চুক্তি অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করতে লাগবে ২২ বছর!

প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় আরসাকে দূষছে মিয়ানমার

আহমদ গিয়াস, কক্সবাজার

রবিবার , ১৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:১৭ অপরাহ্ণ
149

বাংলাদেশে আশ্রয়প্রাপ্ত মিয়ানমারের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত নাগরিক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হলেও এখনও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। আর চুক্তি অনুয়ায়ী দৈনিক দেড়শ’ করে ফেরত পাঠানো হলে তা শেষ হতে সময় লাগবে অন্তত ২২ বছর।

গত বছরের আগস্টে মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনে সেদেশের সেনাবাহিনীর গণহত্যা থেকে বাঁচতে নতুন করে পালিয়ে আসে ৮ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এরআগে আসে আরো প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা। এদের প্রায় সকলেই এখন উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয় শিবিরে রয়েছে।

ইউনিসেফ-এর হিসাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বছরে অন্তত ৬০ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে। কিন্তু প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী ফেরত নেয়া হবে প্রতিদিন দেড়শ’ রোহিঙ্গা। সে হিসাবে বছরে ৩৬৫ দিনই যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যায় তাহলে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ হাজার। এ অবস্থায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে সময় লাগবে অন্তত ২২ বছর।

আবার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নতুন করে জন্ম নেয়া শিশুরা বেড়ে উঠছে বাংলাদেশের ভৌগলিক পরিবেশে। আগামী ২০-২২ বছর পরে এসব রোহিঙ্গা শিশু কি আর মিয়ানমারে ফিরতে চাইবে? এমন প্রশ্নও অনেকের।

গত মাসের শেষদিকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে চলতি মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা প্রস্তুতি নিলেও বিকাল পর্যন্ত কোনো রোহিঙ্গাকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর দিনই ঘটে যায় ‘বিছমিল্লায় গলদ’।

শরণার্থী প্রত্যাবাসনে গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান, শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে ব্যর্থতা সম্পর্কে বলেছেন, এখনও একজন রোহিঙ্গাকেও নিজদেশে ফিরতে রাজি করানো যায়নি। আর রাজি করানো না গেলে জোর করে কাউকে ফেরত পাঠানো হবে না।

বৃহস্পতিবার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার ঘটনায় মিয়ানমারের সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত সংগঠন ‘আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মিকে (আরসা) দূষছে মিয়ানমার। মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ইউন মিয়াত আয়ে শুক্রবার রাষ্ট্রীয় এক গণমাধ্যমে প্রকাশিত একান্ত এক সাক্ষাতকারে দাবি করেন, মিয়ানমারে স্বেচ্ছায় ফিরতে চায় এমন রোহিঙ্গাদেরকে ‘আরসা’ হুমকি দিয়েছে। তবে আরসা কীভাবে হুমকি দিয়েছে, কোথা থেকে হুমকি দিয়েছে তা তিনি স্পষ্ট করেননি।

তবে তিনি বলেন, “ফিরতে চায় এমন অনেক রোহিঙ্গাকে ‘আরসা’ সদস্যরা ফরম পূরণে বাধা দিয়েছে, নির্যাতন চালিয়েছে, এমনকি হত্যা করেছে।” তিনি ভাইবারের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সাথে সরাসরি কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হন বলে দাবি করেন। তবে এবিষয়ে গত ৩ দিনেও বাংলাদেশের তরফ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।

মিয়ানমারের মন্ত্রীর এমন দাবি গুরুতর বলে মনে করেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ইকরামুল কবির চৌধুরী বাবলু। তিনি বলেন, “তাহলে কি মিয়ানমার বলতে চায় যে ‘আরসা’ বাংলাদেশে আছে?” বিষয়টি দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যাটির বড় ভুক্তভোগী রাষ্ট্র হলেও সমস্যাটি মিয়ানমারের গভীরেই। তাই মিয়ানমারেরই এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যাতে বিষয়টির স্থায়ী সমাধান হয়।’

কক্সবাজার চেম্বার অভ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, ‘এরআগেও ব্যাপক মাত্রায় রোহিঙ্গা এসেছিল বাংলাদেশে। এরমধ্যে ৭৮-৭৯ সালে আসা প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার রোহিঙ্গার সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো হলেও পরে তাদের অধিকাংশই পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসে এবং বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর, আত্মীয়তাসহ নানা সম্পর্ক তৈরি করে সমাজের মূল স্রোতের সাথে মিশে যায়। এই ধরনের প্রায় সকল রোহিঙ্গাই ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ভোটার হয়েছে। এছাড়া ৯১-৯২ সালে আসা ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন রোহিঙ্গার মধ্যে ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হলেও তাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। ফলে বলা যায়, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন টেকসই হয়নি।’

কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘সরকার এমনভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে চায় যাতে তাদের আর ফিরে আসতে না হয়।’

জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থারগুলো মনে করছে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো পরিস্থিতি এখনও সৃষ্টি হয়নি। সেদেশের সেনাবাহিনী এখনও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ঘোরবিরোধী এবং তারা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে উগ্র বৌদ্ধদের উস্কানি দিয়ে মাঠে নামিয়ে নানা হুমকি দিচ্ছে। মিয়ানমারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের গ্রেফতারসহ নানাভাবে নির্যাতন চালাচ্ছে। সর্বশেষ ইয়াঙ্গুনে নৌকা থেকে শতাধিক রোহিঙ্গাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এখনও রোহিঙ্গারা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর)।

রোহিঙ্গারাও ফিরে যাওয়ার শর্ত হিসাবে নাগরিকত্ব দেয়াসহ ৭ দফা দাবি দিয়েছে। মিয়ানমার সরকার অন্তত নাগরিকত্ব ও পুরনো ভিটেবাড়ি ফিরিয়ে দিলে সকল রোহিঙ্গা একযোগে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্খাও ব্যক্ত করে। তবে মিয়ানমার সরকার এখনও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেয়ার বা পুরনো ভিটেবাড়ি ফিরিয়ে দেয়ার কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।

x