চোখে দেখা ৭১ : ইতিহাসের হাতছানি

রেজাউল করিম

শুক্রবার , ১২ অক্টোবর, ২০১৮ at ৭:৪৫ পূর্বাহ্ণ
13

বাঙালির সর্বকালের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র এই মুক্তিযুদ্ধের ফসল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়/ আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন/ তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/ সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো/ সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর/ তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/ শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো/ দানবের মতো চিৎকার করতে করতে/ তুমি আসবে ব’লে হে স্বাধীনতা/ ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েলস রাইফেল/ আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র/ তুমি আসবে ব’লে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম/ তুমি আসবে ব’লে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার/ ভগ্নস্তূপে দাঁড়িয়ে একটানা আর্তনাদ করলো একটা কুকুর/ তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা/ অবুঝ শিশু হামাগুড়ি দিলো পিতা-মাতার লাশের ওপর।’ স্বাধীনতা এলো অনেক ত্যাগ ও মা- বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম হঠাৎ করে শুরু হয়নি। বহুবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমাবনতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকেই পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে যেসব ইস্যুতে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, তার মধ্যে ছিল ভূমি সংস্কার, রাষ্ট্রভাষা, অর্থনীতি ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে দুই প্রদেশের মধ্যে বৈষম্য, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইত্যাদি।
১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টিতেই আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের একক প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনিই হন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ ও তার নেতা শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ শেখ মুজিব যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, তাতেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কাছে তাঁর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। ইতোমধ্যে সমস্যা নিরসনের জন্য শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালি হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈন্য এবং আধা সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে জনগণের মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে। ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের উপর অপারেশন চালানোর নির্দেশ দেয়া হয়। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক ঐ পরিকল্পনা অনুযায়ী দুটি সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর তত্ত্বাবধানে প্রথম সদরদপ্তরটি গঠিত হয়। এখানে ৫৭তম ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার আরবাবকে শুধু ঢাকা নগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এবং মেজর জেনারেল খাদিম রাজাকে প্রদেশের বাকী অংশে অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হয়। অপারেশনের সার্বিক দায়িত্বে থাকেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান।
ছাত্ররা এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মীরা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সৈন্যদের অভিযান ঠেকাতে রাস্তায় প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করে। ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তানি সৈন্যরা ওয়ারলেস বসানো জিপ ও ট্রাকে করে ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে। তাদের প্রথম সাঁজোয়া বহরটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এক কিলোমিটারের মধ্যে ফার্মগেট এলাকায় ব্যরিকেডের মুখে পড়ে। রাস্তার এপাশ-ওপাশ জুড়ে ফেলে রাখা হয়েছিল বিশালাকৃতির গাছের গুঁড়ি। অকেজো পুরোনো গাড়ি ও অচল স্টিম রোলারও ব্যারিকেডের কাজে ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের সকল এলাকায় স্বাধীনতার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থান গড়ে ওঠে। এই অভ্যুত্থানে অংশ নেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ। পাকবাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা প্রতিরোধ প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্পস্থায়ী হয়। শত্রু সেনারা সংখ্যায় অনেক ও তারা ছিল অনেক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত, তাই মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। শীঘ্রই দেশের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন মুক্তিসংগ্রামীদের একটি একক কমান্ডের অধীনে আনা হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস এখনও রচিত হয়েছে বলা যাবে না। প্রখ্যাত ফরাসি ইতিহাসবিদ মার্ক ব্লকের মতে, ইতিহাস ঘটনাসমূহকে সত্য বলে অনুমান করে নিলে চলবে না, সেগুলো সত্যি ঘটেছিল কিনা, সেটা অনুসন্ধান করে যাচাই করে নিতে হবে। মুহাম্মদ শামসুল হক সে পথে এগিয়েছেন, অনুমান-নির্ভর নয়, মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাসমূহকে বিধৃত করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের ও ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে। ‘চোখে দেখা ৭১’ মুহাম্মদ শামসুল হক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ইতিহাসকে লিপিবদ্ধ করেছেন সুনিপুণভাবে। তিনি ইতিহাস ও সত্যানুসন্ধানী হিসেবে নিজেকে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, পেয়েছেন পাঠকপ্রিয়তা। তাঁর প্রকাশিত অন্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে-‘স্বাধীনতার ঘোষক বঙ্গবন্ধু ঃ প্রামাণ্য দলিল’, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি ও বেতার ঘোষণার ইতিবৃত্ত’, ‘চোখে দেখা ৭১, পর্ব-১’, ‘স্বাধীনতার সশস্ত্র প্রস্তুতি ঃ আগরতলা মামলার অপ্রকাশিত জবানবন্দি’, ‘খ্যাতিমানদের নানা রঙের দিনগুলো’, ‘স্বাধীনতার বিপ্লবী অধ্যায়-বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য ৪৭-৭১’, ‘স্বাধীনতার সশস্ত্র প্রস্তুতি ও বঙ্গবন্ধু-আগরতলা মামলার অপ্রকাশিত জবানবন্দি’ অন্যতম। তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত থাকায় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ ছিল হামেশা। বর্তমানে মুহাম্মদ শামসুল হক ‘ইতিহাসের খসড়া’ নামক তথ্যসমৃদ্ধ পত্রিকার সম্পাদক।
‘চোখে দেখা ৭১’ দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছর খড়িমাটি থেকে। দুইশ পঁচাত্তর পৃষ্ঠার বইটির দাম রাখা হয়েছে চারশ টাকা। বইটির ঝকঝকে প্রচ্ছদ আঁকিয়ে মনিরুল মনির। ‘চোখে দেখা ৭১’ দ্বিতীয় পর্বে ৪৪ জনের সাক্ষাৎকার লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন-অনুপম সেন, অমল কান্তি নাথ, অমল মিত্র, আ আ ম শাহজাহান, আ ক ম শামসুজ্জামান, আ ক ম রইসুল হক বাহার, আছিয়া বেগম, আবু জাফর মো. ছাদেক, আবদুস সালাম, একরামুল হক চৌধুরী, এ কে এম শামসুল আলম, এম এ সালাম, এম নাসিরুল হক, এ এস এম কামাল এ উদ্দিন চৌধুরী, এস এম সেলিম, ওসমান গণি এনু, কামরুন্নাহার বেগম, গাজী সালেহ উদ্দিন, খোন্দকার মোহাম্মদ ছমিউদ্দিন, নিজাম উদ্দিন আহমদ, নূর মোহাম্মদ বাবুল, নূরুল আলম, পংকজ কুমার দস্তিদার, বালাগাত উল্লাহ, মনজুরুল আহসান চৌধুরী, মনিরুজ্জামান, মাহাবুবুর রহমান চৌধুরী, মাহবুবুল আলম সাবু, মাহবুবুল হক, মিনহাজুন্নিছা, মিয়া আবু মোহাম্মদ ফারুকী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা, মুহাম্মদ মারুফ শাহ্‌ চৌধুরী, মো. আমজাদ হোসেন, মো. ইউসুফ, মো. খোরশেদ আলম, মো. দবির উদ্দিন, মো. নজরুল ইসলাম, মো. মোফাজ্জল হোসেন, এম রেজাউল করিম চৌধুরী, শওকত আলী মিয়া, শীলা মোমেন, সুপ্রিয় চৌধুরী ও সৈয়দা সরওয়ার জাহান। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা, কেউ মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছেন দূর থেকে, কেউ কাছ থেকে উপলদ্ধি করেছেন ভয়াবহ এক মানবিক বিশ্বকে। লেখকের কথায় অনুভূতি এ রকম…‘যে কোনো জাতির এগিয়ে যাওয়ার পথ রচিত হয় তার অতীতকে স্মরণ রেখেই। ত্যাগ-তিতিক্ষা ও কষ্টের কথাগুলো ভুলে গেলে বা উপেক্ষা করলে কোনো অর্জনই অর্থবহ বা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে সর্বস্তরের মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তঝরা স্মৃতিময় ঘটনাগুলো মন থেকে মুছে গেলে প্রিয় স্বদেশের স্বাধীনতার প্রতিও শ্রদ্ধা-ভালোবাসা এবং একে রক্ষার জন্য অঙ্গীকারবোধ ঠুনকো হয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু এখন বাস্তবতা এই যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় বিশেষ করে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন বেদনাবিধুর সংগ্রামী দিনগুলোর অনেক স্মৃতি মানুষের মন থেকে ক্রমেই মুছে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকালীন হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের বিভীষিকাময় তাণ্ডবের কথা শুনে হতবাক হয়ে যায়। যেন এ দেশে সে রকম কিছুই ঘটেনি।
অন্যদিকে সেসময়ের ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষদর্শী বা ভুক্তভোগী মানুষগুলো আমাদের জীবন থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তাই সময় থাকতে ’৭১-এর ধ্বংসযজ্ঞের বিক্ষিপ্ত এবং অকথিত স্মৃতিগুলো সংগ্রহ করে বর্তমান প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ বংশধরদের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা আমি অনুভব করি দীর্ঘদিন থেকে। আর এলক্ষ্যে প্রায় দেড় যুগ ধরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি, সাক্ষাৎকার নিয়েছি এবং তাঁদের মধ্য থেকে ৪৪ জনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে রচনা করেছি ‘চোখে দেখা ৭১’ (দ্বিতীয় পর্ব)। এদের মধ্যে রয়েছেন ৫ জন নারী।’
সকল সংগ্রাম, বিদ্রোহ, আন্দোলন এবং বিপ্লবে চট্টগ্রাম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন-শোষণের নাগপাশ থেকে মুক্তির আন্দোলনে চট্টগ্রামের রয়েছে সাহসী ভূমিকা। এ আন্দোলনের প্রাণ পুরুষ সূর্য সেন কিংবা নারী জাতির অহংকার প্রীতিলতা-কল্পনা চট্টগ্রামকে বিপ্লব-তীর্থ হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছেন। পাকিস্তানের সুদীর্ঘ শোষণ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম আপন ঐতিহ্য রক্ষা করেছে। প্রতিটি আন্দোলনে চট্টগ্রাম মুখর হয়ে উঠেছে। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে ঢাকার পাশাপাশি বীর চট্টলায় দেখা দেয় ব্যাপক আলোড়ন। মার্চের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানি অস্ত্র বোঝাই এমভি সোয়াতকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গন হয়েছে আরো অগ্রণী। লালদিঘি ময়দানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক ‘এবারের সংগ্রাম’ মঞ্চস্থ হয়। পরে কয়েক হাজার মুক্তি পাগল লোকের উপস্থিতিতে প্যারেড গ্রাউন্ডে মঞ্চস্থ হয় ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নাটকটি। ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই প্রত্যয়কে ১৭ মার্চ থেকে লালদিঘির ময়দানে সপ্তাহব্যাপী এক কর্মসূচি পালন করে। প্রায় প্রতিদিন সভা আরম্ভ হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম শহরের মুখ্য সড়কগুলোতে ট্রাক র‌্যালি অনুষ্ঠিত হতো-যেখানে অসহযোগের বাণী, স্বাধীনতার বাণী সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শিত ও দেশাত্মবোধক গান পরিবেশিত হতো। লালদিঘীর সভাতে বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা বিরতিহীনভাবে বক্তৃতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। যদিও লালদিঘীর এই সভাটি ছিল মুখ্যত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি পরিচালিত, এই কর্মকাণ্ডে চট্টগ্রামের তৎকালীন বিশিষ্টজনেরা ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে যাঁদের অবদান বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয় তাঁরা হলেন চট্টগ্রাম বন্দর হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী ডা. কামাল এ খান, চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক, বিশিষ্ট নাট্যকার মমতাজ উদ্‌দীন, একই কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিক প্রমুখ।…. ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি পরিচালিত এই সভাটি প্যারেড ময়দানে অর্থাৎ চট্টগ্রাম কলেজের মাঠে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেদিন প্রধান বক্তা ছিলেন ড. এ আর মল্লিক।’ (চোখে দেখা ৭১’, পৃষ্ঠা ১৪-১৫)।
অসহযোগ আন্দোলন আরো গতিশীলতা এনে দেয় পাকিস্তানি অস্ত্রবাহী সোয়াত জাহাজ। ‘অসহযোগ আন্দোলনের সময় সারা দেশের মতো আমাদের এলাকার পরিবেশও ছিল উত্তাল। আমাদের কলোনি, বন্দর, ডক ইয়ার্ডসহ সব জায়গায় প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো না কোনো কর্মসূচি লেগেছিল। ছিল নাটক, গণসংগীতের মাধ্যমে গণজাগরণমূলক অনুষ্ঠানও। বন্দর ভবনের বিপরীতে বর্তমান শিপিং করপোরেশন ভবনের জায়গাটি তখন ছিল খালি মাঠ। ওই মাঠে জনসভা হতো।’ (চোখে দেখা ৭১’, পৃষ্ঠা ৫১-৫২)।
বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় অনেক পাত্র-পাত্রী কালে-কালে ইতিহাস চর্চার বিষয়ে পরিণত হয়েছেন। এরা সবাই বাংলাদেশ সমাজ আর অর্থনীতিক বিকাশের ফসল। এরা সবাই আপন মহিমায় ভাস্বর। ইতিহাসের বড় বড় ঘটনার মূল উজ্জীবনী শক্তি জনগণ। এ জনগণ উদ্বুদ্ধ ও প্রেষিত কোনো ক্যারিসমাটিক নেতৃত্ব দ্বারা। সেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৪৪ প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিচারণ ও সাক্ষাৎকারে তা প্রস্ফূটিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা শক্তি হিসেবে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন অপারেশন, নানা ঘটনাবলী ‘চোখে দেখা ৭১’ গ্রন্থে বিধৃত হয়েছে। এসব ঘটনা মুক্তিযুদ্ধে আঞ্চলিক ইতিহাস রচনার অন্যতম উপাদান বলা যেতে পারে। গ্রন্থের আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার প্রাক-প্রসু্তুতি, উঠে এসেছে অনেক নতুন তথ্য। মুহাম্মদ শামসুল হকের পরিশ্রম স্বার্থক বলা যেতে পারে, এ কারণে যে বইটি ইতোমধ্যে সুধীমহলে আদৃত হয়েছে। ভবিষ্যত প্রজন্ম গ্রন্থপাঠে ইতিহাসমুখী হবে। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা সম্পর্কে অনেককিছু জানতে পারবে, করে তুলবে শেকড়মুখী।
(চোখে দেখা ৭১ দ্বিতীয় পর্ব ঃ মুহাম্মদ শামসুল হক,
প্রকাশক ঃ খড়িমাটি, প্রচ্ছদ ঃ মনিরুল মনির, ২৭৫ পৃষ্ঠা,
বিনিময় ঃ ৪০০ টাকা, আলোকচিত্রী ঃ নেহলিন হক)।

x