চিকিৎসা করতে দেয়া হচ্ছে না, অভিযোগ এরশাদের

তার সমস্যা বয়সের, বললেন ভাই জি এম কাদের

শুক্রবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৩:৩০ পূর্বাহ্ণ
121

নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের অসুস্থতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার মধ্যে গতকাল তিনি অভিযোগ করেছেন, অসুস্থ হওয়ার পরও তাকে চিকিৎসা করতে এবং বাইরে যেতে দেয়া হচ্ছে না। কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তা স্পষ্ট না করেই আলোচিত এই রাজনীতিবিদ বলেছেন, তাকে ‘দমিয়ে রাখা’ যাবে না। তবে তার ভাই দলের কো চেয়ারম্যান জি এম কাদের এবং মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন ভিন্ন কথা। জি এম কাদের বলছেন, ৮৮ বছর বয়সে ‘যতটা’ সুস্থ থাকার কথা, ‘ততটা’ সুস্থ এরশাদ আছেন। তার চিকিৎসা নিয়ে ‘ধূম্রজালের’ কোনো সুযোগ নেই। আর মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, এরশাদ বড় রকমের অসুস্থ- এটা মনে করার মত কিছু ঘটেনি। তার বিদেশে যাওয়ার বিষয়েও কোনো বাধা নেই। খবর বিডিনিউজের।
নির্বাচন সামনে রেখে পার্টির মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়ার পর গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যাচ্ছিল না এরশাদকে। তার অসুস্থতার বিষয়ে জাতীয় পার্টির এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দেয়া হচ্ছিল সাংবাদিকদের। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে অনেকটা হঠাৎ করেই বনানীতে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে এসে গাড়ি থেকে না নেমে নেতাকর্মীদের সামনে কয়েক মিনিট কথা বলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। এরশাদ বলেন, ‘আজ বলতে এসেছি, আমাকে কেউ দমিয়ে রাখতে পারবে না, এগিয়ে যাব। আমার বয়স হয়েছে, চিকিৎসা করতে দেবে না, বাইরে যেতে দেবে না। মৃত্যুকে ভয় করি না।’ নেতাকর্মীদের অভয় দিয়ে এরশাদ বলেন, ‘তোমাদের কোনো ভয় নেই। জাপা তোমাদের মাঝে বেঁচে
থাকবে। জাপা চিরদিন নির্বাচন করেছে, এবারও করবে।’
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে এরশাদ নাটকীয় অসুস্থতা নিয়ে সিএমএইচে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে ভর্তি থাকা অবস্থাতেই তিনি এমপি নির্বাচিত হন এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের দায়িত্ব পান। এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে ‘অসুস্থ’ এরশাদের সিএমএইচে ভর্তির খবর এলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এবিষয়ে গুঞ্জনের মধ্যেই জাতীয় পার্টির জোটসঙ্গী আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত মাসের শেষে সাংবাদিকদের বলেন, এরশাদের অসুস্থতা ‘রাজনৈতিক’ নয়, তিনি সত্যিই অসুস্থ। তাকে দুই-এক দিনের মধ্যে সিঙ্গাপুরে নেয়া হতে পারে। কিন্তু জাতীয় পার্টির তখনকার মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার তখন সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, এরশাদের অসুস্থতা ‘এমন কিছু নয়’। তিনি নির্বাচনে অংশ নেবেন।
ঋণ খেলাপের অভিযোগে পটুয়াখালী-১ আসনে হাওলাদারের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেলে গত সোমবার অনেকটা আকস্মিকভাবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব পদে পরিবর্তনের ঘোষণা আসে। এরশাদের ‘সন্তানতুল্য’ এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে মহাসচিব করা হয় পার্টিতে ‘সরকারঘনিষ্ঠ’ হিসেবে পরিচিত মসিউর রহমান রাঙ্গাকে। নতুন মহাসচিব রাঙ্গা বলেন, রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যাওয়ার পর শারীরিক অবস্থা নিয়ে এরশাদ ভয়ে থাকেন। একারণে তাকে হাসপাতালে যেতে হয়।
ঘুমের ডিস্টার্ব হলেও তিনি সিএমএইচে যান। বাসায় একা থাকেন বলে তার একলা লাগে, ভয় করে। এছাড়া ইনফেকশনের ভয়ও আছে।’ নতুন মহাসচিব দাবি করেন, এরশাদ এখন ‘হান্ড্রেড পারসেন্ট ফিট’ থাকলেও চিকিৎসার জন্য তার দেশের বাইরে যাওয়া জরুরি। কিন্তু পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব শেষ না করে তিনি দেশের বাইরে যেতে চান না। মহাজোটের আসন ভাগাভাগির বিষয়টি চূড়ান্ত হলে ১০ ডিসেম্বরের পর হয়ত এরশাদ বিদেশে যেতে পারেন।
গতকাল বনানীর কার্যালয়ের সামনে এসে নতুন মহাসচিবকে নিয়েও কথা বলেন এরশাদ। তিনি বলেন, ‘পুরনো মহাসচিবকে ভালোবাসতাম। নতুন মহাসচিবকে তোমরা ভালোবেসো। সে নতুন, তাকে সাহায্য করো।’[
এরশাদ বলেন, ‘বেঁচে আছি, বেঁচে থাকব। ২৭ বছর ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছি, পার্টি ছাড়ি নাই৷ সব নির্ভর করে তোমাদের উপর। কেউ পার্টি ছেড়ে যেও না, আমাকে প্রতিশ্রুতি দাও।’ এরশাদ তার কর্মীদের বলেন, ‘আমার ব্লাড শর্টেজ আছে, একটু বাসায় যাচ্ছি খেতে।’ এসময় কার্যালয়ের সামনে কর্মীরা স্লোগান ধরেন- ‘এরশাদের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’। ‘অ্যাকশন অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’।
এদিকে গতকাল দুপুরে জাতীয় পার্টির বনানীর কার্যালয়ে এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন এরশাদের ভাই জিএম কাদের। তিনি বলেন, ‘এরশাদ সাহেব একজন বয়স্ক রাজনীতিবিদ, উনার বয়স হয়েছে। এই বয়সে স্বাভাবিক কারণেই শারীরিক অনেক সমস্যা দেখা যায়। উনারও সমস্যা হচ্ছে।’

জিএম কাদের বলেন, ‘চিকিৎসকরা এরশাদকে যতটুকু দৌঁড়ঝাপ করার অনুমতি দিয়েছেন, তিনি তার চেয়ে বেশি করেন। এটা তার শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ডাক্তাররা উনাকে বিধিনিষেধ দেন- ‘এখানে যেতে পারবেন, ওখানে যেতে পারবেন না। বসে থাকতে হবে, ঘুমাতে হবে।’- এমন বাধা তো আমরা অসুস্থ হলে আমাদেরও দিতেন চিকিৎসকরা।’
পর মুহূর্তেই কাদের বলেন, ‘তবে তার চিকিৎসায় বাধা আছে বা তিনি ভীষণ খারাপ অবস্থার মধ্যে আছেন, তাও কিন্তু নয়। তবে উনি যে সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন, তাও নয়।’
এক প্রশ্নের জবাবে জি এম কাদের বলেন, ‘উন্নত চিকিৎসার জন্য এরশাদের সিঙ্গাপুর যাওয়া নিয়ে দল উৎকণ্ঠিত নয়। ডাক্তাররা যদি বলেন, এখানে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে, তাহলে কেন তাকে নিয়ে যাব? তবে তারা যদি মনে করেন, এখানকার চিকিৎসা যথেষ্ট নয়, উনাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যেতে হবে, তখন নিয়ে যাওয়া হবে। এটা নিয়ে আমরা উৎকণ্ঠিত নই।’
এরশাদের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির কো- চেয়ারম্যান বলেন, ‘তিনি যতটুকু সুস্থ থাকার কথা, ততটুকু আছেন। তবে সম্পূর্ণ সুস্থ এটা বলা বোধ হয় ঠিক হবে না।’
শারীরিক অবস্থা যাই হোক, এরশাদ দলীয় সব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত আছেন এবং তার নির্দেশনায়, তার নিয়ন্ত্রণেই জাতীয় পার্টি চলছে বলে মন্তব্য করেন জি এম কাদের।
এরশাদ ঠিক কী ধরনের অসুস্থতায় ভুগছেন জানতে চাইলে খানিকটা বিরক্ত হয়েই তার ভাই বলেন, ‘অসুখের ব্যাপার হল পারসোনাল ব্যাপার। অসুখের ইনফরমেশন দিতে আমি বাধ্য নই। এটা আমি দেব না। এটা কোনো হসপিটালে চাইলেও পাবেন না।’
নির্বাচনের আগে এরশাদের বিদেশে যাওয়া নিয়ে সরকারের দিক থেকে কোনো নিষেধ আছে কি না- এ প্রশ্নও জি এম কাদেরের কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা।
জবাবে তিনি বলেন, ‘কদিন আগে দলে বড় রদবদল হয়েছে (মহাসচিব পরিবর্তন)। তিনি দল পরিচালনা করছেন। তিনি কন্ট্রোলে আছেন। এটা নিয়ে আমি মনে করি, কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই। বিধি নিষেধ যদি থাকত, তাহলে দলের রদবদল তো হল, সেটা আর সম্ভব হত না।’
কাদেরের ভাষায় এ ধরনের একটি কথা গতবার ‘রটেছিল’। এ কারণে এবারও তেমন আশঙ্কার কথা কেউ কেউ বলছেন।

x