‘চিল্কায় সকাল’ এর অপেক্ষা

ইলিয়াছ কামাল রিসাত

মঙ্গলবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
15

‘কেন লেখেন’ এ নিয়ে জগতের সব বিখ্যাত কিংবা অখ্যাত লেখকরা অনেক কিছুই বলে ফেলেছেন। আমিও কিছু লিখতে চাইছি, তবে লেখা নিয়ে নয়, লেখাহীনতা নিয়ে। একজন মোটামুটি নিয়মিত লেখেন এমন একজন যখন লেখা বন্ধ করে দেন কিংবা কিছুদিনের জন্য চুপচাপ হয়ে যান সেই রহস্যময় সময়ে কি ঘটে? সেই সময়টা রহস্যময়, কারণ একজন বাক্যের পর বাক্য সাজিয়ে ন্যূনতম একজন পাঠককেও যখন অনুরণিত করতে পারেন, তিনি আর যাই হোক লেখা বন্ধ করতে পারেন না। এই যে একটা জাদুকরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবার নেশা চেপে বসে তার থেকে নিস্তার পাওয়া অনেক কঠিন। জাদু দেখাতে চাইছেন কিন্তু তার মূল অস্ত্র ‘বাক্য’ তার ত্রিসীমানায় ধরা দিচ্ছে না। এর চেয়ে রহস্য আর কি হতে পারে?
গত অক্টোবর মাস থেকে গবেষণা জগতে প্রবেশ করেছেন তেমনই একজন সামান্য লেখক। গবেষণার কাজেও লেখালেখিই অন্যতম একটা বিষয়। তাহলে আমরা ধরে নিতে পারি, যিনি লিখেন আবার গবেষণা জগতেও প্রবেশ করেছেন তার পেশার জগতে অন্তত এর চেয়ে ভাল সমন্বয় হতে পারে না। কারণ দুই জগতেই লেখালেখির বিষয়টা মুখ্য। কিন্তু দুই-এক মাসের মাথায়ই সেই লেখক টের পেলেন এই সমন্বয় তেল আর পানির মত। কেউ কারো সাথে মিশতে পারেন না। একটা সামান্য উদাহরণ দিয়ে বুঝানো যেতে পারে: ঐ ‘লেখক-গবেষকের’ পছন্দের সিনেমা ‘আন্ধাধুন’। আন্ধাধুন নিয়ে সেই লেখক লিখতে বসলেন।
অনেকটা এরকম একটা লেখা দাঁড়াল: আন্ধাধুন সিনেমায় থ্রিলারের ঢং-এ আমাদের মেলোড্রামাটিক জীবনকে একটা ঠাট্টার চোখ দিয়ে দেখা হয়েছে। ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের এই সিনেমার প্রথম আধা ঘন্টার মধ্যে একটা মেইনস্ট্রিম হিন্দি কিংবা বাংলা সিনেমায় যে ভূমিকা-ক্রাইসিস-উপসংহার এই ফর্মুলার ইতি ঘটে যায়। আকাশ (আয়ুষ্মান), এক অন্ধ পিয়ানিস্ট, যে অন্ধ হবার অভিনয় করে তার শিল্পীসত্তা নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট করে। এমতাবস্থায় এই আপাত অন্ধ আকাশের পিয়ানো প্রতিভা ও রূপের প্রেমে পড়ে ফ্রাংকো’জ পানশালার মালিকের মেয়ে সোফি (রাধিকা আপ্তে)। জমজমাট গানের আসরে ফ্রাংকো পানশালায় চলে উৎসবের মাতোয়ারা। সেই পানশালাতেই আকাশের পিয়ানো প্রতিভায় মুগ্ধ হন এককালের রূপালী পর্দার সুপারস্টার প্রমোদ সিনহা। এই প্রমোদ সিনহার স্ত্রী সিমি সিনহা (টাবু)। প্রমোদ আর সিমির বয়সের পার্থক্য অনেক। এটা মোটামুটি একটা প্রেক্ষাপট এই সিনেমার।
একদিন এক জমজমাট কনসার্টের পর আমরা দর্শকরা দেখি প্রমোদ আকাশকে তার বাসায় পরের দিন প্রাইভেট কনসার্টের প্রস্তাব দিচ্ছে। পরের দিন প্রমোদ ও সিমির বিবাহ বার্ষিকী। সেই উপলক্ষ্যেই আকাশের পিয়ানো বাজানো তার স্ত্রীর জন্য একটা সারপ্রাইজ গিফট। এর পরে আমরা দেখতে পাই পরের দিন আকাশ গেল প্রমোদের আকাশচুম্বী ফ্ল্যাটে। বেশ কিছুক্ষণ পর বেশ ঘরোয়া অবস্থায় দরজা খুলে দিল প্রমোদের স্ত্রী সিমি। এবং আকাশকে মুখের উপর বলে দিল তার স্বামী প্রমোদ ঘরে নেই। এরপরেও আকাশ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলে ঘরে ঢুকে প্রমোদের সারপ্রাইজ প্ল্যান অনুযায়ী পিয়ানো বাজাতে শুরু করল। ইতিমধ্যে সিমি জেনে গেল যে আকাশ অন্ধ। আকাশ পিয়ানো বাজাচ্ছে, সিমি শুনছে। হঠাৎ আকাশের সাথে আমরা দর্শকরা দেখতে পাই ডাইনিং রুমের প্রান্তে একটা রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। এই অবস্থায় আকাশ স্তব্ধ হয়ে পড়লেও পিয়ানো বাজানো চালিয়ে গেল। একটু পর সে বাথরুমে যেতে চাইল। সিমি তাকে ডাইনিং রুম পার করে বাথরুমে দিয়ে আসল। ডাইনিং রুম পার করার সময় আমর দেখতে পাই সেই লাশ প্রমোদ সিনহার!!! এদিকে আকাশ বাথরুমে ঢুকল। আমরা দর্শকরা ভাবলাম, এবার হয়তো আকাশ তার কালো চশমা খুলে একটু দম ফেলবে। কিন্তু তা নয়, বাথরুমে আমরা দেখতে পাই এক লোক পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে!
অদ্ভুত পরিস্থিতি। দর্শক হিসেবে আমার মনে হতে থাকে পুরো সিনেমাই হয়তো এই হত্যা রহস্য উন্মোচনের কাহিনী। এর পরে আমরা দেখি আকাশ পুলিশ স্টেশনে গিয়ে এক দারোগাকে বলে সে একটা খুনের রিপোর্ট করতে এসেছে। সেই স্টেশনেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হল সিমির ফ্ল্যাটে বাথরুমে অবস্থান করা পিস্তল হাতে যে লোকটা ছিল সে! খুনের কথা বদলে আকাশ তাকে দেখার পর বলে তার বিড়াল কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
এই সিনেমার আকর্ষণীয় বিষয় হল মুড পরিবর্তন। একবার মনে হচ্ছিল এই সিনেমা এক অন্ধ পিয়ানিস্ট ও পানশালার সোফির অমর প্রেম, আরেকবার মনে হচ্ছিল প্রমোদ সিনহার খুনের রহস্য! আরো অনেক কিছু। কিন্তু শেষমেশ দর্শকের মনের উপর দিয়ে নানারকম এর মুড এক্সপেরিমেন্ট চলে এই সিনেমায়। শেষ পর্যন্ত দেখে মনে হয়, মেলোড্রামার কোন বালাই নেই। আমাদের জীবনকে যখন খুব ব্যক্তিকেন্দ্রিক জায়গা থেকে দেখতে থাকি তখন তথাকথিত জীবন সংগ্রাম, প্রেম, মৃত্যু এসব একটা করুণার জায়গা থেকে দেখা হয়। কিন্তু এই সিনেমায় এই সকল করুণার বিষয়গুলোকে দেখা হয়েছে ঠাট্টার ছলে। মনে হচ্ছে দূর থেকে কেউ আমাদের এসব ঠুনকো লড়াইয়ের কাণ্ড থেকে হাসছে, ঈশ্বরের হাসির মত!
এবার সেই ‘আন্ধাধুন’ নিয়ে লিখতে বসলেন গবেষক। যেহেতু সিনেমা নিয়ে লেখা হচ্ছে। সুতরাং ধরে নেই তার গবেষণার বিষয় এমন: ‘আন্ধাধুন’ সিনেমায় সমাজ-বাস্তবতা।
লেখাটা এমন হতে পারে: ‘আন্ধাধুন’ সিনেমায় বর্তমান ভারতের সমাজে ধোঁকাকে আশ্রয় করে টিকে থাকার কথা বলা হয়েছে (ইন্ডিয়া টাইমস, …)। এই সিনেমায় আরো দেখানো হয়েছে কীভাবে ভারতের এক নগরে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ, সে উচ্চবিত্ত হোক আর মধ্যবিত্ত হোক, কীভাবে এক সুতোয় রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে টিকে থাকে তার উৎকৃষ্ট চিত্রায়ন (হিন্দুস্তান টাইমস…)
অর্থাৎ, গবেষণায় সেই লেখককে যে কথাটা বলতে চাইছে তার স্বপক্ষে আগে অন্যেরা কে কি বলছে সেই নজির উপস্থাপন করতে হবে, নিজের ভাষায় এবং ঋণ স্বীকার করে। একটা লাইন লেখার পেছনে দশমুখী লাগাম টেনে ধরা হবে। সাহিত্যের লেখার সাথে যেন এক বিপরীতমুখী দ্বৈরথ। সাহিত্য যেভাবে মুক্ত অববাহিকার সকল শব্দ বিলিয়ে দেয় লেখকের উপর, গবেষণার খাতায় সেই ব্যক্তিকেই মেনে চলতে হবে অনেক বিধি-নিষেধ। যত কম কথায় বলা যাবে তত ভাল, ব্যাপারটা তেমন।
এই অবস্থায় সেই লেখক কি করতে পারে? নিঃসন্দেহে একটা কাজ অবশ্যই করতে পারে। গবেষণার নির্মোহ, নির্মেদ ভংগিটা সাহিত্যে প্রবেশ করাতে পারে। এবং গবেষণার প্রাণহীন আবেশে সাহিত্যের প্রাণ ঢেলে দিতে পারে। এতে করে দুইই উপকৃত হবে।
এখন প্রশ্ন, এই কৌশল সেই লেখক-গবেষক কবে রপ্ত করতে পারে? এর কোন সময়সীমা হয়তো নেই। সে অপেক্ষা করতে পারে ‘চিল্কায় সকাল’ এর। বুদ্ধদেব বসুর ‘চিল্কায় সকাল’-
‘কী ভালো আমার লাগলো আজ এই সকালবেলায়
কেমন করে বলি?
কী নির্মল নীল এই আকাশ, কী অসহ্য সুন্দর,
যেন গুণীর কণ্ঠের অবাধ উন্মুক্ত তান
দিগন্ত থেকে দিগন্তে’

x