ছায়া প্র্রচ্ছায়া

সাবিনা পারভীন লীনা

মঙ্গলবার , ২ জুলাই, ২০১৯ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ
79

একটা মাঝারি মানের রেস্টুরেন্টের এক কোণে একাকি বসে আছে সাইফুল। কাঁচা সুপারি আর জর্দা দিয়ে পান খেয়ে ঘামতে থাকা তার দীর্ঘ দিনের অভ্যাস। গরম হোক আর ঠাণ্ডা হোক পান খেয়ে সে ঘামবেই। রেস্টুরেন্টের এসির ঠাণ্ডা বাতাসেও ঘামছে। কপালের ফোঁটা ফোঁটা ঘাম বাম হাতের তর্জনীতে মুছে মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখে। কপালের দুই পাশের রগ মোটা বক্ররেখার মতো দেখাচ্ছে। সামনের স্বচ্ছ কাচের টেবিলে নিজের ছবি দেখে হাসে মনে মনে; দুই পাশে লম্বা দুই গাছি চুল নেমে গেছে, প্রশস্ত কপাল, দুই দিন আগে কামানো গাল, সিগারেটের সেঁকাা খাওয়া পুরু ঠোঁট- অদ্ভূত লাগে নিজেকে।
ম্যাসেঞ্জারটা ওপেন করতেই দেখে বেশ কয়েকটা ছবি দিয়েছেন এই সময়ের আলোচিত ও প্রভাবশালী লেখক সুবির আজাদ। বাজারে সাত সাতটা উপন্যাস, পাঁচটা গল্পের বই, গোটা দুয়েক ভ্রমণকাহিনী; একুশে বই মেলায় শ’তিনেক বই বিকোলে যেখানে লেখক প্রকাশক খুশিতে আত্মহারা সেখানে সুবির আজাদের বিকোচ্ছে শয়ে শয়ে, অবশ্য এতে তার ক্ষমতার প্রভাবও কাজ করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা পুরষ্কারও বাগিয়ে নিয়েছেন, সরকারের মন্ত্রী এমপি আর সচিবদের সঙ্গে যে মাখামাখি তাতে বাঙলা একাডেমি কিংবা একুশে পদক পেতেও বেশি বেগ পেতে হবে না। কখন কাকে দিয়ে খেলিয়ে নিতে হয় এই বিদ্যায় তার সমতুল্য বিরল। সুবির আজাদের আরো ছবি; সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রীর সঙ্গে এক অনুষ্ঠানের ছবি। তার পর ম্যাসেজ: সাইফুল সাহেব আজ আর দেখা হবে না, এই অনুষ্ঠানের কথা ভুলেই গেছিলাম, ঢাকা থেকে মন্ত্রী এলেন কি আর করা। আপনার সঙ্গে আর একদিন দেখা হবে।’
বড় একটা নিশ্বাস ফেলে সাইফুল মোবাইলের স্ক্রিন অফ করে টেবিলে রাখে। শালা কয়দিন আগেও ভাই ভাই করে মুখে ফেনা তুলতো এখন বলছে সাইফুল সাহেব। আস্তে করে মানি ব্যাগটা বের করে পরিস্থিতি দেখে নেয়; এখনো এগারোশ টাকার মতো অবশিষ্ট আছে। এতোক্ষণ বসে থেকে কিছু অর্ডার না করা অভদ্রতা, সে ওয়েটারকে ডেকে একবাটি স্যুপের অর্ডার করে।
স্যুপের বাটির দিকে তাকাতেই সুমির মুখচ্ছবিটা ভেসে উঠে। মনে হচ্ছে স্যুপের বাটিতে সুমির রুগ্ন্ন ছবিটা দেখতে পাচ্ছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি দেখতে পাচ্ছে; তার কি মাথাটাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? স্যুপের বাটিতে সুমির ছবি আসবে কেন?
গতরাতের কথা মনে পড়ে তার, হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় পিপাসায়। বিছানা থেকে নামতে গিয়ে বুঝতে পারে পায়ের দিকে মাথা ঝুঁকে সুমি বসে আছে। কাছে গিয়ে মুখে হাত দিতেই কেমন ভেজা ভেজা লাগলো। দ্রুত লাইট জ্বালালো, ফ্যান ছাড়লো কাঁথা সরিয়ে কাছে এলো।
‘কি হলো, কেমন লাগছে তোমার, আমাকে ডাকোনি কেন, পানি খাবে? এতো ঘামছো কেন?’
মুখে কিছু না বলে বুকে হাত দিয়ে দেখালো। রান্না ঘরে গিয়ে চিনি আর পানি মিশিয়ে এনে গ্লাসটা সুমির হাতে দিল। নিজের গেঞ্জির সামনের অংশ টেনে ধরে মুখ মুছে দিল, নাইটির সামনের কয়েকটা বোতাম খুলে দিয়ে পত্রিকা নিয়ে বাতাস করতে লাগলো। আর কি করবে বুঝতে পারে না সে। কেমন লাগছে এখন, একটু ভালো লাগছে?
‘এতো অস্থির হইওনা, ঠিক হয়ে যাবে’- বলতে বলতে আবার নিথর হয়ে গেল সুমি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে তিনটা বাজে। লাইট ফ্যান বন্ধ করার আগে আধ লিটারের বোতলের সব পানি গলায় ঢাললো, বড় করে নিঃশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে বিছানায় এলো। সুমির পায়ের কাছে কাঁথাটা আধ খোলা করে রাখলো, নিজেরটা গায়ে জড়িয়ে চিৎ হয়ে সিলিং এর দিকে তাকালো। ড্যাম্প দেয়ালের গন্ধ,কয়েক জায়গায় চুন সিমেন্ট পড়ে লাল ইটের খন্ড বেরিয়ে আছে, ভ্যাগ্যিস বাবার কাছে এই মাথা গোঁজার ঠাঁইটা পেয়েছিল, না হলে এই কয় বছরে খড়কুটোর মতো কোথায় ভেসে যেত।
‘সব ঠিক হয়ে যাবে’ বললেও সে জানে, সুমিও জানে সব ঠিক হবে না। সুমির শরীরে কর্কটের আবাস । সুমির জন্য তার সাধ্যে যা আছে সব করেছে , আর পারছে না। তারও বুকের বামদিকে মঝেমাঝে ব্যথা করে। চেপে যাওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর নেই। এই কয়বছরে ডাক্তার হাসপাতাল নিয়ে কম অভিজ্ঞতা হয়নি। মাস দুয়েক আগে বন্ধু দিপুকে নিয়ে সপ্তাহ খানেক শেভরনে ছুটাছুটি করেছিল। এসব কাজে তাকে অনুরোধ করে বলতে হয় না পাশে থাকতে, সাধ্যাতীত শ্রম দিতে চেষ্টা করে। বুকে ব্যথা নিয়ে ভর্তি হলো।অনেক টেস্ট করা হলো, শেষে এনজিওগ্রাম করাতে গিয়ে ধরা পড়লো পাঁচটা ব্লক হার্টে। বাইপাস লাগবে না স্টেন লাগাতে হবে। সেদিনই পাঁচ লাখ টাকা জমা করতে হলো। দীপুর ব্যবসা ভালো, স্টাফ অফিস থেকে এনে টাকা জমা করলো। তার জন্য কে করবে, কেন করবে?
পান দোকানের ঠিক উল্টো দিকে একসময় গাছগাছালিতে ঢাকা টিনশেডের বাড়িটাতে উৎপলরা থাকতো। কতো আড্ডা হাসি গানে ভরা ছিল দিনগুলো। রাতের পর রাত নাটকের মহড়া শেষ করে বাড়ি ফিরতো না কেউ। লাল মেঝেতে পাটি বিছিয়ে এলোমেলো শুয়ে পড়তো তারা। উৎপলের ছোট বোন মৈত্রীর রেওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলে বাসি মুখে চপ্পল জোড়া পায়ে ঢুকিয়ে যে যার গন্তব্যে। সারাবেলা কলেজ, রাতে রিহার্সাল। উৎপলের নির্দেশনায় প্রথম যখন নাটক মঞ্চস্থ হলো; সেদিন কি উত্তেজনা সবার মধ্যে। সাইফুলেরও প্রথম গল্পের বই বের হয়ে গেছে তার কিছু দিন আগে। আর দীপঙ্কর নাটকের স্ক্রিপট লিখছে আর কাটছে, কোনভাবেই সন্তুষ্ট হতে পারছে না। সেই উৎপল এখন বউ-বাচ্চা নিয়ে কানাডা প্রবাাসী, দীপঙ্কর চাকরিজীবী-নাটকের পোকা অনেক আগে মাথা থেকে বের হয়ে গেছে।
বিল মিটিয়ে দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে চেরাগির মোড়ের দিকে হাঁটতে থাকে সাইফুল। মোড়ে নুর মিয়ার দোকানে এসে সিগারেট ধরায়।
সাইফুলের পনি টেইল বাঁধা চুলের দিকে তাকিয়ে নুরু। বদ্দা, মাথাত শ্যাম্পু দিয়ুন,সাদা সাদা ময়লা দেহা যার।
‘অডা…এগিন ময়লা ন খুশকি, শীতহাল আইলি বাড়ে। মানিব্যাগত ট্যাঁয়া হম থাকিত ফারে, কিন্তু হাচাড়া ন থাকি,কী বুঝিলি হা হা হা।’
রিংটোন বেজে বেজে বন্ধ হলো আবার বেজে চলেছে…।
পকেট থেকে মোবাইল বের করে, সুমির ফোন। কল্‌ রিসিভ করে। ‘ না দেরি হবে না, চলে আসবো। না না ওই লোক আসেনি ..বাসায় এসে বলবো।’
‘কি রে সাইফুল, একা একা দাঁড়িয়ে আছিস, তোর বন্ধুবান্ধব কই আজ’ -বলেই টিটু কাঁধে হাত রাখলো।
‘কেন, আজ সকালে এফ এম রেডিওতে খবর শুনিসনি…’-‘কিসের খবর ?’
হা হা হা, টিটু সন্ধ্যায় চেরাগির মোড়ে আসবে সাইফুলের সঙ্গে দেখা হবে। বলবে,’বন্ধু কী খবর বল, কতোদিন দেখা হয়নি…’ হা হা হা। একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো তারা।
‘ গেলো মাসে প্রেসক্লাবের সামনে দেখেছি চার বান্ধবীর সাথে,কী যে মজায় আছিস তুই! কী যেন নাম, ওই যে দেওয়ানজি পুকুর পাড়ে বাসা ছিল। মাথা চুলকে নাম মনে করার চেষ্টা করলো টিটু। কেরাণিগিরি করতে করতে মাথাটা একেবারে গেছে। কী আশ্চর্য, ওদের নামটা ভুলে গেলাম!
‘পারমিতাদের কথা বলছিস?’
হ্যাঁ সেদিন সন্ধ্যার একটু আগে বাতিঘরে দেখা হলো, গল্প হলো অনেকদিন পর। পারমিতা, ছন্দা, নার্গিস, শান্তা সবাই এলো। ওদের সাথে ফোনে যোগাযোগ হয় মাঝেমাঝে। রান্না-স্বামী-সন্তান করতে করতে ওরা বেশ হাঁপিয়ে উঠেছে। এখন একটু প্রাণ খুলে হাসতে চায়,গল্প করতে চায়। এই চাটগাঁ শহরে এই বান্দা সাইফুল ছাড়া আড্ডা দেয়ার কে আছে? আচ্ছা,তুই আমাদের দেখেও পাশ কাটিয়ে চলে গেলি কেন? এভয়েড করলি! তুই অনেক পাল্টে গেছিস টিটু।’
‘আড্ডা দিতে খুবই ইচ্ছে করে এখনও। সময় বের করতে পারি না আর শরীরেও কুলায় না। সেই সকালে বের হই, ইপিজেড থেকে বাস এসে পৌঁছাতে প্রায় আট টা। রাস্তা কেটে খুঁড়ে কী যে বাজে অবস্থা এখন। মাঝেমাঝে মনে হয়, এমন কোন দেশে যদি যেতে পারতাম। যে দেশে কোন উন্নয়ন হচ্ছে না।’
প্রতিভাসের দিনগুলো খুব মিস্‌ করি। পরাগ তুই, সবাই ছেড়ে গেলেও অনিরুদ্ধ এখনো রয়ে গেছে নাটকে। ওর ইন্টার্ভিউ, নাটক নিয়ে লেখা কলাম পত্রিকায় পড়ি, ভালো লাগে। আমাদের মধ্যে তুই ছিলি সবচেয়ে প্রতিভাবান। আমাদের প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরার বয়সে তোর গল্পের বই বের হলো, এর দুই বছর পর কবিতার বই একটা। ওই বয়সে হৈচৈ ফেলে দিলি। আমার বলতাম তুই অনেক দুর যাবি, এক সময় তোর বন্ধু বলে অন্যরা আমাদের ঈর্ষা করবে। তার পর সুমির সঙ্গে সম্পর্ক; আর লিখলি না। আচ্ছা সুমি কেমন আছে?
‘আছে, ভালো আছে।’
প্রতিদিনের এই দৌঁড়ে ক্লান্ত আমরা, একেবারে ক্লান্ত। জড়বস্তু হয়ে গেছি।
হঠাৎ টিটু সাইফুলের শার্ট শক্ত করে ধরে বলে, ‘তুই কিছু লিখিস না কেন? সবাই ছেড়ে দিলে সমাজ চলবে কি করে?’
সহসা শার্ট ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করে টিটু বলে,‘ সরি দোস্ত।’ ঘটনার আকস্মিকতায় বিহ্বল সাইফুল মনে মনে বলে,‘ ছেড়ে দেইনি বন্ধু, এই করেই তো পেট চালাচ্ছি। আর সমাজ ! সমাজ দিয়ে কি হবে?’
‘আচ্ছা, দীপেন এখন কি করে, আমাদের মধ্যে কড়া বামপন্থী কর্মী ছিল সে।’
সিগারেট ধরাতে ধরাতে সাইফুল বলে, ‘জানি না। ওই সময়ে তো ডেডিগেটেড, এখন হয়তো বুর্জোয়াদের পা চাটছে, আমাদের এখানে যা হয় আরকি। যৌবনে কড়া বাম, পাকলে কড়া ডান। ’
‘ এটা একটা কমন কথা, এখানে পাকা বামও আছে। আমরা বামদের তিরষ্কার করে মজা পাই, এটা নিজেদের অক্ষমতা ঢাকার চেষ্টা।’
‘ওরে বাবা, তুই দেখছি বামের এজেন্ট হয়ে আছিস।’
‘ তোকে একটা কথা বলব?’
‘কথা তো বলেই চলছিস, বল।’
শাওন সেদিন বলছিলো, তুই নাকি পত্রিকার চাকরিটা আবার ছেড়ে দিয়েছিস। আর কোথাও জয়েন করলি, এতো বার চাকরি ছাড়িস কেন? একটু মানিয়ে মানে কিছুটা আপোষ করে চলতে পারিস না? এই দেখ আমরা সবাই আপোষ করে করে কতো সুন্দর দিন কাটিয়ে দিচ্ছি।
টিটুর কথা শুনে সাইফুল হাসে, তুই দেখছি তলে তলে আমার অনেক খবর রাখিস।
‘হাসিস কেন, হাসির কি বললাম?’
‘হাসবো না কি করবো? আপোষ করেতে করতে আরশোলা হয়ে গেলাম, এই শহরে আমার মতো আপোষকামী কয়জন আছে। আরশোলা চিৎ হলে কি করে দেখেছিস, আমাদের আর আপোষ করার কিছু বাকী নেই, চিৎ হওয়া আরশোলার মতো ধড়ফড় করছি। চাকরি ছেড়েছি অন্য কারণে, চাকরি করতে ভালো লাগে না তাই।’
‘তোর পাগলামিটা আর গেল না। বাসা থেকে বারবার ফোন করছে, আজ যাই আর একদিন কথা হবে বন্ধু’- বলে হাত মিলিয়ে দ্রুত হাটতে থাকে টিটু।
‘এই এক অদ্ভূত চিড়িয়া আমরা। বামদের নিন্দা সহ্য হয় না, আবার আপস করার পরামর্শ দেয় আবার বউয়ের ফোন পেয়ে বন্ধুকে ফেলে দৌড় দেয়, শালা একটা স্নব কোথাকার।’

******
আজও সেই রেস্টুরেন্টের এক কোণে সাহিত্যিক সুবির আজাদের জন্য অপেক্ষা করে সাইফুল। আজ আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করেতে হয় না, দ্বোতলা থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একটা সাদা ধবধবে গাড়ি এসে থামল রেস্টুরেন্টের গেটে।
তার পরনে লাল ফতুয়া আর জিন্স। বয়স পঞ্চাশের উপরে। সুবির আজাদ সাইফুলের মুখোমুখি বসেই সরাসরি বলতে শুরু করলেন.‘সাইফুল সাহেব আপনার আর দেওয়ার কিছু নেই, সব ফুরিয়ে গেছে। অবশ্য আপনার দোষ দিচ্ছি না, অনেকেই সময়ের আগে রিক্ত হয়ে যায়, তবে আপনি একটিু তাড়াতাড়িই নিঃশেষ হয়ে গেলেন এই আর কি। সবাই তো আর রবীন্দ্রনাথ না। এইবারের লেখাটা কি লিখেছেন,ছাপালে আমার মান সম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আপনি ভেবে দেখেছেন?’
সাইফুল সুবির আজাদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, তার কোন কথাই তার মাথায় ঢোকে না। মনে হচ্ছে তার সামনে যিনি বসে আছেন তিনি এতো দিনের চেনাজানা সুবির আজাদ নয়, সুবির আজাদের মতো অন্য কেউ। এতো তাড়াতাড়ি মানুষ পাল্টে যেতে পারে ভাবতেও পারছে না। যে মানুষ কাচুমাচু হয়ে ভাই ভাই করতো সে এখন কতো দাপুটে মানুষ। ক্ষমতা খ্যাতি দিয়ে একটা শিয়াল শাবক কিভাবে বাঘ হয়ে উঠতে পারে এই লোকটাকে না দেখলে বুঝাই যেত না। অবশ্য পাণ্ডুলপি হাতে পেয়ে ‘আরেকটু ভালো আশা করছিলাম’ জাতীয় কথা বলেছেন তাকে চাপে রাখার জন্য। এবার বলার ধরন অন্য রকম; কিছু দিন থেকে এবয়েড করছেন।
‘আপনার কথা আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’
‘বুঝতে পারছেন না? বলছি আপনাকে দিয়ে আর হবে না। আপনার দেয়ার কিছু নাই আর,ইউ আর ফিনিসড।’
‘আমাকে দিয়ে না হলে হবে না, আমি আপনাকে জোর করছি না।’
‘আপনার এই বই আমি ছাপবো না, আমার মানসম্মানের হানি হবে।’
‘এই সাইফুলের জন্যই আজ আপনার এতো খ্যাতি, এতো সুনাম, সাহিত্যিক অঙ্গনে সুপ্রতিষ্ঠিত, কেবল তাই নয় সমাজে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি-এতো তাড়াতাড়ি সব ভুলে গেলেন?’
‘তার জন্য আমি পে করেছি।’
‘টাকা দিয়ে সব হয়, টাকাই সব?’
‘হলো না কোথায়? হলো তো! এখন টাকাই সব। যাক, আপনার সঙ্গে আমি তর্কে যাবো না। আপনার সঙ্গে সম্পর্কটা আদান প্রদানের, আমি আর আপনার লেখা নিচ্ছি না, এটাই ফাইনাল। উপন্যাস না কি ছাই লিখেছেন সেটাও ছাপছি না। অতএব সম্পর্ক এখানেই শেষ। তবু কষ্ট করে লিখেছেন তার জন্য পে করবো।’
কথাগুলো শেষ করতে না করতে পকেট থেকে একটা সাদা খাম বের করে সাইফুলের দিকে অবজ্ঞাভরে এগিয়ে দেয়।
‘এখানে যে টাকা আছে তা আপনার পারিশ্রমিকের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। আমি মনে করি আজ থেকে আপনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ, আমি আপনাকে চিনি না, আপনিও চেনেন না, এর বাইরে নিশ্চয় আপনি কিছু করতে যাবেন না, আপনি বুদ্ধিমান মানুষ কি বলতে চাইছি নিশ্চয় আপনার না বুঝার কথা নয়।’
সুবির আজাদ কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন এবং হাত মিলিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেলেন। সাইফুল সাদা খামটা পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে সুবির আজাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কিছু সময় বসে থাকার পর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় সাইফুল, নিজের শরীরটাকে পাহাড়ের মতো ভারি মনে হয়। রাস্তায় নেমে এসে বড় করে নিঃশ্বাস নিয়ে মানিব্যাগে খামটা রেখে এদিক ওদিক তাকালো। অকারণে রাবার ব্যান্ডটা চুল থেকে খুলে নিয়ে আবার বাঁধলো। বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে মোমিন রোডের রাস্তা ধরে ধীর গতিতে এগিয়ে যায় সাইফুল।
নতুন রেস্টুরেন্টটা বেশ জমে উঠেছে। পাশেই বিউটি পারলার। কয়েকজন হেসে হেসে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, কেউ দুই ঠোঁটের ফাঁকে টুথ্‌ পিক নিয়ে নামছে। মুখে এসে পড়েছে লাল নীল আলো। বড় নালাটার পাশ দিয়ে সাইফুল হেঁটে যেতে যেতে দেখলো-রেস্টুরেন্টের বাইরের দেওয়ালে যেখানটায় অন্ধকার, সেখানে বড় পাইপ দিয়ে শব্দ করে বেরিয়ে আসছে ময়লা পানি।
******
উঁচু বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে সুমি। মশারি গুজে দিয়ে সুমির পাশে সাইফুলও আয়েশ করে বসে।
‘তোমার সুবির আজাদের খবর কি?’
‘তার কথা বলো না, শালা একটা খবিশ। খ্যাতি পেয়ে গেছে, এখন আর আমার দরকার নাই।’
‘ সে আসলে তোমাকে ভয় পাচ্ছে, যদি কোনভাবে সত্য ফাঁস হয়ে যায় তখন তার খ্যাতি যশ সবকিছু মাটি হয়ে যাবে।’
সাইফুলের মুখে সুবির আজাদের সব কথা শুনে সুমি বলে,‘ভালোই হয়েছে, তুমি এবার নিজের জন্য লেখ। আমার যা হবার হবে। টাকা পয়সা কমতো খরচা করোনি, টাকা ঢেলেও আমার অসুখ ভালো হবে না।’
‘হুম, দেখি কি করা যায়।’
সাইফুল কথাটা আস্তে করে বলে স্থবির হয়ে বসে থাকে। সুমিকে বাঁচিয়ে রাখতে অনেক টাকা দরকার, ডাক্তার বলেছেন তার অবস্থা উন্নতির দিকে। এই সময় ঠিকমতো চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া জরুরি। এই সময়টায় শালা গাদ্দারি করলো। বই লিখে আর কয় টাকা পাওয়া যাবে, প্রতিষ্ঠিত হতে যে সময় লাগবে তাতে সুমিকে আর বাঁচানো যাবে না।
‘তুমি অতো চিন্তা করো না তো, খালেদ ভাইকে আমি বলে দেব তুমি আবার পত্রিকায় জয়েন করো, আমার চিকিৎসা পরে দেখা যাবে সংসারটা আগে চলুক।’
কড়া ঘুমের ওষুধের কারণে কিছুক্ষণের মধ্যে সুমি ঘুমিয়ে গেলেও সাইফুলের চোখে কোন ঘুম নেই। নিঃশব্দে খাট থেকে নেমে সরু বারান্দায় গিয়ে ভাঙা চেয়ারটায় বসে সিগারেট ধরায়। একে একে চারটা সিগারেট শেষ করে। একটু আগে আর্তনাদ করতে করতে একটা অ্যাম্বুলেন্স জেমিসন মেমন হাসপাতালের দিকে ছুটে গেল।পাহাড় কেটে তৈরি বলে বাড়িটা একটু উঁচুতে। স্ট্রিটলাইটগুলোর হালকা আলোয় দেখতো পায় দুইজন ভবঘুরে টাইপের লোক কি যেন শলাপরামর্শ করছে গলির শেষ মাথায়। কয়েকটা কুকুর সতর্ক পায়চারি করছে। টহল পুলিশের গাড়ি এসে থামলো গলির মাথায় রশিদের দোকানের সামনে। টহল পুলিশের গড়ি দেখে সাইফুল গলা বাড়িয়ে ভবঘুরে লোক দুইটার অবস্থান বুঝার চেষ্টা করে। কিন্তু লোক দুটিও মুহুর্তে হাওয়ায় যেন মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরে একটা রিকসা এসে থামলো টিনসেডের বাসাটার সামনে। মাঝবয়সী দুটো লোক নামল, এই এলাকায় দেখেছে বলে মনে হলো না। লোক দুটো ভাড়া মিটিয়ে সরু গলি দিয়ে ভিতরে চলে গেল। রিকশাটা ঘুরিয়ে কিছু দূর এগুতেই একদল কুকুর চিৎকার করে উঠে। কুকুরের চিৎকারে ঘরদোর যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে; কুকুরের গলায় যে এতো জোর তার জানা ছিল না। রাত কতো হতে পারে, দুইটা তিনটা? উঠে গিয়ে ঘড়ি দেখলেই হয়, কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করছে না। রাতটা যদি আর ভোর না হতো, সুমি এভাবে ঘুমিয়ে থাকতো, সে এভাবে জেগে থাকতো কেমন হতো? দূর এসব কি ভাবছে সে। এসময় মসজিদে মুয়াজ্জিনের গলা; ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার্‌্‌্‌ ্‌, , ..”
আজান শেষে সাইফুল ধীরে ধীরে মশারি তুলে সুমির পাশে শুয়ে পড়ে নিশব্দে।

********
নুরু মিঞার সামনে হাত বাড়িয়ে, ‘কেছা সুয়ারি আরেককানা বাড়াই দিও নুরু।গতখাইল ফানর দাম ন দি ফানলার, দরো লও। সাইফুল এখন জামালখান হয়ে ইসপাহানি হয়ে যাবে জিইসির মোডে, সিনিয়র বন্ধু স্বপনদার বাসায়। স্বপনদার সি এন্ড এফের ব্যবসা, এর মধ্যে অনেক টাকা করেছে। একসময় সাহিত্য পত্রিকা বের করার চেষ্টা করেছেন, কয়েকটা সংখ্যা বেরও করেছেন। স্বপনদা যেতে বলেছেন রাত আটটায়, এখনো হাতে ঘণ্টাখানিক সময় আছে।
ঘড়িটা আরেকবার দেখে পান চিবুতে চিবুতে সিগারেট ধরায় সাইফুল। এসময় দেখে ঝর্ণা হন্তদন্ত হয়ে তার দিকেই আসছে, মুখটা থমথমে মনে হচ্ছে কারো ওপর রেগে আছে। ঝর্ণা বন্ধু সুশান্তের ছোট বোন, সেই সুবাদে সাইফুলকে দাদা বলে ডাকে।
‘ডিউটি শেষ, এতো তাড়াতাড়ি আজ?’
কোন উত্তর না দিয়ে সাইফুলের কনুই ধরে টানতে টানতে সাধুর মিষ্টির দোকানে নিয়ে গেল ঝর্ণা। চোখ খানিকটা ছোট করে ঝর্ণার দিকে তাকালো, ‘কি হলো তোর, এখানে কেন আনলি, কারো সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?’
একটা মিস্টি পুরোটা মুখে দিয়ে সাইফুল ঝর্ণাকে বলে, ‘খা খা আগে মিস্টি খা, পরে তোর কথা শুনবো।’
কাঁটা চামচে কেটে মিষ্টিটা খেয়ে ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে পানি খায় ঝর্ণা। সাইফুল ভাবে কি এমন কথা যার জন্য এতো অস্থির হয়ে তাকে খুঁজছে। পানি খেয়ে সাইফুলের দিকে করুণ চোখে তাকালো একবার, তারপর চোখ নামালো। মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল,‘তুমি আমাকে যে চাকরিটা করতে দিয়েছ সেটা আমি করতে পারবো না। দাদাকে এই কথা বলব কি করে?’
‘ কেন কি হয়েছে?’
‘ তেমন কিছু হয়নি, তবে আমি চাকরিটা করবো না।’
‘ কিছু একটা হয়েছে, কি হয়েছে সেটা বলবি তো..।’
‘ কি হয়েছে সেটা তুমি জানতে চেও না, চাকরি করবো না এটাই ফাইনাল।’
সাইফুলের চোখমুখ সহসা শক্ত হয়ে যায়, কিছু একটা ঝর্ণার সঙ্গে হয়েছে না হলে তাদের পরিবারের যে অবস্থা মেয়েটা চাকরি ছাড়ার কথা নয়। কি হয়েছে সেটা জেনে নেওয়া কঠিন হবে না। সম্পাদক শাহরিয়ার একটা বুড়ো বদমায়েশ, ঝর্ণার দিকে নজর দেয়ার সাহস তার হওযার কথা নয়।
‘তুমি আবার এটা নিয়ে ঝগড়াঝাটি করতে যেও না।’
‘ না করবো না।’
পরিবেশ হালকা করার জন্য ঝর্ণা বলে, ‘দাদা তুমি লেখা ছেড়ে দিলে কেন? কতোজন কতো কিছু লিখে বিখ্যাত হয়ে গেল, সুবির আজাদের অবস্থা দেখ না। একটা কাগজ পারলে তাকে মাথা দিয়ে ঠেলে উপরে উঠিয়ে দেয়।’
সুবির আজাদের কথা শুনে সাইফুল কিছুটা বিরক্ত হলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,‘উঠাতে দে, ওরা যেদিন মাথা নামিয়ে নেবে সেদিন ধপাস করে পড়ে যাবে। কাজ শেষ হলে মাথা নামিয়ে নেবে অবশ্যই।’
‘সুবির আজাদকে দিয়ে ওদের কি কাজ?’
‘আরে বোকা মেয়ে, সুবির আজাদের সঙ্গে মন্ত্রী মিনিস্টারের উঠাবসা, তাকে হাওয়া দিতে পারলে পত্রিকা সেইফ। যেদিন এই দহরম মহরম থাকবে না সেদিন সুবির আজাদকেও ছুড়ে ফেলে দেবে। যাক, এসব. আমি এখন জিইসির মোড়ে যাবো, তোর সঙ্গে পরে কথা হবে।’
ঝর্ণাকে রিকসায় উঠিয়ে দিয়ে সাইফুল জামালখানের দিকে হাঁটতে থাকে।
*****
সুমি বারবার রিং করে সাইফুলের ফোনের সুইচ অফ পাচ্ছে; মোবাইলের স্ক্রিনের ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা, এতো রাত পর্যন্ত কখনোই বাইরে থাকে না, আবার কখনোই সুইচ অফ থাকে না। কোন কারণে দেরি হলে নিজেই ফোন করে জানিয়ে দিতো। তা হলে কোন বিপদে পড়েছে সাইফুল? কাকে ফোন করে খবর নেবে। বহু কষ্টে নিজের জীর্ণ শরীরটাকে নিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে।পাশাপাশি দুটি ছবি,একটা তাদের বিয়ের দিনের ছবি। অবশ্য দেখলে কেউ বুঝবেনা,এটা বিয়ের দিনে তোলা। সাইফুলের পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর তার পরনে জরি পার তাঁতের শাড়ি। সুমির পরিবারের অসম্মতিতে এই বিয়ে রেজিস্ট্রি করেই হয়েছিল। একেতো বিত্তশালী তার ওপর সামাজিকভাবে প্রচণ্ড দাপুটে একজন মানুষ ছিলেন তার বাবা। কখনো মেনে নিতে পারেননি একমাত্র মেয়ের এই সিদ্ধান্তকে। বিয়ের পর সুমি বাবার বাড়িতে প্রবেশ করতে পারেনি। বাবার মৃত্যুর পর মায়ের কাছে মাঝে মাঝে যেত।মা না থাকায় এখন আর ভাইরাও কোন সমপর্ক রাখে না। দেয়ালে ঝুলানো সাইফুলের জলরঙ পোট্রেটের দিকে তাকিয়ে থাকে; সাইফুলের কথাই ভাবে সে, লোকটা কি পেয়েছে জীবনে? ইচ্ছা ছিল বড় লেখক হবে; লেখক সে হয়েছে, লিখেছেও দুই হাতে কিন্তু সেই সত্য সে ছাড়া দুনিয়ার আর কেউ তো জানে না, অবশ্য আর একজন জানে সে হচ্ছে এই সময়ের বিখ্যাত লেখক সুবির আজাদ।
লোকটা সরকারের আনুকূল্য পেয়ে হাওয়ায় ভাসছে। আজ এই সভায় কাল সেই সভায় বক্তৃতা দিচ্ছে, তাকে ঘিরে আছে বিশাল ভক্তকুল যাদের অধিকাংশই তরুণী। আচ্ছা সাইফুলও কি এভাবে খ্যাতির শিখরে উঠতে পারতো, এইভাবেই তরুণী বেষ্ঠিত হয়ে থাকতো, এই সভা সেই সভা, ভক্তদের সামলানো অটোগ্রাফ দেয়া শেষ করে বাসায় এসে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ত?
দূর এসব সে কি ভাবছে, সাইফুল জাত লেখক সে সরকারের আনুকূল্য নিতে যাবে কেন, সিরিয়াস লেখকদের এতো ভক্তও থাকে না; থাকলেও তার মতো সব সিরিয়াস পাঠক। কিছু লেখা তবে ..।
এসময় রিংটোন বেজে উঠে, নিশ্চয় সাইফুলের ফোন। কোথায় যে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আড্ডায় আটকে গেল কে জানে। ফোনটা কাছে নিয়ে দেখে আন-নোন নাম্বার। এতোরাতে আন-নোন নাম্বার থেকে ফোন, ধরবে কি ধরবে না ভাবতে ভাবতে সংযোগ কেটে গেল।
কিছুক্ষণ পর আবার রিংটোন বেজে উঠল। এবার কলটা রিসিভ করে সুমি।
‘অনে সাইফুল সাবঅর মিসেস না?’
‘জি জি,আপনি কে বলছেন?’
দরন হতা হন;–‘ হ্যালো,সাইফুল সাহেব খুন হয়েছেন,জি ইসির মোড়ে। চকবাজার মেডিকেলের মর্গে তার লাশ আছে।’

x