চালের মূল্য বৃদ্ধি রোধে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে

শুক্রবার , ১১ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৭ পূর্বাহ্ণ
50

নির্বাচনের আগে সারাদেশে চালের দাম বাড়তে থাকে। পরিবহন সংকটের কথা বলে সে সময় চালের দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। মূল্য বৃদ্ধির এ ধারা এখনো অব্যাহত আছে। মিলমালিকরাও চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরা বাজারে। ১০ দিনের ব্যবধানে মিল পর্যায়ে চালের দাম বেড়েছে বস্তায় (৫০ কেজি) ২১০-২৫০ টাকা বা মণ প্রতি ১৫৮-১৮৭ টাকা। মিল পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে আরো কিছুটা সময় লাগবে। তারপরও এরই মধ্যে পাইকারিতে ৫০ কেজি প্রতি বস্তা চালের দাম ১২০-১৪৫ বা মণ প্রতি ৯০-১১০ টাকা বেড়েছে। আর খুচরা পর্যায়ে ৪ টাকা পর্যন্ত। মূল্য বৃদ্ধির কারণ হিসেবে এতদিন লোকসানে চাল বিক্রির কথা বলছেন মিল মালিকরা। মিল পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। সরকারিভাবে চাল সংগ্রহকে আর একটি কারণ হিসেবে দেখছেন তারা। দৈনিক আজাদীসহ দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় এ খবর পাওয়া যাচ্ছে।
খবরে আরো বলা হয়, চট্টগ্রামে দিন দশেকের ব্যবধানে পাইকারিতে চালের দাম বেড়েছে বস্তা প্রতি (৫০ কেজি) ১০০-১৪৭ টাকা পর্যন্ত। দেশে ভোগ্য পণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের চাক্তাই এলাকার বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দিন ১০/১২ আগে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা মিনিকেট চালের দাম ছিল ১ হাজার ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা। একই চাল তার তিন চার দিন পরেই বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ২৩ টাকায়। এ হিসেবে মিল পর্যায়ে প্রতি বস্তা মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ২৪০ টাকা। সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের চাক্তাই এলাকার অটো রাইস মিলের স্বত্বাধিকারী শান্তি দাশগুপ্তের কাছে মূল্য বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে প্রতিটি ট্রাকের ভাড়া ১০-১২ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে ছিল। এ কারণে চালের দাম বাড়তি ছিল। এছাড়া কয়েক মাস ধরে বস্তা প্রতি ৩০০-৪০০ টাকা লোকসানে থাকায় ব্যবসায়ীরা এখন বাড়তি দামেই চাল বিক্রি করছেন। সরকারের চাল সংগ্রহ কর্মসূচি শেষ হলে চালের বাজার আবার স্থিতিশীল হবে।
চালের আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা নির্বাচনকে ইস্যু করে হঠাৎ করে চালের দাম বাড়ার কোন যৌক্তিকতা আমরা কিন্তু দেখছি না। এবারে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন যেমন হয়েছে তেমনি যথেষ্ট চাল আমদানিও করা হয়েছে। এমনতর অবস্থায় চালের মূল্য বৃদ্ধির কোন কারণ থাকতে পারে কিনা তা একটা বড় প্রশ্ন। ব্যবসায়ীরা নির্বাচনের জন্য চালের সরবরাহে বিঘ্ন ও পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির কথা বলা একটি খোঁড়া যুক্তি মাত্র। কোন যুক্তিই শেষ পর্যন্ত টিকছে না বিশ্লেষকদের কাছে। তাঁরা বলছেন, অতি মুনাফা লাভের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নির্বাচনের সময়কে ব্যবহার করছেন কিছু সুযোগ সন্ধানী ব্যবসায়ী। আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, নতুন বছরে চালের দাম আরো বাড়তে পারে। চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়াটার কারণেই বাড়ছে তা সংশ্লিষ্টদের ভাবতে হবে এবং যথোচিত পদক্ষেপ নিতে হবে এই মূল্য বৃদ্ধি রোধে। দুই দফা হাত বদলেই প্রতি কেজিতে চালের দাম বাড়ছে ৮-১২ টাকা।
এর মধ্যে মোকাম থেকে পাইকারি বাজারে গিয়ে প্রতি কেজি চালের দাম গড়ে বেড়ে যাচ্ছে ২-৪ টাকা। হাতবদলের কারণে চালের দাম সবচেয়ে বেশি বাড়ছে পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে। ফলে ধানের বাম্পার ফলন এবং চালের পর্যাপ্ত মজুদেও ভোক্তা পর্যায়ে এর সুফল মিলছে না। শঙ্কার বিষয় হলো, এশিয়ার বাজারে রফতানিযোগ্য চালের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। মূলত ফিলিপাইনসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে বাড়তি চাহিদা ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের চালের বাজারকে চাঙ্গা করেছে। তবে এ সময় ভারতের বাজারে রফতানিযোগ্য চালের দাম আগের তুলনায় কমেছে। বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ চাল রফতানিকারক দেশ ভিয়েতনামেও চালের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে হারিকেন মাংখুটের তাণ্ডবে ফসলহানি হওয়ায় ফিলিপাইনও চাল আমদানির ঘোষণা দিয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের সরকারকে চাল ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা দেখাতে হবে। ২০১৭ ও ২০১৮ সাল থেকে শিক্ষা নিয়ে চালের উৎপাদন, মজুদ ও চাহিদা সংক্রান্ত তথ্য যথাযথ বিশ্লেষণপূর্বক আগাম ব্যবস্থা নেওয়া অত্যাবশ্যক। খাদ্য ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা, অদূরদর্শিতা ও মহল বিশেষের দুরভিসন্ধিমূলক তৎপরতাও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন হলে, সরকারি গুদামে যথেষ্ট মজুদ থাকলে এবং বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি হলে অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে এর দাম বাড়ার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশে উল্টো ঘটনা ঘটছে। পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়ে গেছে। এটা চাল ব্যবসায়ী ও চাল কল মালিকদের সংঘবদ্ধ কারসাজি। চালের বাজারে সরকারের কার্যকর নজরদারি থাকলে এটা হয় না, হতে পারে না শুল্কমুক্ত উপায়ে আমদানি করে মজুদ রাখা লাখ লাখ টন চালের দাম আমদানিকারক বাড়িয়ে দিচ্ছেন কোন কারণ ছাড়াই। অথচ মূল্য বৃদ্ধির কোন সুফল কৃষক পাচ্ছেন না। ধান চলে গেছে মধ্যস্বত্বভোগী ও মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রণে।
চালের বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য ও দায়িত্ব। এই কর্তব্য দায়িত্ব পালন করতে সরকারকে চালের বাজার নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা, অতি মুনাফা লোভী ব্যবসায়ীদের কারসাজি বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের গতি প্রকৃতির দিকে নিয়মিত নজর রাখা একান্ত প্রয়োজন। চালের দাম বাড়লে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের কষ্ট বাড়ে। এরাই তো সমাজের তথা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি মানুষকে দারিদ্র্য সীমার নিচে নিয়ে যায়। কারণ, দারিদ্র্যসীমার নিচে কিংবা দারিদ্র্য সীমার সামান্য উপরে থাকা মানুষের আয়ের ৮০ শতাংশই ব্যয় হয় চাল কেনায়। তাই, খাদ্য ঘাটতি এড়াতে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে।এজন্য সরকারকে চালের মজুদ গড়ে তুলতে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সাথে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে কৃত্রিম সৃষ্টি করে চালের মূল্য বৃদ্ধি করতে না পারে তার জন্যও তদারক ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

x