জগমোহনের বোধবৃত্তান্ত

বিপুল বড়ুয়া

শুক্রবার , ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ
27

ঘাটকূলের কোব্বাদ মুনশীর দোকানে যেতে যেতে কাল রাতের কথা খুব মনে পড়ে যায় জগমোহনের। মনে পড়বে নাজগমোহন কি এতোই ভুলোচুলো! এতোই হুঁশ জ্ঞান ছাড়া মানুষ?

বৌ রোহিণীর একটাই কথা। ব্রজলালের বৌ সোজা মুখের ওপর বলে ফেলেছে তার সোয়ামী আর আমাদের খাওয়াতে পারবে না বসিয়ে বসিয়ে। ‘তুমরা অহন তোমাদের খাওয়ানোর চিইনতাটা করো। আমরা আর কতোদিন তুমরা দুই বুড়োকে বসাই বসাই খাওয়ামু। নিজদের পথ নিজেদের দেখো।’

জগমোহন অবাক হয় বুড়ো মাবাবা তাহলে ব্রজলালের কাছে বোঝা হয়ে পড়েছে? কী খায় তারা? দু’বেলা দু’মুঠো ভাতশাক পাতার তয় তরকারিআর সকাল বিকেলে এক আধটু রং কড়া চা। আর এতেই ব্রজলালের সব খাওয়া হয়ে যাচ্ছে।

এক সময় ব্রজলালের কথা মনে পড়ে তার। আহারে তার ছেলে ব্রজলাল এখন কতো বড়ো হয়ে গেছে? বাবামাকে নিয়ে এখন আর তার ভাবার সময় নেই? কী যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে?

জগমোহনের সঙ্গে এখন কি খুব দেখা হয় ব্রজলালের? বলা যায় মোটেই না। সারা সপ্তায় বার দুয়েক দেখা হলেই বেশি। সেই শেষরাতেই ছুটে যায় ব্রিজ ঘাটে জোনাব বেপারির মাছের আড়তে। মাছভর্তি ট্রলার আসেতা গদীঘরে তোলাসাফসুতরো করে থরে থরে গোছানো তারপর সেই ভোর হতেই ধুমসে বেচাকেনা। আড়ত হতে ফেরে সেই রোদ পড়ে গেলে খেয়েদেয়ে ঘুমসন্ধ্যায় বেরিয়ে লুলা কেষ্টর মদগাঁজার আড্ডা হতে মাঝ রাতে ফেরাআরো কতো কি?

ব্রজলালের অতসবসব খবর জগমোহন রাখে। রাখতে হয়। একমাত্র ছেলে বলে কথা। জগমোহন জানে ব্রজলালের হাতে বেশ কড়কড়ে নোট আসে। জোনাব বেপারির আড়তে তো আমদানির কমতি নেই। ট্রাকে ট্রাকে মাছ আসে সাতক্ষীরা, নবীনগরের জলমহাল থেকে ট্রলারে আমদানি হয়খুরুসকূলডালচরের সামুদ্রিক মাছ। দৈনিক আয়রোজগারের পাশাপাশি আড়তের বেচনদার মুনশিদের সরানো টাকা থেকে ব্রজলালের ভাগেও বেশ বড়সড় একটা টাকা আসে। সে হিসেবে আয়আমদানিও বেশ ভালো ব্রজলালের তা খুব বোঝে জগমোহন। কিন্তু তারপরও কেনো এমন হয়ে উঠলো ব্রজলাল দিনে দিনে তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না সে।

কিন্তু একটা ব্যাপার ভেবে অবাক হয় জগমোহন। তার ছেলে ব্রজলাল তো এমন ছিলো না। এমন হওয়ার কথাও তো না। নিজে কোলে পিঠেছায়ায় ছায়ায় রেখে মানুষ করেছে। জগমোহন নিজে তো এটা বেশ ভালোভাবেই জানে জলখালের মাছ নিত্তির আড়তহিসাব পত্তরের মানুষগুলোর জীবন কড়কড়ে নোট মদগাঁজা, জুয়া জৌলুশ কিংবা মেয়েমানুষ নিয়ে ফূর্তি ফার্তির ভেতর ঠিকই একসময় ঢুকে পড়ে। তা থেকে বাঁচোয়া নেইই। তা সে তো হয় বলতে গেলে মাঝ বয়সে। কিন্তু তা বলে তার ছেলে ব্রজলাল এতো অল্প সময়ে কী করে এ পথে পা বাড়ালো। যা তার বিবেকবিবেচনা গিলেই ফেললো। ভয়ংকর এক ধর্মনাশের দিকে ছুটে যাচ্ছে ব্রজলাল

বাবামাকে ভাত দেবে না। দেখে রাখার দায়িত্ব নেবে না। কী অবাক করা কাণ্ডব্রজলাল তার বাবা মাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে অধর্মে ডুবে যাবে। নিজের উঠতি সংসার জীবনকে অন্ধকারে হারিয়ে ফেলবে।

মুনশীর চা দোকানের চিলতে খাপড়া বেঞ্চিতে বসতে বসতে মুষড়ে পড়ে জগমোহন। ভাবেঅনেক কিছু ভাবে। আহাএই ছোট্ট ব্রজলালছোট সংসারের জন্য সারাটা জীবন শরীরের রক্ত পানি করে খেটেছে জগমোহন। তাও জলখালে মাছের জাত পাত নিয়ে। রাঙাবালিসোনাদিয়াদুবলার চরে বহদ্দারের নৌকা মাছের খাড়িতে রাতদিন খেটেছে। কাজে হামলে পড়ে টাকা কামিয়েছে ট্রলারের মাঝিমাল্লাকে দিয়ে রোহিণীর কাছে পাঠিয়েছে। ছেলে ব্রজলালটা যেনো ভালো খেতেপরতে পারে যেনো মানুষ হতে পারে। তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে সামনের অবনীদের পুকুরে নগদ টাকা দিয়ে দুই আনার অংশভাগ নিয়েছে, দু’কামরার ঘর করেছে, ভিটির আশেপাশে বেশ কটি গাছও লাগিয়েছে হাতে কিছু লুকোচাপা জমাজাতিও আছে রোহিণীর কাছেসব সব তো সেই ব্রজলালের জন্য। তার ঘরে নাতিপুতি আসবে তাদের জন্য।

অথচ সেই ব্রজলাল কেমন বদলে গেছে, কোথায় কোথায় ঘোরে ফেরেকোত্থেকে মুখ ঝামটা বৌ নিয়ে এসে সবার সামনেসমাজের কাছে তার মাথা হেঁট করে দিয়েছে। কাজ নিয়েছে জনু বেপারির আড়তেহাতে কাঁচা পয়সাতারপর এই অধপতন! বাবা মাকে শাসিয়ে চলাবৌকে দিয়ে অসম্মান করাভাতের খোঁটা দেয়ারাস্তা দেখিয়ে দেওয়া।

আহা জীবনজগমোহন ভাবেমানুষ কখন কোথায় নিজকে হারিয়ে অধর্মের টুংকো হাতছানিতে। মানুষ হারিয়ে ফেলে নিজের জন্ম সত্তাকেব্যক্তি সত্তাকে অজ্ঞানতার অতল অন্ধকারে। কর্তব্যবোধদায়িত্বজ্ঞানকে ছাপিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ায় ঘুণে ধরা অকল্যাণের প্রাচীর। জগমোহন ভাবেব্রজলাল ঠিকই ভুল পথে পা ফেলছেপাপ তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। পাপ আহা পাপ।

কোব্বাদের ছাপড়া চা দোকানের ভিড় বাট্টা ওঠেই গেছে। আজকাল বেলা না পড়তেই সব্বাই উঠে পড়ে। তাও আজ রাজাখালী হাটবার। লোকজন সব্বাই খেয়া পার হয়ে ওদিকে ছুটে গেছে। আজ জগমোহনের কোথাও যাওয়ার মন নেই। না হাটে না টোল ঘরে।

জগদ্দল একটা পাথরের মতো কোব্বাদের দোকানে জবুথবু হয়ে বসে থাকে। দু’একবার ডেকেছিলোও কোব্বাদ, ‘জেঠা রং কড়া করে চা একটা দিমু। কী আইয়া তক ঝিম মাইরা বইয়া আছ। মন খারাপ হইছে। বাড়িতে বৌপোলার লগে ভ্যাজাল লাইগছে।’

কাল বিকেলে মন খারাপ করা নিয়ে সেন বাড়ির ওদিকে পূজামন্দিরে যাওয়ার পথে রাস্তায় ধরে বসে ষষ্ঠীপদ। খুড়তুতো ভাই। আগে জাল ফেলামাছের আড়তে থাকতো। জোর করে ঘরে নিয়ে যায়। দূর থেকে গড় হয়ে প্রণাম করে তার বৌ। ভাসুর বলে কথা। কী যত্নআত্তি বৌজামাই মিলে। লিকারের চামুড়িবিস্কিট নিয়ে বসে ষষ্ঠীপদ। আনে পানতামুক। খুব খুব বলে নিজের ঘর সংসারের কথা। ‘দাদাআপনের ভাইপোযতন বেশ আছে। শহরে ট্রাকের হেলপারি করে। দিন দুদিনে বাড়ি ঘুরে যায়। ম্যালা ম্যালা জিনিসপত্র আনে, চিনিচা পাতাবিস্কিট। হাটবাজারের হপ্তার টাকা আলাদা দিয়ে যায় মার কাছে। ওষুধ পথ্যির খরচপত্তর দেয়।’

কি দাদাযতনটা ভালো করছে না। এ সময় আমাদের না দেখলে আমরা কি করবু দাদা। কুথায় যাবু।’ দেখি সামনের আশ্বিনে যতনের জন্য বৌ আনবু। আপনি মান্যিগণ্যি লোক। দু’চার গ্রামের জাতপাতের খপর আপনার কাছে। এটা ভালা মাইয়ার খোঁজ দিয়েন। ঘরসংসারি মাইয়া। ঘরে কাজ আর কি? তাদের সংসারে তারাই থাইকবুসকাল বিকালে ভোগপূজা দিবু তুলসী তলায় বাতি জ্বালাইবু আর ঠাকুর দেবতার নাম নিবু। দাদাআমাদের তো যাওয়ার সময়। যে কদিন আছি হাসিখুশিতে দু মুঠো খেতে পারলেই হলোআর কি চাই। ঠিক কইলাম না জগাদা।’

জগমোহন হা করে চেয়ে থাকে ষষ্ঠীপদের দিকে বৌ ঘোমটা দিয়ে দরজার পাশে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খুশি যেনো উপচে পড়ছে দুজনের চোখে মুখে। ভারি স্বস্তি দেখে মন ভরে যায় জগমোহনের। আহা কী মধুর স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে আছে ষষ্ঠীপদ আর তার বৌ। ছেলে ভালো আয় উপার্জন করছে, মাবাবার যত্ন আত্তি নিচ্ছে, ছেলের জন্য লাল টুকটুকে বৌ আনবে ষষ্ঠী। খুশির কী উচ্ছ্বাস ষষ্ঠীর। তাদের ঘরসংসার আনন্দউৎসবে ঝলমল করবে।

সে আনন্দ উৎসব তো জগমোহনও চেয়েছেচেয়েছে রোহিণীও কিন্তু কোত্থেকে কী হয়ে গেলে। ব্রজলালের বৌ ঘরে আনার বছরখানেকের মধ্যে কেমন তছনছ হয়ে গেলো তার হাতে গড়া সোনার সংসার। সংসারের হাল তার মুঠো হতে কোথায় যেনো ছিটকে গেছে তা আর খুঁজে পায় না জগমোহন। হারিয়ে ফেলে হাসিআনন্দউচ্ছ্বাসের মৌতাত। কতো স্বপ্ন ছিলো চাওয়াপাওয়ার আকাঙ্ক্ষার। সবসব আজ মিথ্যা হয়ে গেলো তার জীবনে। জগমোহন আজ নিজের কাছে নিজেই যেনো হেরে গেছে। পাড়াপড়শীর কাছে ছোটখুব ছোট হয়ে গেছে জগমোহন।

পাঁড় নেশাখোরের মতো জগদ্দল পাথর হয়ে গেছে জগমোহন। তার বোধবিশ্বাস যেনো টুংকো সৌধের মতো হুড়মুড় করে চারদিকে ভেঙে পড়ে। জগমোহন যেনো কোনো অথর্বের মতো শুধু চেয়ে থাকে সে মহাপতন।

কোব্বাদের কথার পিঠে কিছুই বলে না জগমোহন। মুখ খোলে না। তবে কি কোব্বাদ তার চেহারা দেখে কিছু বুঝে নিয়েছে। তারপরও শুকনো হাসি এক মুখ হেসে কোব্বাদের কথাকে উড়িয়ে দেয়। জগমোহন তারপরও বোঝেকখনো কখনো চোখমুখ দেখে মানুষ মানুষের মনের ভাষা ঠিক বুঝে নিতে পারে সে খানিকটা হলেও।

বাড়িতে রোহিণীর মন খারাপ করা চেহারা দেখে মাঝে মাঝে তেমনি জগমোহনও যেমন বুঝে নেয়আজ হয়তোবা ব্রজলাল তার মা রোহিণীকে গালমন্দ করেছে কিংবা ব্রজর বৌ তার শাশুড়িকে দু’কথা নিশ্চয়ই শুনিয়ে দিয়েছে। অতসবের পরে সব বুঝেও জগমোহন কী ভেবে রোহিণীর মুখোমুখি হয় নাতাকে আর কষ্ট দিতে চায়ও না। নিজের ভেতর নিজে পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে যায়। শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু এখন কী করবে জগমোহন। বৌ রোহিণীকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যাবে। পালিয়ে যাবে জগমোহনব্রজলালতার বৌ কাজলার চার চোখ থেকে। ছেড়ে যাবে চেনা ঘরবসত ভিটি চৌহদ্দি থেকে? ঝিম মেরে বসে জগমোহন ভাবেঅনেক কিছু ভাবে। নানা পথ খোজে পালানোর ফিরে দাঁড়ানোর। ব্রজলালকে সে পথ ছেড়ে দেবে নাকি পথে নিয়ে আসবে। এক সময় নিজের ভেতর অনেক দ্বন্দ্বের ভেতর থেকে জগমোহন ঠিক ঠিক ফিরে পায় সে এক অন্য জগমোহনকে।

তখন এ জগমোহন আর সেই মুখ্যসুখ্য লোলচর্মের ব্রজমোহন থাকে না। তাকে ছাপিয়ে অটল হিমালয়ের মতো ভিন্নতর চনমনে রক্ত মাংসের আর এক জগমোহনের জন্ম হয়। সে জগমোহন অমিত বোধ আক্রোশে শিরদাড়া টান টান করে জেগে উঠে। বিশ্ব চরাচরকে জানান দিয়ে বসেসে কোনোক্রমেই ব্রজলালকে কূটচালের ভেতর বন্দি হতে দেবে না। সমাজ সংস্কারের অনুশাসনের মুখোমুখি হতে দেবে নাসালিসবৈঠকের দেনদরবারের কাছে নতজানু হতে দেবে না। সবচে’ বড়ো কথা বাবামাকে বাস্তুচ্যুত কিংবা অন্নদান না করার মতো মহা পাপের পঙ্কিলতায় ডোবতে দেবে না। জগমোহন ঠিক করে নেয় রোহিণীকেও বলবেব্রজলালকাজলার অমানবিকতায় রুষ্ট না হতে। ওরা ছেলেমানুষতো অর্থের মোহে আজ ওরা অন্ধ। তবে ঠিক ঠিক সে একদিন ওরা বোঝবে বাবামা কী? জীবনের সত্যিকারের সুখ কী?

কোব্বাদ এবার জগমোহনের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। ‘জেঠা এ বেলা হাটে গেইলা না। ঘাটকূলের দিকেও গেলা না, মন ভালা নাই জেঠা। আজ কি হইলো তোমার জেঠা।’

জগমোহন এবার আপপাশ ছাপিয়ে খল্‌ খল্‌ করে হেসে উঠে। বাতাসে সেই চারপাশ কাঁপানো হাসির দ্যোতনা ছড়িয়ে যায়। সচকিত হয়ে পড়ে ছাপড়ার চা দোকানে ঝিম মেরে বসে থাকা কয়েকজন। সবাই হতবাক হয়ে পড়ে জগমোহনের অবাক করা কাণ্ড দেখে। অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে পিছিয়ে যায় কোব্বাদ।

জগমোহনতারপর আর সেই আটপৌঢ়ে জগমোহন থাকে না। কী এক অটল বিশ্বাসে ফিরে পায় এক অন্য ধরনের ধীশক্তি। না ব্রজলালকে ফেরাতেই হবে কাজলাকেও। পাপপুণ্যির বিষয়টাকে তুলে ধরতে হবে তাদের কাছে। বোঝাতে হবে জীবনের মানে সে এক গভীর নির্ভরতার বিষয়। তার চোখের সামনে হারিয়ে যাবে ভুল বেসাতিতে তার সন্তানতা হতেই পারে না। তাকে ফেরাবেই, তারপর এক যুদ্ধজয়ের মৌতাত নিয়ে ঘন আঁধার চিরে দ্রুত বাড়ির দিকে ফেরে জগমোহন।

x