ছেলেধরা সন্দেহে বাবাকেই গণপিটুনি

ঈশান মিস্ত্রির হাটে লঙ্কাকাণ্ড, এনায়েত বাজারে পাগলকে পিটুনি

আজাদী প্রতিবেদন

শনিবার , ১৩ জুলাই, ২০১৯ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
3592

একদিনে নগরীতে দুটি গণপিটুনি। দুটি ঘটনা ঘটেছে ছেলেধরা সন্দেহে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় ছেলেধরা সন্দেহে বাবাকেই গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। এ সময় তার সঙ্গে ছিল ভাইপো, ভাগনেসহ ৭ শিশু।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া ছয়টায় বন্দর থানার ঈশান মিস্ত্রির হাট এলাকায় বিমানবন্দর থেকে ফেরার পথে স্থানীয়দের গণপিটুনির শিকার হন রাশেদুল আলম। তিনি রাউজান উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মৃত মোহাম্মদ আলীর ছেলে। তাছাড়া রাত পৌনে আটটার দিকে কোতোয়ালী থানাধীন এনায়েত বাজার ২ নং সড়কে গণপিটুনির শিকার হন মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তি।
ভুক্তভোগী রাশেদুল আলম ও পুলিশের সঙ্গে কথা ১১ পৃষ্ঠার ৭ম কলাম
বলে জানা যায়, ঈশান মিস্ত্রির হাট এলাকায় গণপিটুনির শিকার রাশেদুলের ভাই মো. মোরশেদুল আলম মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে থাকেন। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোরশেদুলের ফ্লাইট ছিল। এর আগে বিকাল চারটায় ভাইকে বিদায় জানাতে একটি সিএনজি টেক্সি নিয়ে বিমানবন্দর গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে নিজের ৬ বছরের ছেলে, ভাইপো, ভাগনেসহ ৭ শিশুকে নিয়েছিলেন বিমানবন্দর দেখানোর জন্য। পৌনে পাঁচটার দিকে কাতারগামী ফ্লাইটে ভাই মোরশেদের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হওয়ার পর পাঁচটার দিকে বিমানবন্দর থেকে গ্রামের বাড়ি রাউজানের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে যানজটের কারণে সল্টগোলা ক্রসিং থেকে ঈশান মিস্ত্রির হাট সড়কে চলে যায় তাদের টেক্সি।
গতকাল রাত ১০টায় বন্দর থানায় কথা হয় গণপিটুনির শিকার রাশেদের সাথে। তিনি বলেন, আমাদের সিএনজি টেক্সিটি ঈশান মিস্ত্রির হাট সড়কে ঢুকে গেলে একজনকে মূল সড়কে বের হওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞেস করি। এ সময় আমার সাথে ৭ জন শিশু থাকায় একজন বাজারের ইজারাদার দাবি করে আমাদের বহনকারী টেক্সিটি আটকায়। তাদের বলি, আমি ছেলেধরা নই, সাথে থাকা শিশুদের মধ্যে একজন আমার ছেলে, বাকিরা ভাগিনা ও ভাইপো। আরো বলি, কারো সন্দেহ হলে আমাদের একটি রুমে নিয়ে যান অথবা কাছের থানায় নিয়ে যান। তারপরও মারধর করবেন না। এ সময় ইজারাদার দাবি করা ওই লোকটি লোকজন যোগাড় করে আমাকে পিটুনি দেয়। এক পর্যায়ে আমি জ্ঞান হারাতে থাকলে পাশের কয়েকজন লোক আমাদের উদ্ধার করে পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে আমাদের উদ্ধার না করলে হয়ত এতক্ষণে আমি লাশ হয়ে যেতাম।
তাদের বহনকারী টেক্সিটি (চট্টমেট্রো-দ-০২-৪৭৮৬) ভাঙচুর করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে। এ সময় উত্তেজিত জনতা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। সাদা পোশাকের কয়েকজন পুলিশ মারধরের শিকার হন। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে বন্দর থানায় নিয়ে আসে।
উদ্ধারকারী দলে থাকা বন্দর থানা পুলিশের এসআই আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে না গেলে নিশ্চিত মৃত্যু হত ওই ব্যক্তির। মূলত সাথে ৭টি শিশু থাকার কারণে লোকজন সন্দেহ করে তাদের আটক করে গণপিটুনি দেয়। আমরা ৭ শিশুসহ রাশেদকে উদ্ধার করে তাদের আত্মীয়-স্বজনকে খবর দিয়েছি। এখন তার স্বজনরা থানায় এসেছে।
পতেঙ্গা থানার ওসি সুকান্ত চক্রবর্তী বলেন, চারদিকে ছেলেধরা গুজব চলছে। ঈশান মিস্ত্রির হাট এলাকায় গণপিটুনির খবর শুনে দ্রুত ফোর্স পাঠিয়ে উত্তেজিত লোকজনের কাছ থেকে ভিকটিমদের উদ্ধার করেছি। ঘটনার শিকার ওই ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনরা এসে তাদের নিয়ে গেছেন।
এদিকে, গতকাল রাত পৌনে আটটার দিকে এনায়েত বাজার এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে মানসিক ভারসাম্যহীন এক ব্যক্তি গণপিটুনির শিকার হয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক তদন্ত মো. কামরুজ্জামান দৈনিক আজাদীকে বলেন, একটি ৭-৮ বছরের মেয়ে শিশু মানসিক ভারসাম্যহীন ওই ব্যক্তিকে ছেলেধরা মনে করে তার বাবাকে খবর দেয়। খবর পেয়ে শিশুটির বাবা ও স্থানীয় লোকজন উত্তেজিত হয়ে তাকে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে আমাদের ফোর্স ঘটনাস্থলে গিয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে।
প্রসঙ্গত, ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের কাটা মাথা দেওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজনকে অপহরণ করা হচ্ছে’। গত বেশ কয়েকদিন ধরে এমন গুজব ছড়িয়েছে সারা দেশে। বিষয়টি স্রেফ গুজব বলে পদ্মা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জানিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও গুজবে কান না দেওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

x