চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ৮ম শঙ্খসেতু

রচিত হবে চন্দনাইশ-সাতকানিয়ার সেতুবন্ধন

মুহাম্মদ এরশাদ : চন্দনাইশ

সোমবার , ৬ মে, ২০১৯ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ
288

মাঝ বরাবর বয়ে গেছে খরস্রোতা শঙ্খনদী। নদীর পশ্চিম পার্শ্বে চন্দনাইশের দোহাজারী পৌরসভা আর পূর্ব পার্শ্বে সাতকানিয়ার পুরানগড় ইউনিয়ন। আর যুগ যুগ ধরে এই শঙ্খনদীর জলরাশির মধ্য দিয়ে দোহাজারী পৌরসভা ও পুরানগড় ইউনিয়নসহ আশপাশের ইউনিয়নগুলোর লোকজনের মাঝে বিভাজনের একটি ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছিল। স্বাধীনতার প্রায় ৪৯ বছর পর শঙ্খনদীর এই চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ৮ম শঙ্খসেতু। ইতিমধ্যে স্থানীয় সাংসদ আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী দোহাজারী চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় সেতু নির্মাণের ভিত্তি ফলক উন্মোচন করেছেন। আর এই সেতুটি নির্মিত হলেই সরাসরি সেতুবন্ধন রচিত হবে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলাবাসীর মধ্যে। আর এ সেতু নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর উম্মোচনের পর থেকেই শঙ্খনদীর দু’পাড়ের মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। এই সেতুটি নির্মিত হলেই দূরত্বও কমে আসবে পার্বত্য জেলা বান্দরবানের সাথে। দূর্ভোগ লাঘব হবে চন্দনাইশ উপজেলার দোহাজারী পৌরসভা, দুর্গম ধোপাছড়ি ইউনিয়ন ও সাতকানিয়া উপজেলার পুরানগড়, বাজালিয়া ইউনিয়নসহ আশেপাশের লক্ষাধিকেরও বেশি জনগণের।
আগামী অর্থ বছরেই সেতুটি নির্মাণের বরাদ্দ পাওয়ার আশা করছেন উপজেলা প্রকৌশলী ম. বিল্লাল হোসেন। তিনি বলেন ইতিমধ্যে বুয়েটের প্রতিনিধি দল দু’বার সেতু নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন।
জানা যায়, এ একটি সেতুর অভাবে চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় নৌকা এবং পায়ে হেটে শঙ্খনদী পাড়ি দিতে গিয়ে যুগ যুগ ধরে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাজার হাজার সাধারণ জনগণকে। বিশেষ করে মহিলা ও শিশুদের ক্ষেত্রে দুর্ভোগের মাত্রা হয়ে উঠে অবর্ণনীয়। এছাড়া স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদেরও সীমাহীন কষ্ট ভোগ করতে হয়। বর্ষাকালে এ দুর্ভোগ আরো চরমে উঠে। তাছাড়া শঙ্খনদীতে উঠা-নামা করতে গিয়ে পা পিচলে পড়ে প্রায় সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। একইসাথে ধোপাছড়ি, পুরানগড় এবং বাজালিয়া ইউনিয়নের হাজার হাজার একর জমিতে উৎপাদিত মৌসুমী ফসলগুলো বিক্রি করার জন্য নদী পাড়ি দিয়ে আসতে হয় দোহাজারী রেলওয়ে স্টেশন ময়দানে। বর্ষা মৌসুমে নৌকা করে সবজি পরিবহনের সময় প্রায় সময় নৌকা ডুবে প্রচুর সবজি নদীর জলে ভেসে যায় কৃষকদের। নৌকা ডুবে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে প্রতিবছর। শঙ্খনদের উপর শুধুমাত্র দুই থেকে আড়াই’শ মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণ করে দু’পাড়ের মানুষদের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনায় এই দীর্ঘ সময়ে কেউ কোনদিন এগিয়ে আসেনি। নদীর এপার ওপারের লোকদের দীর্ঘ ৪৭ বছর চরম দুর্ভোগের মাঝেই কাটাতে হয়েছে। অথচ এই পথে যাতায়াতকারী চন্দনাইশের দোহাজারী, ধোপাছড়ি এবং ওপারে সাতকানিয়ার পুরানগড়, বাজালিয়া ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক লোকের প্রাণের দাবি ছিল চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় একটি সেতু নির্মাণের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী থাকাকালীন সময় এ এলাকা পরিদর্শন করে চৌকিদার ফাঁড়ি ঘাটে একটি সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং অভিভাবকহীনতার কারণে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেওয়ার দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও সেতুটি নির্মাণ সম্ভব হয়নি।
ধোপাছড়ি শঙ্খেরকূল এলাকার মোহাম্মদ মোস্তাক জানান, দুর্গম ধোপাছড়ি থেকে চন্দনাইশ সদরে প্রশাসনিকসহ অন্যান্য কাজে আসা লোকজনদের ২ বার শঙ্খনদী পাড়ি দিয়ে আসতে হয়। এক্ষেত্রে ধোপাছড়িবাসীদের প্রথমে ধোপাছড়ি বাজার থেকে নৌকা করে শঙ্খনদী পার হয়ে আসতে হয় সাতকানিয়ার শীলঘাটা বাজারে। সেখান থেকে সিএনজিযোগে পুরানগড় নয়াহাট এসে আবার দ্বিতীয়বার নৌকাযোগে শঙ্খনদী পার হয়ে আসতে হয় দোহাজারী চৌকিদার ফাঁড়ি ঘাটে। সেখান থেকে আবার সিএনজিযোগে দোহাজারী পৌর সদরে এসে মহাসড়ক হয়ে যেতে হয় চন্দনাইশ উপজেলা সদরে। এভাবে যাতায়াতে প্রচুর সময় অপচয় হয়। সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে যেমন এ ইউনিয়নের মানুষ বঞ্চিত তেমনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থায়ও পিছিয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, এ সেতুটি নির্মিত হলে ধোপাছড়ির সাথে দোহাজারীর দূরত্ব কমে আসবে এবং অবর্ণনীয় দুর্ভোগ থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে ধোপাছড়িবাসী।
স্থানীয় শ্রমিকলীগ নেতা মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, শঙ্খনদী পার হয়ে সাতকানিয়ার শীলঘাটা থেকে সিএনজিযোগে পুরানগড়, বাজালিয়া, কেরানীহাট হয়ে চন্দনাইশে আসা যায়। তবে এক্ষেত্রে দূরত্ব যেমন বেশি, যাতায়াত খরচও অনেক বেশি। চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় ব্রিজটি নির্মিত হলে ধোপাছড়ির সাথে উপজেলা সদরের দূরত্ব অনেক কমে আসবে। এতে উপজেলা সদর বা দোহাজারী থেকে সরাসরি শীলঘাটা আসা যাবে। এতে যাতায়াত খবর যেমন কমবে তেমনি দূরত্বও কমে আসবে। সাবেক দোহাজারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বেগ ও উপজেলা কৃষকলীগ সাধারণ সম্পাদক নবাব আলী বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যত বারই জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছে ততবারই বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ভোট চাইতে এসে লালুটিয়া চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় একটি সেতু নির্মাণ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যেতেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় পৌঁছে যাওয়ার পর কেউ আর তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতো না। গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর আলহাজ্ব নজরুল ইসলাম চৌধুরী এমপি সংসদের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে শঙ্খনদীর চৌকিদার ফাঁড়ি এলাকায় সেতু নির্মাণের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। সাংসদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর একনেকে পাস হতে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে সেতুটি। ইতিমধ্যে বুয়েটের প্রতিনিধি দল বেশ কয়েকবার চৌকিদার ফাঁড়ি শঙ্খসেতুর স্থান নির্বাচন, পরিবেশগত সমস্যা এবং ব্যয় বরাদ্দের ব্যাপারে পরিদর্শনে আসেন।
স্থানীয় সাংসদ নজরুল ইসলাম চৌধুরী শঙ্খনদীর দু’পাড়ের মানুষকে দেয়া কথা রাখতে পারায় সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তার অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলেই সেতুটি নির্মাণের সব শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। সেতু নির্মাণের ভিত্তি ফলক উদ্বোধনের পর থেকে নদীর দুই পাড়ের মানুষের মাঝে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। চৌকিদার ফাঁড়ি সেতু নির্মাণ হওয়ার পর তার মূল লক্ষ হবে ধোপাছড়ি ও শীলঘাটার মধ্যবর্তি শঙ্খনদীতে ৯ম শঙ্খসেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

x