জঙ্গি দমনে সকল শ্রেণির মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে

শুক্রবার , ৫ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ
92

জঙ্গি সমস্যা এখন শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এটা বিশ্বব্যাপী মানবতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জঙ্গিবাদের বিস্তার এখন একটা বৈশ্বিক বিষয় এবং বিশ্বের যে প্রান্তেই আজ জঙ্গি তৎপরতা চলছে তার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে বৈশ্বিক জঙ্গিবাদের একটা সংযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জঙ্গি অর্থায়নে বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠেছে বিশাল নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের বড় অবলম্বন অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানের ব্যবসা। জঙ্গিবাদের বিস্তার ও জঙ্গি তৎপরতা চালানোর জন্য বিশাল অর্থের প্রয়োজন হয়। জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধকরণে প্রচারপ্রোপাগান্ডা, জঙ্গি রিক্রুটমেন্ট, প্রশিক্ষণ, মোটিভেশনসহ আশ্রয়প্রশ্রয়, বাড়িগাড়ি এবং অস্ত্র সরঞ্জামাদি, সব কিছুর পিছনেই বিপুল পরিমাণ অর্থের দরকার হয়। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত সদস্যদের মাসোয়ারাও দেওয়া লাগে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গিদের পিছনে অর্থের যোগান যেমন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হচ্ছে, তেমনি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির খেলায় পাকিস্তান সরাসরি বাংলাদেশের জঙ্গিদের অর্থায়নে জড়িত। তবে বাংলাদেশ জঙ্গিদের অর্থায়নের সবচাইতে বড় উৎস রয়েছে বাংলাদেশের ভেতরে।

২০১৩ সালের পর বাংলাদেশের একের পর এক জঙ্গি হামলার নতুন মাত্রা পায় ২০১৬ সালের ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার মধ্যে দিয়ে। একই বছর শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠে আবারো হামলা হলে তৎপর হয়ে উঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের জোরদার অভিযানে জঙ্গি তৎপরতার খানিকটা কমে এসেছিল কিন্তু সম্প্রতি কয়েকটি অভিযান ও হামলা চেষ্টার ঘটনা এবং আস্তানা আবিষ্কারের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে কেন জঙ্গি কার্যক্রম হঠাৎ বেড়ে গেল! গত ৩ জানুয়ারি দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায় ‘সুযোগ বুঝে মাঠে নামার অপেক্ষায় জঙ্গিরা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, জঙ্গি সদস্যরা চট্টগ্রামে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে নি, বরং সাংগঠনিক তৎপরতার অংশ হিসেবে তারা নীরব ছিল কিছুদিন, এখন সুযোগ বুঝে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে মাঠে নামছে। অপরাধ বিশ্লেষকগণ এমনই মনে করছেন। নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রামে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠাটাইতো স্বাভাবিক। কারণ তারা নতুন নতুন ইস্যু পাচ্ছে, যা দিয়ে ধর্মভীরু মানুষকে প্রভাবিত করা যায়। এখন যেমন রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে তারা প্রভাবক হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। এর আগে মিরসরাই সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানা পাওয়ার সময়ও তারা প্রভাবক হিসেবে কাজে লাগিয়েছিল ইরাক, আফগানিস্তানে হামলার বিষয়টিকে। এতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

উল্লেখ্য, গত সোমবার নগরীর মাদারবাড়ি থেকে দুই জঙ্গি সদস্যসহ সুইসাইডাল ভেস্ট উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃত দুই জঙ্গি সদস্য যে আত্মঘাতী সদস্য, তা নিজেরাই পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। এ ঘটনার পর পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে এর আরো ব্যাপকতা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করা হচ্ছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) সম্প্রতি বলেছেন, ‘জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে পুলিশ কাজ করছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইন নিয়েও আমরা কাজ করছি। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া যেমন ঘৃণ্য কাজ তেমনই এ কারণে কাউকে হত্যা করার কথাও ইসলাম বলে না।’ তিনি বলেন, ‘কোরআনের খণ্ডিত ও ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে একটি গোষ্ঠী যুবকদের বিপথগামী করে জঙ্গি সৃষ্টি করছে। আগে বলা হতো মাদ্রাসার ছাত্ররা জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত। এখন দেখা যাচ্ছে আধুনিক শিক্ষায় যারা শিক্ষিত বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও জড়িয়ে পড়ছে। যারা জঙ্গি তৈরি করছে, জঙ্গি তৎপরতায় মদদ যোগাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কাউন্টার ব্যবস্থা নিতে হবে।’ রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্তগণ যদি নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এরকম কাজ করেন তাহলে বহুলাংশে জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মার্কিন কংগ্রেসে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটসের পেশ করা ‘কান্ট্রি রিপোর্টস অন টেররিজম’এর বার্ষিক প্রতিবেদনে জঙ্গিবাদসন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেন আটকানোসহ ব্যাংকিং ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে তাগিদ দেয়া হয়েছিল। সেদিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে। এছাড়া আমরা জানি, বাংলাদেশের মানুষ ধর্ম ভীরু, কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তাই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।

x