জগৎসংসারের পাটিগণিত

জাহেদুল আলম

মঙ্গলবার , ৫ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০২ পূর্বাহ্ণ
52

কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬ – ১৫ ফেবু্রয়ারি ২০১৯) তাঁর ‘সোনালি কাবিন’ কবিতায় লিখেছেন, ‘ প্রেম কবে নিয়েছিল ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ / মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস / যতক্ষণ ধরো এই তাম্রবর্ণ অংঙ্গের গড়ন / তারপর কিছু নেই, তারপর হাসে ইতিহাস। তাপস চক্রবর্তীর ‘পাটিগণিতস্য ঠোঁট’ ও ‘কৃষ্ণবালিকা’ গ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠ করতে করতে আল মাহমুদের কবিতার লাইনগুলো মনে পড়ে গেলো।
চট্টগ্রামে এবার নব উদ্যোগে ও নব আঙ্গিকে বইমেলার আয়োজন হয়েছে। যৌথভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে এবং সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগলোর উদ্যোগে চট্টগ্রাম এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠে বইমেলা আরম্ভ হয়েছে গত ১০ ফেব্রুয়ারি। চলেছে ২ মার্চ পর্যন্ত। ঢাকায় বাংলা একাডেমি বইমেলা ও চট্টগ্রাম বইমেলা ২০১৯ উপলক্ষে ঢাকার ‘বেহুলাবাংলা’ প্রকাশন প্রকাশ করেছে তাপস চক্রবর্তীর ‘পাটিগণিতস্য ঠোঁট’ কাব্যগ্রন্থটি। মেলার দ্বিতীয় দিনেই চট্টগ্রাম বইমেলার ‘বেহুলাবাংলা’ স্টলে গ্রন্থটি এসেছে। গ্রন্থটিতে মোট ৬৪ টি কবিতা ছাপা হয়েছে। প্রতিটি কবিতাতেই জীবন ও জগতের রহস্য উন্মোচনে প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে। পাশাপাশি মানবদেহের অংশ ঠোঁটের বিচিত্র প্রয়োজনীয়তা ও বিচিত্র ব্যবহার চিত্রিত হয়েছে। কথা বলা, ভাব বিনিময়, চুম্বন, মুখরতা, ঝগড়া ইত্যাদি পরতে পরতে ঠোঁটের শৈল্পিক ব্যবহার ও নৈপুন্য বিধৃত হয়েছে কবিতাগুলোতে।
‘পাটিগণিতস্য ঠোঁট’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম বৈশিষ্ট্য জীবন জগতের রহস্য উন্মোচন পর্বে উদাহরণ দেয়া যায়। ‘অস্তিত্ব’ কবিতা থেকে। ‘বৃক্ষের অস্তিত্বে মানুষ- / নাকি মানুষের অস্তিত্বে বৃক্ষ? / অক্ষির চয়নে চয়নে শুধু জল- / তবুও শায়িত বধূ পুষ্পের কক্ষ।’ আবার ‘তুমি আমি সে’ কবিতায় আছে, ‘মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে ইদানিং ব্যতিব্যস্ত / আমি তুমি এবং সে….. / কেননা ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক যোগানে স্থির / প্রজাপতির নীরব শুক্রানু।/….লালনের মতাদর্শ ছুঁয়ে বলি-আমি ধর্মহীন।’ ‘বগলে ডিউ’ কবিতায় লিখেছেন, ‘সব শুয়োরের বাচ্চা এক। বগলে ডিউ/স্নো-পাউডারের বহর/বিবিধ তেলেসমাতি।’
তাপস চক্রবর্তীর জীবনবোধের দুর্দান্ত পরিচয় পাওয়া যায় “পাটিগণিতস্য ঠোঁট” এর ভূমিকায় শিরোনামহীন কবিতাটিতে। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘যদিও পুরুষের তিনটি অধ্যায়ে পার্থিব ধরায়/তবুও কি আজ ক্রমবিন্যাসের বড় প্রয়োজন!/তবুও পুরুষ কখনও পুরুষ মায়ের আঁচলে/কখনও গাধা নিজের সংসারে, অসারে বাঁধে ঠোঁট/নিরন্তর।/খকনও বানর হয়ে পুত্রকন্যার এগাছ ওগাছে/হয়ে যায় সার্কাসি মসলা।’
এবারের মেলা উপলক্ষে তাপস চক্রবর্তীর অপর কাব্যগ্রন্থ ‘কৃষ্ণবালিকা’। প্রকাশ করেছে চট্টগ্রামের আবির প্রকাশন। আবির প্রকাশনের স্টলে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। পাটিগণিতস্য ঠোঁট এর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট ‘ঠোঁট’ এর বহুবিধ চরিত্র ‘কৃষ্ণবালিকা’ কাব্যগ্রন্থে আরো তীব্র। যেমন ‘সমর্পনের গান’ কবিতায় লিখেছেন, ‘তোমার আমার সমর্পিত ঠোঁটটা / কোন পাঠহীন সম্পর্কের মন্ত্রে।’ ‘চূড়ান্ত হিসাব’ কবিতায় আছে, ‘নীলাম্বরে বাঁধা আমার আঁচল/আমার ঠোঁটের যতকথা।’ কবিতাটিতে জীবনের কিছু হিসাব নিকাশ করতে গিয়ে ঠোঁটের কৃতিত্ব স্থান পেয়েছে। আবার প্রকৃতির ঘ্রাণ আস্বাদনে ‘হঠাৎ যদি’ কবিতায় ‘নিভৃতে যেমনটা দিতে যেতে যেতে কাবেরী মন্থন/ঘাসের কোমল আস্তিন তুলে দিতে ঠোঁটের পরাগ/চড়ুই ডাকা প্রথম প্রহর যেমনটা তুমি দিয়েছিলে।’ সৌন্দর্য আস্বাদনে ‘ভালোবাসা’ কবিতায় ‘ শেষ বিকেলের আলোটুকু/ তোর ঠোঁট ছুঁয়ে নামুক গ্রীবায়।’ অন্যদিকে নস্টালজিক ও রোমান্টিকতায় ভরপুর ‘রোমান্টিক’ কবিতায় আছে ‘চল শেষবার ঠোঁটে রাখি ঠোঁট করি হইচই।’ আবার বারাঙ্গনার সোহাগের কথা আছে ‘কবিতায় কথকতা’ কবিতায়- ‘কোনও রাত/ কোনও অন্ধকার ছুঁয়ে আসা/ কোনও অচেনা ঠোঁট।’ পক্ষান্তরে মিথ পরিবেশিত হয়েছে ‘কামশাস্ত্র’ কবিতাটিতে।
কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসন আর গ্রামগুলোকে শহরের আদল দেয়ার কুৎসিৎ প্রতিযোগিতায় হারিয়ে গেছে আমাদের লোকজ জীবনের নানা অনুষঙ্গ। এখন খেলতে হলে লগ্নি লাগে। অথচ বিনা লগ্নিতে আমাদের আবহমান খেলাগুলো কত আনন্দদায়ক ছিলো। এখন আর হাডুডু খেলা হয় না, হয় না দাড়িয়াবান্ধা কিংবা গ্রাম্য সাঁতার। হারিয়ে গেছে বৌচি, এক্কা-দোক্কা, লুকোচুরি আরো কত কি! তাই তো তাপস চক্রবর্তী ‘টাকায় টাকায় লেখা’ কবিতায় বলেন, “অজ অথ আম আর’ জানো, কত্তো নিনাদ/ভাবতে পারো! টাকা ছাড়া হয়নি কারো বিবাদ/রাম শ্যাম যদু মধু, পুলিশ ডাকাত চোর/চাঁদনি রাতে ছেলেবেলা, পুতুল আমি তোর।’
তাপস চক্রবর্তীকে সবাই চেনে নাটকের লোক হিসেবে। তিনি মূলত অভিনেতা। নাট্যচর্চায় চট্টগ্রাম ও দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং দেশের বাইরে মিলিয়ে কতশতবার মঞ্চে আরোহন করেছেন, ইয়ত্তা নেই। আবার তিনি নাট্যকারও। তাঁর রচিত অনেকগুলো নাটক চট্টগ্রামে তো মঞ্চস্থ হয়েছেই, দেশের বাইরেও কোনো কোনো দল মঞ্চস্থ করছে। লেখালেখির জন্য পশ্চিমবঙ্গ সোনাপুর কাব্যমঞ্চ থেকে ‘শিউলী স্মৃতি পদক’-সহ নানা সম্মাননা অর্জন করেছেন। বিচিত্র বিষয়ে অধ্যয়ন এবং বহুমুখী প্রতিভার শেষ নাট্যজন সম্ভবত তাপস চক্রবর্তী। সেটারই প্রমাণ এবারের বইমেলায় তাঁর পাটিগণিতস্য ঠোঁট ও কৃষ্ণবালিকা কাব্যগ্রন্থ দুটি। ইতিমধ্যে তাঁর নাটকসমগ্র এক প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দশটি মঞ্চ নাটক ছাপা হয়েছে। নাটকসমগ্র দুই শ্রীঘ্রই প্রকাশিত হবে।
‘পাটিগণিতস্য ঠোঁট’ এবং ‘কৃষ্ণবালিকা’ কাব্যগ্রন্থ দু’টির প্রচ্ছদ এঁকেছেন বিশিষ্ট আঁকিয়ে উত্তম সেন। গ্রস্থগুলোর দাম যথাক্রমে একশত পঁচাত্তর টাকা ও একশত ষাট টাকা।
zahedulalam95@yahoo.com

- Advertistment -