ছোটগল্পের কথা

এমদাদ রহমান

মঙ্গলবার , ২৭ নভেম্বর, ২০১৮ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
6


‘সত্যি করে বলতে গেলে, ভেদ করার চেয়ে বিদ্ধ করাই হচ্ছে ছোটগল্পের কাজ।’
কথাটি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের। ‘একশ এক গল্প’ বইটি না পেলে আমার জানাই হতো না গল্প নিয়ে কী আশ্চর্য সব কথা বলে গেছেন তিনি। বারবার মনে হচ্ছিল এতদিন কেন পড়িনি! কেন এতদিন কেউ পড়তে বলেনি! আমাকে যিনি এই বইটি পড়তে বলেছেন, তার নাম এখানে বলছি না, তিনিও গল্প লেখেন, তার হাতের কলমটি সোনার কলম; তার নামটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, বইটি গুরুত্বপূর্ণ। কথাগুলি গুরুত্বপূর্ণ।
চলুন পড়া যাক, বইয়ের ভূমিকা থেকে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের কয়েকটি কথা-
ছোট গল্পের যদি কোন জ্যামিতিক চেহারা থাকত তবে সে সরলরেখা হত না, হত বৃত্তরেখা। গল্প যদি খালি সোজা চলে তবে হয় সে শুধু বৃত্তান্ত, কিন্তু যদি চলে বৃত্তরেখায়, তার বৃত্তের অন্তে সে হয়ে ওঠে সত্যিকারের ছোটগল্প । যেখানে বৃত্ত যত বেশি সম্পূর্ণ সেখানে ছোটগল্প তত বেশি সার্থক। যতদূর সোজা যাক, এক সময়ে গল্পকে মোড় ঘুরতে হবে, নিতে হবে তির্যক বাঁক, উড্ডীন বিহঙ্গে বঙ্কিম ও ত্বরিত প্রত্যাবর্তনের আকারে; সোজা পথটা যে পরিমাণে মন্থর ছিল, ফিরতি পথটা হতে হবে ততোধিক ত্বরান্বিত। প্রতিক্ষেপ বা প্রতিঘাতের এই বেগবলটাই হচ্ছে ছোটগল্পের প্রাণশক্তি। অর্থাৎ, কাহিনী যেখানে এসে বাঁক নেবে, যেখানে প্রতিঘাত যত বেশি প্রবল হবে ও যত বেশি দ্রুত সে ফিরে আসবে তার পরিক্রমা শেষ করে তার প্রথম প্রারম্ভবিন্দুতে, তত বেশি সে রসোত্তীর্ণ হবে। এক কথায়, গল্প যদি না ঘুরল তবে সে বেঘোরে পড়ল; যদি চলতে চায় সে সিধে তবেই সে অসিদ্ধ।
তাই ছোটগল্প লেখবার আগে চাই ছোটগল্পের শেষ, কোথায় সে বাঁক নেবে, কোন্‌ কোণে। আর কোন রচনায় আরম্ভেই আমরা শেষ জেনে বসি না, না উপন্যাসে, না কবিতায়, না বা নাটকে। আমাকে কতগুলি চরিত্র দাও আমি উপন্যাস শুরু করে দিতে পারব, দাও একটা সংঘাতসঙ্কুল ঘটনা, তুলে দিতে পারব নাটকের প্রথম অঙ্কের যবনিকা–তিন ক্ষেত্রেই রচনার উত্তেজনায় লেখনীর দুর্বলতায় পথ বেটে চলে যেতে পারব এগিয়ে, কিন্তু শেষ না পেলে ছোটগল্প নিয়ে আমি বসতেই পারব না। শুধু ঘটনা যথেষ্ট নয়, শুধু চরিত্র যথেষ্ট নয়, চাই আমার সমাপ্তির সম্পূর্ণতা। সব জিনিস সমাপ্ত হলেই কোন সম্পূর্ণ হয় না কিন্তু ছোটগল্পের সমাপ্তিটা সম্পূর্তি হয়ে ওঠা চাই। তাই ছোটগল্পের কল্পনা কৃতারম্ভ নয়, কৃতশেষ। যতক্ষণ না আমি শেষ জানি ততক্ষণ আমি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার… আর সবকিছু, কিন্তু ছোটগল্প লেখক নই, ছোটগল্পের বেলায় চাই আমার শেষ, তাই হয়ত ছোটগল্প শেষ বা শ্রেষ্ঠ শিল্প।
গল্পকে বৃত্ত বলেছি বটে, কিন্তু তা অত্যন্ত লঘুবৃত্ত। তার বেষ্টনী বক্র, গতি দ্রুত, পরিসর ক্ষীণ, সমাপ্তি তীক্ষ্ণ। বেশি ভাব বইবার মত তার জায়গা নেই, বেশি কথা কইবার মত তার স্পৃহা নেই, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করার মত তার সময় নেই। সে এসেছে চোরের মত চুপি-চুপি, চোর বলে তাকে কেউ ধরতে না পারে। তার বেশবাস অল্প, আয়োজন সামান্য, পরিধি পরিমিত। শুধু তাকে ঘুরলেই চলবে না, কোন কেন্দ্রের উপরে কতটুকু জায়গা নিয়ে ঘুরবে তারও আগে থেকে নির্ধারণ চাই। এই নির্ধারণে যত বেশি নিষ্ঠা তত বেশি রসস্ফুর্তি। বৃত্তের বাইরে অর্থাৎ উদ্বৃত্তে সে পরাঙ্‌মুখ। উপন্যাসে সহ্য হয় উদ্ধৃত্তি, সহ্য হয় অপচয়, কবিতায় সহ্য হয় ইঙ্গিত, সহ্য হয় অস্পষ্টতা, কিন্তু ছোটগল্পে যেমন চাই স্পষ্টতা, তেমনি চাই সংযম, যেমন চাই সংকোচ তেমনি চাই সুব্যক্তি। জীবনের বিক্ষিপ্ত ও বিস্তৃতের মধ্যে থেকে সংক্ষেপে গ্রহণ বা এক কথায় সংকলনই হচ্ছে ছোটগল্পের উদ্দেশ্য, তার বাণ শব্দভেদী নয় লক্ষ্যভেদী। অর্থাৎ শব্দ শুনে অনুমানে সে তীর ছোঁড়ে না, সে জানে তার কি লক্ষ্য, সে লক্ষ্যভেদী। সত্যি করে বলতে গেলে, ভেদ করার চেয়ে বিদ্ধ করাই হচ্ছে ছোটগল্পের কাজ। ভেদ করা অর্থাৎ ছেদন করা বা বিদারণ করার মধ্যে শক্তির অপচয় আছে; কিন্তু লক্ষ্যমাত্র বিদ্ধ করা ঠিক তার পরিমিত শক্তির পরিচিতি। […]
পদ্মপাতায় নিটোল যে সম্পূর্ণ শিশিরবিন্দু, আপনার বৃত্তের মধ্যে সে সংহত, তেমনি হবে ছোটগল্প আপনার বৃত্তের মধ্যে বিধৃত পরিমিত; অকিঞ্চিৎকর চাঞ্চ্যল্যে তার ভারকেন্দ্র যাবে টলে, সে তার ধর্ম হারিয়ে হয়ে উঠবে হয়ত উপন্যাসের অংশবিশেষ। এই পরিমাণবোধ হচ্ছে ছোটগল্পের নিরিখ। সংস্কৃত সাহিত্যে যাকে বলেছে ‘লাঘবান্বিত’ অর্থাৎ ‘বিস্তরদোষশূন্য’- চাই সেই সংযম, সেই নিবৃত্তি। আমার যদি গাছ দরকার তবে তাতে আমি পাতা দেব না, যদি পাতা দরকার তবু আমি ছায়া বিছাব না তার তলায়। ঘোড়া যদি বা একটা ছোটাই তবে সেই সঙ্গে তার ল্যাজও ধাবিত হয়েছিল কিনা এ খবরে আমার দরকার নেই। যদি সোনার প্রজাপতি উড়ে বসে আমার কাদামাখা জুতোর উপর তবে দরকার নেই জানিয়ে সেই জুতো আমার চীনেবাড়ি না বাটা কোম্পানির থেকে কেনা। চাই নির্মম শাসন, ব্রতোদ্যাপনের নিষ্ঠা। প্রত্যেক আর্টই সজ্ঞান সক্রিয় সৃষ্টি।

x