চিৎকার করো মেয়ে দেখি, যতদূর গলা যায়

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১৫ জুন, ২০১৯ at ৬:৫৭ পূর্বাহ্ণ
86

আমাদের দেশে আমরা যদি এসব ঘটনাগুলো স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে অভ্যস্ত হই এমন অপরাধ আরও বাড়তেই থাকবে। ধর্ষণ আর খুনের লেখায় নারী পাতা বিষাদের পাতায় পরিণত করতে আর ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে স্বপ্নের মত সফল নারীদের গল্পে ঝলমলিয়ে উঠুক নারী পাতা। বহু পথ এগুনো নারীদের জীবনালেখ্যে গর্বিত হয়ে উঠুক সপ্তাহে একদিন নির্ধারিত দৈনিক আজাদীর এই নারী পাতা।

দক্ষিণ আফ্রিকার নকুবঙ্গা কাম্পি তাঁকে বলা হয় ‘লায়ন মাদার’ অর্থাৎ সিংহ মা বলে। তাঁর মেয়ের তিনজন ধর্ষণকারীর একজনকে হত্যা অপর দুজনকে আহত করার পর লোকে তাঁকে সিংহী মা বলে ডাকে। এই সিংহী মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল হত্যাকারী হিসেবে। আদালত কোন পরিস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটেছে তা বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে বেকসুর খালাস দিয়েছে।
এই সিংহী মাকে স্যালুট! পাঁচ কিলোমিটার অন্ধকার পথ পাড়ি দিয়ে মেয়েকে উদ্ধার করেছেন। ঘটনাস্থলেই একজনকে খুন এবং অপর দুইজনকে আহত করেন। আদালত বুঝতে পেরেছে কতটা ক্ষোভ, কতটা কষ্ট, কতটা আবেগ থেকে এই ঘটনা ঘটেছে। আমাদের দেশে কেউ এরকম সিংহী মা হয়ে উঠবেন এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। যদিও ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার কোনোভাবেই যেন লাগাম টেনে রাখা যাচ্ছে না। পুরো সমাজেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
আমাদের দেশে আমরা যদি এসব ঘটনাগুলো স্বাভাবিক বলে ধরে নিতে অভ্যস্ত হই এমন অপরাধ আরও বাড়তেই থাকবে। ধর্ষণ আর খুনের লেখায় নারী পাতা বিষাদের পাতায় পরিণত করতে আর ইচ্ছে করে না। ইচ্ছে করে স্বপ্নের মত সফল নারীদের গল্পে ঝলমলিয়ে উঠুক নারী পাতা। বহু পথ এগুনো নারীদের জীবনালেখ্যে গর্বিত হয়ে উঠুক সপ্তাহে একদিন নির্ধারিত দৈনিক আজাদীর এই নারী পাতা।
পরিস্থিতি, খবরের কাগজের দুঃসংবাদগুলো, ফেনীর নুসরাত, মুগদার হাসু, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের তনুর অসহায় চেহারাগুলো চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। বিবেক কথা বলে ওঠে। নুসরাত আবারও নুসরাত ? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি করতে না পারে এর চেয়ে রাষ্ট্রের দুঃখজনক হতাশার আর কিছুই হতে পারে না। আমরা বিশ্বাস করতে চাই নুসরাত হত্যার বিচার হবেই। যেহেতু প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা সিরিয়াসলি নিয়েছেন। অন্য কোনো দেশে খোদ প্রধানমন্ত্রীকে এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। বিচারের প্রক্রিয়ায় বিচার চলে। আজ কয়েক দিন ধরে পত্রিকায় ওসি মোয়াজ্জেমকে নিয়ে যে লুকোচুরি খেলছে পুলিশ বিভাগ তাতে হতাশ হই বৈকি। পুলিশ বিভাগ তাকে রক্ষার যেসব কৌশল অবলম্বন করছে তা কারো অজানা নয়।
নুসরাত যখন বিপদে পড়ে তার কাছে সাহায্য চেয়েছিল সেদিনই যদি আইন অনুযায়ী অভিযোগটি আমলে নিতেন তাহলে হয়তো নুসরাত বেঁচে যেত। ওসি সাহেব তা না করে বরং ঘাতক চক্রের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে। তার এই ভূমিকা পুরো আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য লজ্জাজনক ও কলঙ্কজনক। দুঃখের বিষয় নুসরাতকে বিব্রতকর প্রশ্ন এবং তার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। সাইবার ট্রাইব্যুনালের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে ওসি সাহেব এখন পলাতক আছেন। বিষয়টা যে রহস্যময় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। টিআইবি’র সুপারিশে এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
আমরা কিন্তু তনু হত্যার বিচার পাইনি। আরও অসংখ্য তনুর পরিবার ক্ষয়ে ক্ষয়ে শেষ হয়ে গেছে বিচার পায়নি। আপন জুয়েলার্সের সেই দুষ্টুমি করা ছেলেটি ও তার বন্ধুদের কি বিচার হয়েছে-জানি না। ভিকটিম মেয়েটির খবর কিন্তু আমরা রাখি নি। বেঁচে আছে তো, বেঁচে বর্তে গেলেও কিভাবে সে বেঁচে আছে জানি না। যেহেতু সে মুখ খুলেছে সুতরাং সমস্ত অপরাধের ভার এখন তাঁর ঘাড়ে। তার বেঁচে থাকাটা কতটা কঠিন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতিবাদী মেয়েগুলোর যেন বাঁচার অধিকার নেই।
ঘরে বাইরে সর্বত্রই নারী ও শিশু অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমাজে। চলতি বছরের গত কয়েক মাসে ৩৯৬ জন নারী ও শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনা নুসরাতের পর মুগদার হাসি, একজন মাদ্রাসা ছাত্রী অন্যজন গৃহবধূ। দুজনকে পুড়িয়ে মারা হয়। হয়তো আরও এমন ঘটনা ঘটতে থাকবে। বার বার বলি আবারও বলি বিচার না হলে এমন নির্মম ঘটনা কখনো রোধ করা যাবে না। সরকার কি কখনো সদয় হবে না? এসব ঘটনাগুলো কেন গুরুত্ব দিচ্ছে না সরকার বুঝে উঠতে পারি না। তাছাড়া এই সমাজের নীতি নৈতিকতা, মূল্যবোধগুলো কেন এমন করে হারিয়ে যাচ্ছে? কেন মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে ? এসব বিষয়গুলো নিয়ে কোনো গবেষণা কি আছে? গলদ কোথায়? কেন গলদ?
এই অন্ধকার সময়ের অবসান চাই। নারী ও পুরুষের এই পৃথিবীতে নারী তার অধিকার ও স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা আদায় করে নেবে একদিন এই বিশ্বাস রাখি। ভারতের শিল্পী ডোনা গুপ্তের গানটি মনের ভেতর গুণগুনিয়ে ওঠে
“চিৎকার করো মেয়ে
দেখি যতদূর গলা যায়
আমাদের শুধু মোমবাতি হাতে
ধ্বজা ভাঙা রথে
এগিয়ে চলার দায়।”
যেসব মেয়েগুলোর গলা চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো তাদের জন্য চিৎকার করবে কে?

x