ছুটি

আনন্দময়ী মজুমদার

শনিবার , ২৪ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
21

কদাচিৎ ছুটি আমাদের হাতে উপুড় হয়ে পড়েছে। শিশুরা জানে, ছুটি বলে কিছু নেই। কেননা, ছুটিকে তারা আলাদা করতে পারে না।
ছুটি আসলে সিঁদকাঠি। কতোগুলো বই আর মুক্তোদানার মত ঝরঝর দেবোতাম সে ফেলে দিয়ে গেল কোলে। ঘুমের পাপড়িতে এঁকে দিয়ে গেল ছবি। নীল, মণিময়, বেগুনি, গোলাপ, কাজল। ছুটি আমাদের ছাড়তে চাইত না। তাই সিঁদকাঠি রেখে গেল।
সকলে একদিন জানাল, ছুটি চলে গেছে। সন্ধ্যার দইওয়ালা বলল, তার কাছে ছুটির হদিশ নেই। নীলাকাশ চোখ আর সুরের মত ঠোঁট অমলকে খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, জলের ছায়ার শোকে সে মাতাল হয়ে আছে। আহা, দুঃখফুল এনেছিল যেই মেয়ে সেই ক্যামেলিয়া আজও কুড়িয়ে আনে ফুটফুটে শিউলি। শিউলির করুণ বুকে ছুটির পথ আঁকা ছিল।
আমাদের তখন মাতাল করে তোলে ছুটির লোভ। লোভের রঙ টসটসে সবুজ। হাওয়ায় দোলা আঙুরখেত। ভুবন ফুরায় না অটোর বগবগে মেঠো রাস্তায়। সে গল্প পানের ডিবে থেকে সুপুরির ছাঁচ কেটে জরদার ভুরভুরে আলো আর চুনের বোঁটা বেয়ে কুলকুল নেমে আসে পাহাড়ী ঝরনার মত। অবাধ অথবা অনিরুদ্ধ।
অনিরুদ্ধ কাজী নজরুলের ছেলের নাম ছিল। অনিরুদ্ধ-ছুটি বললে আমাদের গানের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি এক লোকের শাদা-কালো ছবি ভেসে ওঠে, যার কোলে হাওয়াই গিটার। গিটার ছুটির খবর জানে সর্বদাই। দুই ঝুঁটি, তাজ্জব-চোখ আনাড়ি মেয়ে সামনে বসল। টুংটাং সুরের সাথে মন্দ্রিত অধীর পাখির আলোকিত উজান তাকে বলতে লাগল, তাড়া নেই, তাড়া নেই।
যারা ছুটির বাড়ি যেতে চাইল, তারা শূন্যতার চেয়ারে বসে, চশমা খুলে কপাল ভাঁজ করে বলল, এক তলিয়ে যাওয়া দ্বীপের নীলাভ জলকাচ নানা আলো ফেলে। ছুটি ওখানে থাকে। পাতালপ্রদেশে মোমবাতি-পাথর আর আকাশের ওপার হাওয়ার দুলুনিতে থাকে হিমবাহের কাছে। অনেক জাঁকজমক, অনেক চাহিদা মেয়েটার। ছুটির দিন আমরা সেখানে দাঁড়ালাম। অনেক ভিড় ছিল, সকলের হাতে ছিল মানচিত্র। পাহাড়ের পায়ের কাছে সরোবার। পাথরফেলা রাস্তায় আলো ঢলতে দেখি কেউ কোথাও নেই। একাকীত্ব। একাকীত্ব বেহালা বাজায়, একটু পয়সার জন্য। ছুটির হিসাব গুনে, পয়সা চুকিয়ে চলে গেছে আর সব। ছবি তোলা শেষ। পায়রা এসে খেয়ে গেল ছড়ানো রুটি। ছুটি থাকল না, শুধু ছবি তোলার বাক্সের নিচে পড়ে থাকল স্মৃতি আর স্মৃতি।
অনেক কিছু ভুলতে ভুলতে বড়ো হয়ে আমরা ছুটি চাইলাম কিনা জানি না। তবে সে এসে গেল ভোরের আজানের সঙ্গে একদিন। দরজা আধখোলা দেখে বলল, ব্রেড এন্ড ব্রেকফাস্ট হবে না, একটু ঠিকানা যদি পাই, ঠিকানা! সকালে উঠতে হবে। আমার কাছে অঢেল নুড়ি। দেখাব কাকে? সত্যজিতের ছবি আগন্তুকের কথা মনে পড়ে গেল।
ছুটি, ছুটবে না কথা দাও?
চাওয়া না চাওয়া সমান, এমন দুনিয়ায় হঠাৎ টের পেলাম, ছুটিও খুঁজছিল আমাদের। জন্মের সময় বিছড়ে যাওয়া শিমুল তুলোর মতো।

x