চিরায়ত চলচ্চিত্র: লা নত্তে

শৈবাল চৌধূরী

মঙ্গলবার , ৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ
27

চলচ্চিত্রের স্বর্ণভূমি ইতালির নিও রিয়ালিস্ট চলচ্চিত্র আন্দোলন, যা বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক জীবন ঘনিষ্ঠ মেরুকরণ ঘটিয়েছিল, তারই একজন সফল রূপকার- মাইকেলেঞ্জোলো আন্তোনিওনি। এই মায়েস্ত্রোকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল তাঁর অষ্টম কাহিনী চিত্র-‘লা নত্তে’ (ঞযব ঘরমযঃ)। ১৯৬১ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে যখন ছবিটি শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে পুরস্কৃত হলো, সংবাদ সম্মেলনে আন্তোনিওনি জানিয়েছিলেন, তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের মূল শর্ত হচ্ছে- সততা, সহজ সরলতা এবং নিজের অনুভূতি ও উপলব্ধির অকপট প্রকাশ। আন্তোনিওনি আজীবন তাঁর এই দর্শনে স্থিত থেকেছেন যা হয়ে উঠেছিল তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আন্তোনিওনির চলচ্চিত্র মানব চরিত্রের অন্তর্নিহিত জটিলতা টানাপোড়েন বর্ণনার্থক করে না তুলে বরং অতি সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপিত করে তাঁর সহজ সরল শৈলীতে। তাঁর ছবির চরিত্রগুলো যেন মূল্যবোধের খরস্রোতে পারস্পরিক আঘাতের মাধ্যমে ক্রম প্রকাশিত হয়ে ওঠে। চরিত্রগুলোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শকেরাও যেন জীবন সত্যের উপলব্ধিতে পূর্ণস্নাত হয়। তাঁর শৈল্পিক অনুসন্ধানের মূল চরিত্রটি হন একজন নারী, যাকে কেন্দ্র করে তার জীবন চর্যার বিবিধ অভিপ্রকাশের মধ্য দিয়ে আন্তোনিওনি পুরো মানবজাতির বৈশ্বিক সংস্কৃতি, সহজাত মনস্তত্ত্ব ও অন্তর্জাগতিক বিচ্ছিন্নতা ও রাহসিকতাকে প্রকাশ করেন।
চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ ধীমান দাশগুপ্ত বলছেন, ‘(উনিশশো) ষাটের বছরগুলোতে আন্তোনিওনিকে সাধুবাদ দেওয়া হয়েছিল তাঁর আঙ্গিকের জন্য, বলা হতো এই আঙ্গিক সিনেমার চূড়ান্ত পর্যায়। (উনিশশো) সত্তরের বছরগুলোতে কিন্তু বেশি করে নজর দেওয়া শুরু হলো তাঁর ছবির বিষয়বস্তু ও উপাদান বৈচিত্র্যের ওপর। বলা হলো, স্ববিরোধিতা, যে জগতে আধুনিক সুযোগ সুবিধা ও দ্রুতগামী জীবনের খাতিরে আবেগকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছে সেখানে আবেগের সন্ধান, আর প্রসারণক্ষম প্রযুক্তি ও নির্মম প্রকৃতির পটভূমিতে মানুষের অসহায়তা- এসব বিষয় আন্তোনিওনির প্রিয়। জীবন ও প্রেমের অবোধ্য রহস্য ও সাময়িকতা এবং সামাজিক বৈসাদৃশ্য চিত্রণে এই প্রসঙ্গগুলোর চমকপ্রদ ব্যবহার ঘটে। তাঁর চরিত্রগুলোর একাকিত্ব, শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতার পাশাপাশিই রয়ে গেছে প্রেম, উত্তাপ ও স্নিগ্ধতার জন্য আন্তোনিওনির আর্তি, যা আলবেয়ার কামুর ভাষায়, আমাদের শীতলতা ও আমাদের জগতকে অন্ধকার থেকে উদ্ধার করতে পারে।
এই হিউম্যান সারভাইভ্যালের আশ্বাস (হয়তো নিরাসক্ত আশ্বাসে) আন্তোনিওনিকে আমি পাই। একজন পরিচালকের ক্ষেত্রে প্রসঙ্গ ও আঙ্গিক ছাড়াও আর একটি জিনিস দরকারি। যাকে বলা যেতে পারে তৃতীয় মাত্রা ও সত্তা আন্তোনিওনির ক্ষেত্রে তা মনস্তত্ত্ব’। বস্তুত এই মনস্তত্ত্বের ওপরই গড়ে উঠেছে ‘লা নত্তে’ ছবিটি। সমালোচকদের মতে ‘লা নত্তে’ আন্তোনিওনির ক্রমবিকাশের মধ্যবর্তী পর্যায়। আন্তোনিওনির প্রিয় বিষয়- সম্পর্কের বিশ্লেষণ এই ছবির বিষয়বস্তু। মধ্যবয়সী এক ঔপন্যাসিক (মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ানি) ও তার স্ত্রীর (জান মরো) দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপোড়েন ও বিচ্ছিন্নতার বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়েছে পুরো ছবি। এই দুটি চরিত্রের সমাপতনে এসেছে তৃতীয় একটি নারী চরিত্র। তিনের সাংঘর্ষিক ঘূর্ণাবর্তে চলাচলে আন্তোনিওনি আধুনিক ও নাগরিক সমাজ জীবনের অন্তর্নিহিত নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে। যা কেবল নাগরিক সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা নয় সমগ্র মানবজাতির অন্তর্নিহিত বিচ্ছিন্নতার চিত্র হয়ে ধরা দেয়। চলচ্চিত্রের ভাষা ও শৈলীর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটেছে এ চলচ্চিত্রে। খুবই সীমিত সংলাপ, সাদা ও কালো এ দুটি রঙের অসাধারণ আলোকসম্পাত, প্রধান তিন চরিত্রের সম্পূর্ণ অন্তর্মুখী ও অন্তর্লীন অভিনয়, অনন্য সুন্দর মনোগ্রাহী চিত্রনাট্য এবং মর্মস্পর্শী অভিনয়ের সমন্বয়ে ‘লা নত্তে’ পরিণত হয় সিনেমা দুনিয়ার সর্বকালের সেরা সৃষ্টিগুলোর একটিতে।
‘লা নত্তে’র পুরো ঘটনা ঘটে একদিন অপরাহ্ন থেকে পরের দিন ভোর পর্যন্ত। ঔপন্যাসিক জিয়োভান্নি ও তার স্ত্রী লিডিয়ার এক দশকের দাম্পত্য জীবন। একদিন অপরাহ্নে তারা অসুস্থ বন্ধু তোমাসোকে দেখতে যায়। মুমূর্ষু তোমাসোকে দেখে দু’জনার সম্পর্কে বেশকিছু ধাক্কা লাগে। লিডিয়ার প্রতি তোমাসোর খুব দুর্বলতা ছিল। কিন্তু লিডিয়ার গাম্ভীর্য তোমাসোকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ক্রমশঃ সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে যা তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। লিডিয়া তবুও জিয়োভান্নির প্রতি তার ভালোবাসায় অবিচল থাকে। সেদিনের সান্ধ্য নিমন্ত্রণে জিয়োভান্নি আকস্মিকভাবে তোমাসোর নার্স উচ্ছল তরুণীটির (মনিকা ভিত্তি) সঙ্গে পরিচিত হয় এবং রাতের এক সময়ে দু’জনে একেবারে কাছাকাছি আসে। দূর থেকে সবকিছু লক্ষ্য করে লিডিয়া। তাদের এত দিনের দাম্পত্যের বিশ্বাসে- অবিচল ভালোবাসায় এই প্রথম ফাটল ধরে।
রাত বাড়তে থাকে। জিয়োভান্নি বিশাল ভবনের আনাচে কানাচে, জনারণ্যে খুঁজে বেড়ায় লিডিয়াকে। লিডিয়া সর্বক্ষণ নিজেকে আড়াল করে রাখে- আর বিদীর্ণ হয় অন্তক্ষরণে। শেষ পর্যন্ত ভোর হয়। দু’জন একত্রিত হয়। শীতল ভোরে দু’জনে একসঙ্গে হাঁটতে থাকে নিষ্প্রাণ পুুতুলের মতো। নিকটবর্তী এক পার্কে এসে জিয়োভান্নি অকপটে স্বীকারোক্তি করে প্রিয় লিডিয়ার কাছে আকস্মিকভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে। লিডিয়ারও মনে আসে তোমাসোর কথা। সে আবার পরম মমতা আর বিশ্বাসে হাত রাখে জিয়োভান্নির হাতে। ছোট দুটি ঘটনা আর মোট চারটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে আন্তোনিওনি তাঁর পর্যবেক্ষণ এমনভাবে তুলে ধরেন যার মাধ্যমে আধুনিক জীবন ও মানুষের অনেক ভান, উপেক্ষা, বিশ্বাস অবিশ্বাস আর বিভ্রান্তির নানা অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয় এবং মানুষ তার সহজাত সততা ও সরলতায় আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসে।
মানবমনের অন্তর্গত রাহসিকতা নিয়ে বিচরণ পিয়াসী মাইকেলেঞ্জোলো আন্তোনিওনির এই শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র কৃতি তাঁকে যেমন চলচ্চিত্র বিশ্বে অধিষ্ঠান এনে দেয়, তেমনি জান মরো, মনিকা ভিত্তি ও মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ানির অনুপম চলচ্চিত্রিক অভিনয়ের সার্থক এক দৃষ্টান্ত হয়েও থাকে- ‘লা নত্তে’। কান, বার্লিন, মিউনিখ, আকাপুলকো, রোম, লিসবন, ব্রাজিল, মেক্সিকো ও প্রাগের চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি অর্জন করে ‘লা নত্তে’ চিরায়ত চলচ্চিত্রের আসনে সুআসীন হয়ে রয়েছে।
আন্তোনিওনির নিজেরও প্রিয় ছবি ছিল ‘লা নত্তে’। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ২৫তম ভারতীয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ অতিথি হয়ে এসেছিলেন আন্তোনিওনি। তাঁকে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা দেয়া হয় ১২ জানুয়ারি সকালে নন্দন চত্বরে। তাঁর সম্মানে সপ্তাহব্যাপী রেট্রোসপেকটিভের আয়োজন করা হয়।
১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ‘রবীন্দ্র সদন মিলনায়তনে ‘লা নত্তে’ ছবির প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে রেট্রোসপেকটিভের উদ্বোধন করেন আন্তোনিওনি নিজে। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী এনরিকা ও জার্মানির প্রথিতযশা চলচ্চিত্রকার ভিম ভেন্ডারস, যিনি সে সময় আন্তোনিওনির সহকারী হয়ে কাজ করেছিলেন।
১২ জানুয়ারি ১৯৯৪ স্মরণীয় সেই সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সদনের বিশাল মিলনায়তনে ছিল হল উপচানো ভিড়। দর্শকের মধ্যে ছিলেন ভারতের এবং বিভিন্ন দেশের সব সেরা সেরা শিল্পী, পরিচালক, কলাকুশলী এবং আমন্ত্রিত ডেলিগেট। অনেক নাম করা মানুষ আসন না পেয়ে সিঁড়িতে, ফ্লোরে বসে পড়েছিলেন। বিশাল মিলনায়তনের সমস্ত দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে আন্তোনিওনি, এনরিকা ও ভিমকে অভিবাদন জানিয়েছেন। সেদিনের সেই স্মরণীয় সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলাম আমিও উৎসবের ডেলিগেট হিসেবে। আন্তোনিওনির সঙ্গে আমরা সবাই বসে দেখলাম ‘লা নত্তে’। ১২ জানুয়ারি সেই সোনালী সন্ধ্যার স্মৃতি আমার জীবনের অনন্য অসাধারণ অবিস্মরণীয় এক অভিজ্ঞতা।
লা নত্তের সংগঠন (La Notte/The Night)
(১৯৬১/ ইতালি ও ফ্রান্সের যৌথ নির্মাণ/ সাদাকালো/ ১২২ মিনিট) চিত্রনাট্য: মাইকেলেঞ্জোলো আন্তোনিওনি, এনিও ফ্লাইয়ানো ও তোনিনো গুয়েরা। আলোকচিত্র: গিয়ানি দি ভেনানজো। সম্পাদনা: এরাল্ডো ডা রোমা। সঙ্গীত: জিয়োর্জিও জাসলিনি। প্রযোজনা: নেপি ফিল্মস (রোম) ও সোফিটেডপি সিলভার ফিল্ম (প্যারিস)। অভিনয়ে: মার্সেলো মাস্ত্রোইয়ানি, জান মরো, মনিকা ভিত্তি, বার্নহার্ড ভিকি, মারিয়া পিয়ালুজি ও রসি মাজাকুরাতি। পরিচালনা মাইকেলেঞ্জোলো আন্তোনিওনি।

x