চিরকুট

বিচিত্রা সেন

শুক্রবার , ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৩ পূর্বাহ্ণ
46

সবাইকে অবাক করে দিয়ে হুট করে মরে গেলেন বিমলবাবু। তিনি মারা যাবার পর থেকে পাড়াময় শুধু একটি প্রশ্নই, কীভাবে মারা গেলেন তিনি? কেউ কেউ এ নিয়ে কিছুসময় ফিসফাসও করেন।যদিও যে কোনো কেউ, যে কোনো সময় হুট করে মারা যেতে পারেন, কিন্তু বিমলবাবুর বেলায় কেউ যেন ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছেন না।
পুরো পাড়ায় বিমলবাবুকে সবাই এক নামে চিনলেও তিনি কিন্তু তেমন হোমরাচোমড়া কেউ নন।খুবই নগণ্য একজন ভদ্রলোক তিনি। হ্যাঁ, ভদ্রলোকই বলতে হবে তাঁকে,কারণ তাঁকে দেখলে এবং তাঁর সাথে কথা বললে বোঝা যায় এককালে তিনি কোনো এক অভিজাত বংশেরই সন্তান ছিলেন। পাড়ায় যখন তিনি প্রথম এসেছিলেন তাঁকে দেখে সবাই তেমনটিই ভেবেছিলেন।কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যে সবাই বুঝতে পারলো বংশটা সম্ভ্রান্ত হলেও এবং উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও বর্তমানে তিনি একেবারে কর্পদপহীন, আপাদমস্তক বেকার। বেকার না ভেবে আর কীই বা ভাববে, কারণ সারাদিন তো তিনি একটি কাজই করেন,আর সেটি হলো গলির মুখে এক মুদির দোকানের সামনে টুলে বসে থাকা। কী কারণে তিনি খাওয়ার সময়টা ছাড়া বাকী সময়টা ওখানে বসে থাকেন সেটা নিয়ে অনেকে মাথা না ঘামালেও, কারো কারো কিন্তু তীব্র কৌতূহল জন্মে।নানাভাবে অনুসন্ধান করে এ প্রশ্নের উত্তর মেলে না।
বিমলবাবুকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি একটু হেসে নীরবই থাকেন,হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে আসে, তবে তাতে তাঁর বসে থাকার ব্যত্যয় ঘটে না।মাঝে মাঝে খুব মন দিয়ে তাঁকে পেপার পড়তে দেখা যায়। বাকীটা সময় মুদির দোকানের মালিক কিংবা অন্য কারো সাথে টুকটাক কথা বলেই কাটিয়ে দেন। এই একটি কাজ তিনি এতটা মন দিয়ে করেন যে, তাঁর একাগ্রতা নিয়ে তাঁর শত্রুপক্ষও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তুলতে দ্বিধান্বিত হবেন।
মারা যাবার ঘন্টাখানেক আগেও বিমলবাবুকে ওই দোকানের সামনে দেখা গিয়েছিল। তারপরই লোকটা হুট করে মরে গেলো!
এমনিতে কেউ বিমলবাবুকে নিয়ে মাথা না ঘামালেও আজ লোকটার জন্য কেমন যেন মায়া অনুভব করে সবাই।
ভাগ্যদোষে হোক কিংবা নিজের দোষেই হোক জীবনে বিমলবাবু কিছুই করে উঠতে পারেননি।যৌবনে তিনি কিছুদিন রাজনীতি করেছিলেন,তবে সেখানেও তিনি সুবিধা করতে পারেননি।এ ধরনের লোকেরা সাধারণত বিয়ে করেন না,কিন্তু বিমলবাবু বিয়ে করেছেন। দুটি মেয়েও আছে তাঁর।স্ত্রী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা। স্ত্রীর উপার্জনেই সংসার চলে তাঁর।একসময় খুব আর্থিক অনটন ছিল, তবে ইদানিং সরকার শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোতে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে।মেয়ে দুটো বিবাহ উপযুক্তা, কিন্তু কোনো সম্বন্ধ আসলে বিমলবাবু গা করেন না।তাঁর ধারণা যেদিন বিয়ের ফুল ফুটবে সেদিন বরপক্ষ ঘরে এসেই তাঁর মেয়েদের নিয়ে যাবেন।শত চেষ্টা করেও সেদিন তিনি মেয়েদের ঘরে আটকে রাখতে পারবেন না।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেদিনটা বিমলবাবুর আর দেখা হয়ে উঠলো না! মেয়ে দুটোকে বিয়ে না দিয়েই তিনি হুট করেই ইহলীলা সাঙ্গ করলেন।
আজ পাড়াময় শুধু একটাই আলোচনা কীভাবে মারা গেলেন বিমল চৌধুরী? যেহেতু ঘরে দুটো বিবাহ উপযুক্ত মেয়ে আছে তাই আলোচনাটা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রসালো করতে কারো কোনো বেগ পেতে হয় না।তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুটা বার বার বিমলবাবুকে ছাপিয়ে মেয়ে দুটোই হয়ে ওঠে।
পাড়াময় এত আলোচনা সমালোচনা কিন্তু বিমলবাবুর পরিবারকে স্পর্শ করে না। তীব্র শোকে তাঁর স্ত্রী- কন্যারা যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।বাবার কোনো আয় উপার্জন ছিল না,তবুও বাবাই ছিল সুপ্তি-দীপ্তির প্রাণ।সুপ্তি-দীপ্তি মানে বিমলবাবুর মেয়েরা।সুপ্তির বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে বলতে গেলে,তবুও বিয়ে নিয়ে বাবার নির্লিপ্ততায় বাবার উপর কোনো ক্ষোভ ছিল না তার।তার বাবা এত ভালো একজন মানুষ তার বাবাকে নিয়ে তার অহংকারই হয়। দীপ্তি মাঝে মাঝে বাবার উপর ক্ষুদ্ধ হলেও সুপ্তি দীপ্তিকে বোঝাতো। আর মায়ের কারণে তো বাবাকে কিছুই বলা যেতো না।মূলত বিমলবাবুর আজীবন বেকার থাকার জন্য পরোক্ষভাবে বিমলবাবুর স্ত্রীকেও দায়ী করা যায়! কারণ তিনি কখনো অন্যান্য স্ত্রীদের মতো স্বামীর বেকারত্ব নিয়ে হাহুতাশ করতেন না।স্ত্রীর কাছ থেকে কোনোরূপ তিক্ততা না পেয়ে বিমলবাবু আজীবন বেকার থেকে জীবনকে উপভোগই শ্রেয় মনে করেছিলেন।কিন্তু এই যে আত্মতৃপ্ত বিমলবাবু হঠাৎ মরে গেলেন তাঁর স্ত্রীও বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি মারা গেলেন কীভাবে?আরও একটা ব্যাপার তাঁকে কৌতূহলী করছে তাঁর স্বামীর মৃত্যু নিয়ে পাড়ার লোকের কেন এত আগ্রহ? এটা কি নিছক কৌতূহল? নাকি অন্য কোনো রহস্য আছে এর পেছনে?
সকালবেলা তিনি তাঁর দুমেয়েকে নিয়ে গিয়েছিলেন বোনের বাড়িতে। দুপুরে খেয়ে বোনের বাড়ি থেকে ফেরার সময় খেয়াল করলেন গলির মুখের নির্দিষ্ট দোকানটিতে বিমলবাবু নেই।পাড়ার অন্য সবার মতো বিমলবাবুর পরিবারের লোকজনও তাঁকে ওই দোকানটাতে বসা দেখতেই অভ্যস্ত। তাই ওখানে না দেখে কিছুটা বিস্মিতই হয়েছিলেন তাঁরা।তাঁদের দেখে দোকানদার কেমন যেন বিব্রত হয়ে মাথা নিচু করে ফেললো। ব্যাপারটা খটকা লাগার মতো। তবুও দোকানদারের সাথে কোনো কথা না বলে সোজা ঘরে চলে এসেছিলেন তাঁরা।
ঘরে এসে দরজায় তালা না দেখে বুঝলেন বিমলবাবু ভেতরেই আছেন, অনেকটা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন তিনি। কলিংবেল দিতে গিয়ে দরজায় হাত লাগতেই দরজাটা খুলে গিয়েছিল।খাটের উপর কাত হয়ে শোয়া বিমলবাবুকে দেখে একটু অবাকই হয়েছিলেন তাঁর পরিবারের লোকেরা।এমনভাবে দরজা খোলা রেখে ঘুমিয়ে থাকার মানুষ তো তিনি নন! তাই কৌতূহলী হয়ে তাঁর পিঠে হাত রাখতেই চমকে উঠেছিলেন তাঁর স্ত্রী।শক্ত শীতল এক শরীর তাঁকে এক ধাক্কায় যেন ছিটকে সরিয়ে দিল! সুপ্তিচ মুখ দিয়ে নিজের অজান্তেই যেন শব্দটা বেরিয়ে আসে বিমলবাবুর স্ত্রীর।মায়ের বিস্ফোরিত চোখ আর আতংকিত অস্ফুট স্বর সুপ্তিকে টেনে নিয়ে যায় বাবার কাছে। তারপর বাবার শরীর ছুঁয়েই এক বিকট চিৎকার সুপ্তির,সাথে সাথে শরীর না ছুঁয়েই দীপ্তির তীক্ষ্ণ আর্তনাদ পুরো পাড়ার মানুষকে ওদের ঘরমুখী করে।তারপর থেকে সবারই ওই একটিই প্রশ্ন কীভাবে মারা গেলেন বিমলবাবু? তারই সাথে চলে কারো কারো ফিসফাস!
কিন্তু মুখে মুখে এ প্রশ্ন ঘুরে বেড়ালেও জবাব মেলার আগেই বিমলবাবুর দাহপর্ব শেষ হয়। তবুও কারো কৌতূহল নিবৃত্ত হয় না, এমন কি তাঁর পরিবারেরও না।
তারপর দিনের পর দিন গিয়ে সাত দিন ফুরালে সবাই ধরে নেয় উনি হয়তো হার্ট অ্যাটাকেই মারা গেছেন।
তাঁর পরিবারও যখন এমনটাই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন তখনই হঠাৎ একদিন দীপ্তির ইচ্ছে হয় বিমলবাবুর কাপড়চোপড়, ঔষধপত্র সব গুছিয়ে রাখতে। কাপড়গুলো সব গুছিয়ে রেখে ওষুধের বাক্সটা পরিষ্কার করতে গিয়ে দীপ্তি পেয়ে যায় চিরকুটটা। ওষুধের বাক্সে বাবার হাতের লেখা চিরকুট দেখে ভ্রু কুঁচকে ওঠে দীপ্তির। কী এটা? বাবা চিরকুট লিখে ওষধের বাক্সে রেখেছে কেন? কাকে লিখেছে এ চিরকুট? হাত কাঁপতে থাকে তার, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।বুক ঢিবঢিব করলেও দ্রুত চোখ বুলায় সে চিরকুটটাতে। বাবা লিখেছেন
আজ আমাকে গলার কলার ধরে খুব শাসালো নরেন। বেশ কিছুদিন ধরে ও আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে আসছিলো। আজ বললো,কাল থেকে আমাকে ওই দোকানে দেখলে পা ভেঙে দেবে। আমার জন্য নাকি পাড়ার মেয়েরা ওই দোকানের সামনে দিয়ে চলাচল করতে পারে না। আমাকে বললো বুইড়া লম্পট। পাড়ার বৌ ঝিরা নাকি আমার নামে ওর কাছে নালিশ করেছে।সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে এ দৃশ্য উপভোগ করলো।কেউ প্রতিবাদ করলো না।খুব অপমান লাগছে আমার।আমি তো কোনোদিন কারো ক্ষতি করিনি, কোনো মহিলার দিকে তাকাইওনি, তবুও কেন ওরা আমার সাথে এমন করলো? আমাকে ক্ষমা করো তোমরা।ছেলের বয়সী একটা ছেলের হাতে এত অপমান সইতে পারলাম না। পাড়ার লোকদের কাছে বুইড়া লম্পট হিসেবে আমি বাঁচতে চাই না। চলে যাচ্ছি আমি।
নিচে বিমলবাবুর স্বাক্ষর। চিঠিটা পড়ে নিজের অজান্তেই দীপ্তির হাত চলে যায় বিমলবাবুর ওষধের বাক্সে। যা ভেবেছিল তাই, একমাসের জন্য কেনা সব ওষধ রয়ে গেলেও ঘুমের ঔষধ একটিও নেই। টপটপ করে চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে চিবুকে দীপ্তির। পাড়ার নরেন! অর্ধশিক্ষিত মাদকাসক্ত নব্য মাস্তান। প্রায় ছয়মাস ধরে ওর পিছু লেগেছে। বার বার প্রেম নিবেদন করেও যখন দীপ্তির সাড়া পায়নি, দীপ্তির কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তখন ওর বাবাকে অপমান করে প্রতিশোধ নিয়েছে।এত জঘন্য নরেন? ওর ভালোমানুষ বাবাটাকে নরেন সবার সামনে গায়ে হাত তুলেছে? বুড়ো লম্পট বলে কলংকিত করেছে? ওর প্রত্যাখানের জ্বালা ওর বাবার উপর মিটিয়েছে? মাকে কি জানাবে এটা? না, মা এ নির্মমতা সইতে পারবে না। দিদিকে কি বলবে কিছু? না, দিদিকেও না। তার চেয়ে নরেনের সাথে বোঝাপড়াটা নাহয় দীপ্তিরই হোক। নরেনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই চোখ দুটো জ্বলে ওঠে দীপ্তির।

Advertisement