চুক্তিভিত্তিক গণপরিবহন চলবে না

ঋত্বিক নয়ন

বৃহস্পতিবার , ৯ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
1177

চট্টগ্রামে চুক্তি বা টার্গেটভিত্তিক কোনো গণপরিবহন চলবে না। ট্রাফিক সপ্তাহ শেষে এ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দ। যাত্রী, চালক ও মালিকের সুবিধার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দ। আজ থেকে রাজধানী ঢাকায় এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে চলেছে। মালিক চালকের সঙ্গে কন্ট্রাক্টে গাড়ি চালালে তার নিবন্ধন বাতিল করা হবে। এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি থাকবে বলেও জানিয়েছেন নেতৃবৃন্দ। গত ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বেপরোয়া বাসের পাল্লাপাল্লিতে চাপায় পড়ে দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। এর প্রতিবাদে এবং নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিয়ে সড়ক পরিবহন আইনও অনুমোদন করে। আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই মালিকশ্রমিক কর্তৃপক্ষ চুক্তির ভিত্তিতে গাড়ি রাস্তায় নামানোর পদ্ধতি থেকে সরে এলো বলে মনে করা হচ্ছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে পরিবহন চালক ও মালিকদের অসম প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। পরিবহন পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, চুক্তি অর্থাৎ মালিক কর্তৃপক্ষকে একটি নির্দিষ্ট অংকের অর্থ জমা দেওয়ার শর্তে চালকদের গাড়ি চালাতে দেওয়ার কারণে ওই অর্থ নিশ্চিত করতে এবং নিজেদের আয় আরও বাড়ানোর জন্য চালকরা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান, যে কারণে প্রায়ই রেষারেষিতে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটে। তীব্র যানজট থাকার পরও এ প্রতিযোগিতা দেখা যায় বিভিন্ন রুটে একই প্রতিষ্ঠান কিংবা ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিবহনের মধ্যে। এর ফলে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। ঝরছে প্রাণ। যদি চুক্তি ভিত্তিক না হয়ে চালকদের নিয়োগ ভিত্তিতে গাড়ি চালাতে দেওয়া হয়, তবে এ প্রতিযোগিতা থাকবে না, সড়ক দুর্ঘটনাও অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ৬৪ জন, বছরে ক্ষতি হয় ৩৪ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে সাত হাজার ৩৯৭ জন। গাড়ি দুর্ঘটনায় যাত্রী মারা যায় ৪৯ শতাংশ, আর পথযাত্রী মারা যায় ৫১ শতাংশ। সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ গণপরিবহন খাতে নৈরাজ্য। প্রতিটি বাসমিনিবাসের ব্যবসা মূলত চালকেরা নিয়ন্ত্রণ করছেন। দৈনিক চুক্তিভিত্তিক ইজারায় মালিকেরা তাদের বাস চালকের হাতে তুলে দেন। এ কারণেই চালকেরা যাত্রী ধরতে সড়কে ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। যাত্রীরা বলছেন, চালকরা বাস বোঝাই করার নেশায় রাস্তায় বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পথে পথে যাত্রী তুলে বোঝাই করে ফেলে। চালকদের এমন আচরণে রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে বাসায় ফেরাটাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইন অনুযায়ী, মোটরযান শ্রমিকদের নিয়োগপত্র দেওয়া এবং দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার বেশি কাজ না করানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও বছরের পর বছর ধরে তা মানছেন না পরিবহন মালিকরা। মাসিক বেতন না থাকায় এসব চালক রোজগারের জন্য দিনে আট ঘণ্টার বদলে ১৪ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। গাড়ি চালক এবং সহকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেশির ভাগ ঘুমান গাড়ির আসনে। রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারেন না। ভোর ৫টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হতে হয়। আবার রাতে ঘুমাতে যেতে যেতে রাত ১ টা’র পর হয়ে যায়।

তবে আশার কথা হলো চট্টগ্রামের পরিবহন মালিক শ্রমিক নেতৃবৃন্দ একমত হয়েছেন যে, চুক্তিভিত্তিক চালক নয়, নিয়োগভিত্তিক চালকের হাতেই গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দিতে হবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) কমিটির সভাপতি মৃণাল চৌধুরী এ প্রসঙ্গে আজাদীকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক গাড়ি চালানোএটাতো মারাত্মক ব্যাধি। গত কয়েক বছর ধরে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছি। এ আন্দোলন করার কারণে দুই বছর আগে ইপিজেড এলাকা থেকে শ্রমিক নেতা নূরুল ইসলামকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। তিনি বলেন, মালিক সংগঠন নয়, কিছু পরিবহন মালিক, পুলিশের নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার যোগসাজসে এ কাজটি করছে। তারা চালককে টার্গেট করে দিচ্ছে, আজ তিন হাজার টাকা দিতে হবে। কেন কীভাবে তা মানতে নারাজ তারা। যে এ টার্গেট পূরণ করতে পারবে বলছে, তার হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিচ্ছে। চাবি হাতে নিয়ে সে দিচ্ছে বদলি চালককে। তাকে টার্গেট দিচ্ছে, সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে তিনহাজার টাকা দিতে হবে। বদলি চালক এ তিনহাজার টাকা প্লাস, নিজের জন্য হাজার দেড় হাজার টাকা তুলতে অসম প্রতিযোগিতায় নামছে। গাড়ি কি মাঝখানে দাঁড়ালো, নাকি সাইডে, যাত্রী কতজন উঠলো, কে গাড়ির নিচে চাপা পড়লো, এসব কিছুই দেখে না। কারণ সে দুই ট্রিপের জায়গায় তিন ট্রিপ মারতে পারলে লাভ বেশি হবে। এবার সন্ধ্যায় সে প্রথম চালকের কাছে গাড়ি বুঝিয়ে দিলে সে রাত পর্যন্ত চালিয়ে তুললো নিজের জন্য দেড় / দুই হাজার টাকা। ঢাকায় শুনলাম আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে এটা হবে। চট্টগ্রামে এ সিস্টেম অনেক আগেই চালু হওয়া প্রয়োজন ছিল। এতে চালকদের পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা কমবে, দুর্ঘটনা হ্রাস পাবে।

চট্টগ্রাম সিটি বাস মিনিবাস হিউম্যান হলার ওনার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সহসভাপতি মাহবুবুল হক একই প্রসঙ্গে আজাদীকে বলেন, ইতোমধ্যে আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ ব্যাপারে। মাঝখানে অনাকাঙ্খিত একটা ঘটনা (শিক্ষার্থীদের আন্দোলন) ঘটে গেল। তাই পিছিয়ে পড়েছি। আশা করছি ট্রাফিক সপ্তাহের পর আগামী সপ্তাহেই চট্টগ্রাম জেলা পরিবহন মালিক ফেডারেশনভুক্ত সকল পরিবহন মালিক একসাথে বসে নিয়োগভিত্তিক চালকের বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারবো। তিনি বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই বলছি ‘ওয়ান আমব্রেলা’ অর্থাৎ এক ছাতার নিচে সকল গণপরিবহন যখন আসবে, তখন তাদের মধ্যে আর প্রতিযোগিতা থাকবে না, চালক বেতন পাবে দৈনিক মজুরি হিসেবে। মালিকের সাথে চালকের কোন চুক্তি থাকবে না। এতে যাত্রীরা যেমন উপকৃত হবে, একই ভাবে মালিকচালক সকলেই উপকৃত হবেন। গণপরিবহন একটা শৃঙ্খলার মধ্যে চলাচল করবে।

x