চাষিরা এক ছড়া কলা বিক্রি করছে ১০০ টাকা, বাজারে এক জোড়া ১৬ টাকা

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান

বুধবার , ১২ জুন, ২০১৯ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ
332

পাহাড়ে উৎপাদিত মিশ্র ফলের মধ্যে কলা অন্যতম। নানান পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ফল কলার চাষ বাড়ছে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত সুস্বাদু বাংলা, চাপা এবং দেশীয় সাগর কলা বিক্রি হচ্ছে দেশের বাহিরেও। স্বল্প পুজিঁতে অধিক লাভজনক হওয়ায় কলা চাষের দিকে যুগছে পাহাড়িরাও।
কৃষি বিভাগের মতে, জেলার রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, সদর’সহ সাতটি উপজেলায় ৮ হাজার ২৫৮ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের কলার চাষ হচ্ছে। তারমধ্যে বাংলা, চাপা এবং দেশীয় সাগর তিনটি জাতের পরিমাণ বেশি। গতবছরের তুলনায় এবছর কলার চাষ বেড়েছে দুইশ ষাট হেক্টর পাহাড়ি জমিতে। উৎপাদনের পরিমাণও বেড়েছে কয়েকগুণ। এবছর জেলায় প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন কলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৩০ মেট্রিক টনের বেশি ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
এদিকে বিভিন্ন জাতের কলায় ছেয়ে গেছে বান্দরবানের স্থানীয় হাট-বাজারগুলো। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পাহাড়িরা কলা বিক্রি করতে নিয়ে আসছেন হাট-বাজারগুলোতে।
তবে সপ্তাহে দুদিন রবি ও বুধবার বান্দরবান বাজারে বসে কলার প্রধান হাট। জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাহাড়ি-বাঙালিরা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পাশ্ববর্তী স্থানে বাজারে কলা বিক্রি করতে ভিড় জমান। সপ্তাহের এ দুদিন পর্যটনের শহর বান্দরবান পরিণত হয় কলার শহরে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে কলা আসতে থাকে বান্দরবান বাজারের এই হাটে। এখান থেকেই জেলার পাশ্ববর্তী সাতকানিয়া, দোহাজারি, আমিরাবাদ, পটিয়া, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা চাষীদের কাছ থেকে পাইকারী হিসেবে কম দামে কলা কিনে নেয়। বিকালে কলা’গুলো ট্রাক-পিকআপ ভ্যানে করে বিক্রির জন্য নিয়ে যায় চট্টগ্রাম’সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাজারে কলা নিয়ে বসার জন্য চাষীদের ছড়া প্রতি ট্যাক্স দিতে হয় ২ টাকা। এছাড়াও কলা নিয়ে যাওয়ার সময় ব্যবসায়ীদেরও আরেক দফায় টোল দিতে হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সদর উপজেলার বাঘমারার কলাচাষী অংথোয়াই মং, চিংসা প্রু মারমা বলেন, কলা চাষ লাভজনক। অল্প খরচে কলা চাষে সফলতা পাওয়া যায়। এই অঞ্চলে উৎপাদিত বাংলা কলার চাহিদাও রয়েছে। পাহাড়ে তাদের দুজনের ছয় একর কলা বাগান রয়েছে। তারমধ্যে বাংলা এবং চাপা কলার পরিমাণ বেশি। দেশীয় সাগর কলাও রয়েছে, কিন্তু পরিমাণে কম। আবাহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ভালো ফলন হয়েছে। বাগানের কলা বিক্রি তারা এ পর্যন্ত ৯৫ হাজার টাকা করে পেয়েছে। বাগানে আরো অনেক কলা রয়েছে।
ডলুপাড়ার কলাচাষী চষা থোয়াই মারমা বলেন, কলা চাষ করে তার পরিবারের ভাগ্য বদলেছে। চার একর পাহাড়ি জমিতে কলার চাষ করেছেন তিনি। কলা বাগানের আয়ে একটি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। দুটি ছেলেকে স্কুলে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। বছরে কলা বিক্রি করে তিনি দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় করেন।
তবে রোয়াংছড়ি উপজেলার কলাচাষী শৈটিং প্রু অভিযোগ করে বলেন, কলার ভালো ফলনের পরও দাম পাচ্ছেনা তারা। বাজারে কলা জোড়া বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৬ টাকায়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা চাষীদের কাছ থেকে কলার প্রতিটি ছড়া কিনে নেয় ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। বান্দরবানে কলা’সহ উৎপাদিত ফল প্রক্রিয়াজাত করণ এবং সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মধ্যেস্বত্ত ভোগীরা মুনাফা লুফে নিচ্ছে। চাষীরা বঞ্চিত হচ্ছে।
কলা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ গনি, মো: সিরাজ বলেন, এ অঞ্চলে ব্যাপকহারে কলার উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু তারপরও বাজারে কলার দাম অনেক বেশি, কথাটি মিথ্যা নয়। কারণ হিসাবে তাদের দাবি হাট থেকে বাইরের ব্যবসায়ীরা শতশত ছড়া কিনে ট্রাকে করে চট্টগ্রাম’সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী দোকানদার’রা চাইলেও কয়েকটি কলার ছড়া কিনতে পারছেনা। চাহিদা অনুযায়ী খুচরা কয়েকটি কলার ছড়া কিনতে গেলে দাম বেশি পড়ে যায়। যে কারণে বাজারে ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে জোড়া ১২ থেকে ১৬ টাকায় বিক্রি করতে হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মাসুদ পারভেজ চৌধুরী বলেন, এ অঞ্চলের মাটি এবং আবাহাওয়া কলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। অনেক জাতের কলা হলেও বান্দরবানে মূলত বাংলা এবং চাপা কলার উৎপাদন সবচেয়ে বেশি। দুটি জাতের মধ্যে বাংলা কলা’র পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। এছাড়া কলার জাতটি দীর্ঘদিন ঠেকসই থাকে। দ্রুত নষ্ট হয়না। লাভজনক হওয়ায় কলা চাষের দিকে যুগছে চাষীরাও।

x