ৪. একটিয়া রেসিসোমা, ৫. এগারিকাস মাস্ক, ৬. এগনাম কাস্ট, ৭. এলুমিনা, ৮. এম্বাগ্রিসিয়া, ৯. এনাকার্ডিয়াম, ১০. আর্জেন্ট নাইট, ১১. আর্ণিকা, ১২. আর্সেনিক, ১৩. অরাম মেট, ১৪. ব্যাপ্টিশিয়া, ১৫. ব্যারাইটা কার্ব, ১৬. বেলেডোনা, ১৭. ক্যালকেরিয়া, ১৮. কস্টিকাম, ১৯. ক্যামোমিলা, ২০. হায়োসিয়েমাস, ২১. আয়োডিয়াম, ২২. কেলিব্রোম, ২৩. কেলিকার্ব, ২৪. ল্যাকেসিস, ২৫. লাইকোপোডিয়াম, ২৬. পালসেটিলা, ২৭. ইগ্নেশিয়া, ২৮. সিফিলিনাম, ২৯. টিউবারকুলিনাম, ৩০. ভিরেট্রাম এল্ব, ৩১. থুজা, ৩২. স্ট্যামোনিয়াম, ৩৩. চায়না, ৩৪. নাক্সভমিকা, ৩৫. সালফার, ৩৬. প্লামাম মেট, ৩৭. থুজা, ৩৮. প্লাটিনাম উল্লেখযোগ্য। তারপরের চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করা উচিত।

x