চুই

অনিক শুভ

বুধবার , ২৮ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:২৪ পূর্বাহ্ণ
28

চুই লতা জাতীয় অর্থকরী ফসল। চুইঝাল গাছ হয়তো অনেকে চিনেন না। চুইয়ের বোটানিক্যাল নাম হচ্ছে পেপার চাবা, পরিবার পিপারেসি, জেনাস পিপার এবং স্পেসিস পিপার চাবা। এর লতা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট পর্যন্ত বাড়ে। পাতা ২ থেকে ৩ ইঞ্চি লম্বা হয়। হার্টের মতো আকার। অনেকেই চুইপাতা গোলমরিচ পাতার সাথে বা পানপাতার সাথে মিলিয়ে ফেলেন। এর কাণ্ড, শিকড়, শাখা, প্রশাখা সবই মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চুই সাধারণত দুই প্রকার। একটির কাণ্ড আকারে বেশ মোটা, অন্যটি চিকন।
চুইঝালে দশমিক ৭ শতাংশ সুগন্ধি তেল রয়েছে। অ্যালকালয়েড ও পিপালারটিন আছে ৫ শতাংশ। তাছাড়া ৪ থেকে ৫ শতাংশ পোপিরন থাকে। এছাড়া পোলার্টিন, গ্লাইকোসাইডস, মিউসিলেজ, গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ, সিজামিন, পিপলাসটেরল এসব থাকে পরিমাণ মতো। এর কাণ্ড, শিকড়, পাতা, ফুল, ফল, সব ভেষজগুণ সম্পন্ন। শিকড়ে থাকে দশমিক ১৩ থেকে দশমিক ১৫ শতাংশ পিপারিন। এসব উপাদান মানব দেহের জন্য খুব উপকারী।
এর পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা লতায় জন্মে। পরাগায়ন প্রাকৃতিকভাবেই সম্পন্ন হয়। ফুল হয় লাল লম্বাটে, যা দূর থেকে দেখতে অনেকটা মরিচের মতো। ফলের ব্যাস ১ ইঞ্চির মতো। ফল সাধারণত লাল রঙের হয়। তবে পরিপক্ব হলে বাদামি বা কলো রঙের হয়ে যায়। বর্ষায় ফুল আসে এবং শীতের শুরুতে ফল আসে।
শুকনো এবং কাঁচা উভয় অবস্থায় চুইঝাল বিক্রি হয়। বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা চুইঝাল লতা অঞ্চল ভেদে ৬০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে শাখা ডাল থেকে শিকড়ের ডালে ঝাল বেশি হয় বলে এর দামও একটু বেশি। শুকনো চুইয়ের দাম কাঁচার চেয়ে আরও ২-৩ গুণ বেশি। অর্থাৎ ১৫০০ টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। আবার সাতক্ষীরাতে কোথাও কোথাও প্রতিকেজি চুই ঝাল ৩০০ থেকে ৬০০ টাকাতেও বিক্রি হয়ে থাকে। মাত্র ২-৪ টি চুই গাছের চাষ করে নিজের পরিবারের চাহিদা মিটানো সম্ভব।
এর অনেক উপকারিতা রয়েছে। সমূহরুচি বাড়াতে খাবারের রুচি বাড়াতে ও ক্ষুধামন্দা দূর করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এতে প্রচুর পরিমাণে আইসোফ্লাভোন ও অ্যালকালয়েড নামক ফাইটোক্যামিকাল রয়েছে যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং ক্যানসার প্রতিরোধে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। দেহে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে এটি হৃদরোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। পাকস্থলী ও অন্ত্রের প্রদাহ দূর করে। তাছাড়া গ্যাস্ট্রিক ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। স্নায়ুবিক উত্তেজনা ও মানসিক অস্থিরতা প্রশমন করে। আমাদের শরীরের বিভিন্ন ধরনের ব্যথা দূর করে শরীর সতেজ রাখতে সহায়তা করে। এটি ঘুমের ওষুধ হিসেবে কাজ করে এবং শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে। প্রসূতি মায়ের প্রসব-পরবর্তী ব্যথা প্রশমনে ভালো কাজ করে চুইঝাল। সদ্যপ্রসূতি মায়েদের শরীরের ব্যথা কমাতে চুইঝাল ম্যাজিকের মতো কাজ করে। অ্যাজমা ও ব্রংকাইটিস রোগের ওষুধ হিসেবে কাজ করে। ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত রোগপ্রতিরোধে চুইঝাল বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত রোগপ্রতিরোধে সাহায্য করে।
তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে মরিচের বিকল্প হিসেবে চুইঝালের জনপ্রিয়তা বাড়লে দেশের হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে ভেষজ গুণ থাকার কারণে অনেক রোগব্যাধির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এরই মধ্যে চুই লতার চারা উৎপাদন বাণিজ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় চুই প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে। বর্তমানে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে বৃহত্তর খুলনা বরিশাল ফরিদপুর অঞ্চলে চুইয়ের আবাদ এবং বাজার রমরমা। অবাক করা বিষয় হলো এই যে খুলনার চুই দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাইরে ও রফতানি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাই যদি এর দিকে পরিকল্পিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেন এবং সুনজর দেন তবে আমাদের দেশ চুইঝাল থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে। একই সাথে ভেষজগুণ থাকার কারণে অনেক রোগব্যাধির আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এজন্য দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, গবেষণা, মাঠ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, বিপণন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বহুমুখী ব্যবহারে প্রচার প্রচারণা।

x