চিকিৎসার জন্য আজ হাসপাতালে নেয়ার প্রস্তুতি কারা কর্তৃপক্ষের

বিএসএমএমইউতে যেতে চান না খালেদা

ঢাকা ব্যুরো

মঙ্গলবার , ১২ জুন, ২০১৮ at ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ
81

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে সঠিক চিকিৎসার স্বার্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করবে কারা কর্তৃপক্ষ। খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের উপস্থিতিতেই চিকিৎসা করানো হবে। এজন্য তাকে আজ মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালে নেয়ার যাবতীয় প্রস্তুতিও নিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে খালেদা জিয়ার যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপ কে ব্যবস্থা নেয়ারও অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে যেতে চাচ্ছেন না খালেদা জিয়া। তিনি ওই হাসপাতালকে ‘অত্যন্ত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন’ মন্তব্য করে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করানোর জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। বিশেষায়িত ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করাতেন। যেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেন, সেখানেই তিনি চিকিৎসা করাতে চান।

কারা সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ তেমন ভালো না থাকায় পরিস্কার পরিচ্ছন্নের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করে খালেদা জিয়াকে রাজী করানোর চেষ্টা চলছে। কারা কর্তৃপক্ষ ও বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ চিকিৎসকদের সুপারিশকৃত বিভিন্ন পরীক্ষাসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে।

সূত্র জানায়, আজ মঙ্গলবার সকাল ১১ টার দিকে খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ’তে নেয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে। সেখানে তার তিনটি পরীক্ষা করার কথা রয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গতকাল সোমবার দুপুরে কারা অধিদপ্তরের নিজ কার্যালয়ে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাবিধি অনুযায়ী কোন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব নয়। কারাবিধি অনুযায়ী সরকার বন্দির সর্বোচ্চ চিকিৎসার স্বার্থে ও সর্বাধুনিক সুবিধা সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়েই খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা করা হবে। তবে এজন্য খালেদা জিয়ার মতামত জানতে চাওয়া হবে। তিনি রাজি থাকলে তার মতামতের ভিত্তিতেই তাকে সেখানে পাঠানো হবে।

তিনি বলেন, সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালে বন্দির স্বাস্থ্য পরীক্ষার সকল ব্যবস্থা থাকলে বাইরের হাসপাতালে কোনো প্রকার চিকিৎসা প্রদানের নিয়ম নেই। আমরা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সুপারিশ অনুযায়ী যেসব চিকিৎসা করানো প্রয়োজন তার জন্য দরকারী পরীক্ষানিরীক্ষা বিএসএমএমইউ’তেই করানো সম্ভব বলে জেনেছি। তারপরও কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকলে আমরা সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে বাইরের বেসরকারি হাসপাতালে অন পেমেন্টে চিকিৎসা করানো হবে। খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় কোনো প্রকার গাফলতি করা হচ্ছে না ও এবং হবেও না।

খালেদা জিয়া অজ্ঞান হয়ে পরেছিলেন কি না সংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক বলেন, তিনি অজ্ঞান হয়ে পরেননি তবে দাঁড়ানো অবস্থায় কিছুটা ইনব্যালেন্সড হয়ে পরেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের দায়িত্বরত মহিলা কারারক্ষী ও কাজের মেয়ে ফাতেমা ওনাকে ধরে নিয়ে কিছু একটা খাইয়ে অবস্থা স্বাভাবিক করেছেন। পরে তিনি সুস্থ হন। সাথে সাথেই কারা ডাক্তার গিয়ে তার প্রেসার মাপলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় লো প্রেসার হিসেবেই দেখতে পান।

কারা মহাপরিদর্শক বলেন, বিএনপি নেত্রীকে সংগঠনের পক্ষ থেকে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেয়ার দাবি জানালেও তা নেয়া সম্ভব নয়। যদি তিনি রাজি থাকেন তাহলে আমরা তাকে মঙ্গলবার সকালে বিএসএমএমইউতে নিয়ে যাবো।

কারা মহাপরিদর্শক বলেন, জেল কোড অনুযায়ী সরকারি অর্থ খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ নেই। তবে সরকার চাইলে বেসরকারি হাসপাতালে কারো চিকিৎসায় অনুমোদন দিতে পারে বলে জানান তিনি। এক্ষেত্রে চিকিৎসা খরচ কে বহন করবে, কীভাবে করবে, তার ফয়সালা করতে হবে।

বিএসএমএমইউ নিয়ে বিএনপির আপত্তির প্রেক্ষাপটে সৈয়দ ইফতেখার বলেন, বিএসএমএমইউ চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী সর্বোচ্চ সরকারি প্রতিষ্ঠান। যদি সেখানে তার চিকিৎসার বিষয়ে কোনো সুযোগসুবিধার অভাব থাকে, তাহলে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার প্রশ্ন আসে।

খালেদার ‘মাইল্ড স্ট্রোক’ হওয়ার যে ধারণার খালেদার ব্যক্তিগত চিকিৎসকরা দিয়েছিলেন, দৃশ্যত তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তিনি বলেন, উনি পুরোপুরি অজ্ঞান হননি। কিছুটা ইমব্যালেন্সড হয়েছিলেন। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসাও করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে কারা মহাপরিদর্শক জানান, ঈদের দিন বিশেষ খাবার পাবেন খালেদা জিয়া। এছাড়া তার স্বজনরা দেখা এবং বাড়ি থেকে খাবার নিয়েও আসতে পারবেন। পরে বেলা সাড়ে তিনটায় কারামহাপরিদর্শক পুরান ঢাকার কারাগারে খালেদা জিয়াকে দেখতে যান ও প্রায় এক ঘন্টা পর বের হন।

পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চান না খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়া পিজি হাসপাতালে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে) চিকিৎসা নিরাপদ মনে করেন না বলেই তিনি সেখানে চিকিৎসা নিতে চাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার মহা চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। গুরুতর অসুস্থ খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে যে তাচ্ছিল্য ও অবহেলা চলছে, তাতে গভীর আশঙ্কা হয়।

নয়াপল্টনে গতকাল সোমবার দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রুহুল কবির রিজভী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে ইউনাইটেড হাসপাতালে উন্নত মানের চিকিৎসার দেওয়ার দাবি উপেক্ষা করে সরকার তাঁকে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে চলেছে। সেখানে সব দলবাজ চিকিৎসক। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আগেই সেখান থেকে চাকরিচ্যুত করে বিদায় দেওয়া হয়েছে।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের দলবাজ চিকিৎসকদের দিয়ে খালেদা জিয়ার যথাযথ চিকিৎসা হবে না। কেননা তাঁদের ওপর খালেদা জিয়া এবং দেশের মানুষের কোনো আস্থা নেই। তারপরেও সরকার জবরদস্তিমূলকভাবে খালেদা জিয়াকে পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলছে। এটি দুরভিসন্ধিমূলক এবং সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়া পিজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিরাপদ মনে করেন না বলেই তিনি সেখানে চিকিৎসা নিতে চাচ্ছেন না। দেশের জনগণ খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠিত। খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে সরকারি নোংরা চাতুরী রীতিমতো উদ্বেগ, ভয় ও বিপদের অশুভ সংকেত।

রিজভী আরও বলেন, খালেদা জিয়ার জ্ঞান হারানোর মতো এত বড় একটি দুঃসংবাদের পরও কারা কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, বরং দিনের পর দিন সময়ক্ষেপণ করে তাঁর অসুস্থতাকে আশঙ্কাজনক মাত্রায় নিয়ে যেতে চাচ্ছে। খালেদা জিয়াকে তাঁর পছন্দ অনুযায়ী বিশেষায়িত ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং ঈদুল ফিতরের আগে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন রিজভী।

সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচি ঘোষণা করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ঈদুল ফিতরের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবিতে ১৪ জুন বৃহস্পতিবার সারা দেশে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করবে জেলা বিএনপি।

x