চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা ও সরকারের নির্দেশনা

রবিবার , ৫ মে, ২০১৯ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
419

দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। দুর্গম এলাকা ও গ্রাম পর্যায়ে বেশিরভাগ চিকিৎসক অবস্থান না করার কারণে সেই এলাকার জনসাধারণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে কতিপয় নির্দেশনা জারি করেছেন। গতকাল ৪ মে দৈনিক আজাদীতে ‘বদলি হলেই যোগদান বাধ্যতামূলক, অন্যথায় ব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, এখন থেকে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করতেই হবে চিকিৎসকদের। বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে অহেতুক কালক্ষেপণ এবং যোগদান না করে আদেশ বাতিলের জন্য এখন থেকে সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদফতরে আর আবেদন করা যাবে না। এছাড়া বদলির আদেশ বাতিলে তদবির-আবেদনে চাকরি অনিয়মিত হলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেবে স্বাস্থ্য অধিদফতর। সাম্প্রতিক সময়ে বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে বদলি আদেশ বাতিলে চিকিৎসকদের তদবির ও সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদফতরে দৌড়ঝাঁপের প্রেক্ষিতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিত্তহীন বা নিম্নবিত্তের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। তারা সেখানে ভিড় করেন, নানা বিড়ম্বনার শিকার হওয়া সত্ত্বেও। সেখানে কখনও কখনও নিয়মিত ডাক্তারের উপস্থিতি নেই। রয়েছে ওষুধ-পথ্যের অভাব। নিজের টাকায় ওষুধপত্র কিনে হাসপাতালে চিকিৎসা লাভের আশায় রোগীদের পড়ে থাকতে হয়। কখনও অপরিপক্ব বা ভুয়া চিকিৎসকের কবলে পড়ে রোগীর অকালে প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটে। দেশের শহর ও গ্রামে সর্বত্র হাসপাতাল বা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কিছু সরকারি চাকুরে চিকিৎসক যুক্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে অনেক সময় তাদের সরকারি হাসপাতালে খুঁজে পাওয়া যায় না। অফিসকালীন প্রাইভেট চেম্বারে বসে নির্দ্বিধায় রোগী দেখেন কিছু চিকিৎসক। প্রাইভেট প্র্যাকটিসের প্রতি চিকিৎসকদের সীমাহীন আসক্তির কারণে দেশের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হয় না বলে অভিযোগে প্রকাশ। এ কথা সত্যি যে, শহরের জীবনযাপনে অভ্যস্ত চিকিৎসকরা অনেকে গ্রামগঞ্জে পোস্টিং নিয়ে যেতে চান না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যাদের গ্রামের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোয় পড়ে থাকতে হয় তাদের মাঝে দেখা যায় পেশার প্রতি চরম অনীহা। এসবের ব্যতিক্রম চিকিৎসক যারা রয়েছেন তাদের দিয়ে চলে এসব হাসপাতাল। দেশের সাধারণ দরিদ্র মানুষের কষ্টার্জিত অর্থের বিনিময়ে গড়া এ দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো।
স্বাস্থ্য খাতের অর্থায়ন নীতি ও কৌশল নির্ধারণ এবং বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার বিষয়ে এই প্রতিষ্ঠানের নথিতে বলা হয়েছে, অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলে বিনিয়োগ করার পরও দেশের মানুষের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য খাতে এটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তুষ্টি আছে। সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও এ কথা সত্যি যে প্রতিবছর বহু মানুষ চিকিৎসার জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারতে যায়। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে অবস্থাপন্ন মানুষেরা। অর্থে কুলালে আরও বেশি মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেত। দেশে চিকিৎসাসেবার মানের ব্যাপারে সন্দেহ থাকায় মানুষ বিদেশে যাচ্ছে। মানসম্পন্ন সেবার সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সম্পর্ক আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানসম্পন্ন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক, নার্সসহ ২৩ জন স্বাস্থ্যকর্মীর একটি দল থাকা দরকার। ব্রিটিশ চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ২০১৩ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত নিয়ে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিল। ওই সংখ্যায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে ৮ লাখ স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি আছে। দেশের প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য ৩ দশমিক ৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন মাত্র।
দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি মানসম্পন্ন সেবার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২১ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কর্মকর্তারা দেশের ৮ জেলার ১১টি সরকারি হাসপাতালে অভিযান চালিয়েছিলেন। ওই দিন হাসপাতালগুলোতে ২৩০ জনের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। বাস্তবে ছিলেন ১৩৮ জন। অর্থাৎ ৪০ শতাংশ চিকিৎসক অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপস্থিত স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসকের পক্ষে বিপুলসংখ্যক রোগীকে মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁদের মতে, একজন চিকিৎসক তৈরি করতে রাষ্ট্রের ব্যয় হয় অঢেল অর্থ। তাই রোগীর প্রতি, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি একজন চিকিৎসকের দায়ভার অনেক। আর চিকিৎসাসেবা এক মহান পেশা। এ পেশায় নিয়োজিতদের আত্মত্যাগের মনোভাব থাকা জরুরি। নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক ছাড়া কখনও মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না। সরকারি হাসপাতালের কর্তব্যে ফাঁকি দিয়ে চিকিৎসকের প্রাইভেট ক্লিনিক বা হাসপাতালে বাড়তি আয়ের নেশায় মেতে ওঠা অমানবিক। তবে আমরা এজন্য পুরো চিকিৎসক সমাজকে দায়ী করছি না। যাঁদের কারণে এ অপবাদ, তাঁদের ভিতরে পরিশুদ্ধি আসুক, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।

x