চার যুক্তিতে খালেদার জামিন

কুমিল্লার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ, এখনই মুক্তি পাচ্ছেন না

ঢাকা ব্যুরো

মঙ্গলবার , ১৩ মার্চ, ২০১৮ at ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ
492

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজায় কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হাই কোর্ট থেকে চারটি যুক্তিতে চার মাসের জামিন পেয়েছেন। তবে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলে জামিন পেয়েও তিনি মুক্তি পাবেন না।

এদিকে গতকাল সোমবার কুমিল্লায় নাশকতা মামলায় খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশসহ মামলার পরবর্তী তারিখে তাকে আদালতে হাজির রাখতে নির্দেশ (পি ডব্লিউ) দিয়েছেন কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুস্তাইন বিল্লাহ। মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী ২৮ মার্চ। অপরদিকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা আজ মঙ্গলবার জামিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। নতুন করে আবেদন করে জামিন নিতে হবে। এসব কারণে তার মুক্তির বিষয়ে শঙ্কা রয়েই গেল। নিম্ন আদালত থেকে মামলার নথি আসার পর তা দেখে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাই কোর্ট বেঞ্চ গতকাল খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন। কারাগারে যাওয়ার ৩২ দিনের মাথায় জামিন পেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। অন্য কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো না হলে তিনি শীঘ্রই মুক্তি পাবেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে এ মামলার রায়ের পর থেকে তাকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ শুনানিতে জামিনের বিরোধিতা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আপিল শুনানি শুরুর আদেশ চাইলেও হাই কোর্ট জামিন মঞ্জুর করেছে চারটি যুক্তিতে। ১. নিম্ন আদালত পাঁচ বছরের যে সাজা দিয়েছে, তুলনামূলকভাবে কম ওই সাজায় হাই কোর্টে জামিনের রেওয়াজ আছে। ২. বিচারিক আদালতের নথি এসেছে, কিন্তু আপিল শুনানির জন্য এখনো প্রস্তুত হয়নি। ফলে আসামি জামিনের সুবিধা পেতে পারেন। ৩. বিচারিক আদালতে মামলা চলাকালে খালেদা জিয়া জামিনে ছিলেন এবং এর অপব্যবহার করেননি। আদালতে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন। ৪. বয়স এবং বয়সজনিত শারীরিক অসুস্থতা বিবেচনায় নিয়ে তাকে জামিন দেওয়া যায়।

এসব যুক্তিতে খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দিয়ে হাই কোর্ট বলেছেন, এই সময়ের মধ্যে আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরি করতে হবে। পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে গেলে যে কোনো পক্ষ শুনানির জন্য আপিল উপস্থাপন করতে পারবে।

জামিনের এই আদেশে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী আবদুর রেজাক খান। তিনি বলেন, বিচারিক নিয়মে জামিন হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট।

এর আগে বেলা সোয়া ২টার দিকে বিচারক আদালত কক্ষে আসেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের কাছে জানতে চান, তাদের কিছু বলার আছে কি না। তখন তিনি বলেন, জামিন আবেদনের শুনানি তো শেষ হয়েছে। আমরা আদেশের জন্য অপেক্ষা করছি।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, এ মামলাটি স্পর্শকাতর। বিচারিক আদালত খালেদা জিয়ার বয়স ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাকে ৫ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এদিকে খালেদার জামিনের প্রতিক্রিয়ায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, বিচার বিভাগ যে স্বাধীনভাবে কাজ করছে, এটা তারই প্রমাণ। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না বলে বিএনপির বহু দিনের অভিযোগ। তাদের নেত্রীকেও ‘গায়ের জোরে’ সাজা দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপি নেতাদের দাবি।

খালেদার জামিনের আদেশের পর আইনমন্ত্রী সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি নেতারা সারা দেশে বলে বেড়াচ্ছিলেন, আমরা নাকি আদালতে ইন্টারফেয়ার (হস্তক্ষেপ) করছি বলে বেইলটা (জামিন) হচ্ছে না। আজকে প্রমাণিত হলো, বিচার বিভাগ যে স্বাধীন এবং বিচার কাজে যে সরকার হস্তক্ষেপ করে না। জামিনের আদেশ হলেও তা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত খালেদা জিয়া মুক্ত হচ্ছেন না বলে স্পষ্ট করেন আইনমন্ত্রী।

খালেদার জামিনের আদেশের পর সরকারের পদক্ষেপ কী হবে, সাংবাদিকরা জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, এটা দুর্নীতি দমন কমিশনের বিষয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) খালেদা জিয়ার হাই কোর্টের জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল করবে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান। তিনি বলেন, হাই কোর্টের এ আদেশ স্থগিত চেয়ে চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করা হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, মঙ্গলবারই (আজ) জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল করা হবে।

অবশ্য রায় ঘোষণার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, বিএনপির চেয়ারপারসনের জামিনে মুক্তি পেতে বাধা নেই। কেননা তাকে কোনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের আদেশ দুদিনের জন্য স্থগিত চেয়েছিলেন। কিন্তু সেটি আদালত বিবেচনায় নেননি।

এদিকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেছেন, অন্য মামলায় গ্রেপ্তার না দেখালে খালেদা জিয়ার মুক্তি পেতে আর কোনো বাধা নেই।

উল্লেখ্য, গত ২০ ফেব্রুয়ারি সাজার রায় হওয়ার পর জামিন চেয়ে আপিল করেন খালেদা জিয়া। জামিন আবেদনের শুনানির পর ন্নি আদালতের নথি এলে আদেশ দেবেন বলে জানান হাই কোর্ট। গতকাল দুপুরে ওই বেঞ্চে ৫ হাজার ৩২৮ পৃষ্ঠার নথি পৌঁছায়।

সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। একই সঙ্গে তার ছেলে তারেক রহমানসহ মামলার অপর পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। চার আসামি হলেন সাবেক মুখ্যসচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সাংসদ ও ব্যবসায়ী কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমান। এর মধ্যে পলাতক আছেন তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান।

কুমিল্লার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ

কুমিল্লায় নাশকতার মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাইন বিল্লাহ এ আদেশ দেন।

কুমিল্লার মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে গুলশান থানার পুলিশ এসে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে। সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক তা মঞ্জুর করে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

আদালত পরিদর্শক বলেন, সে আদেশ এরই মধ্যে কুমিল্লার কেন্দ্রীয় কারাগারে দেওয়া হয়েছে। কুমিল্লার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তা ঢাকার কারাগারে পাঠানো হবে। সেখানে কারা কর্তৃপক্ষ আদালতের আদেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ডাকা অবরোধ চলাকালে ওই দিন রাত সাড়ে ৩টায় ঢাকাচট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগমোহনপুরে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি বাসে দুর্বৃত্তরা পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। মুহূর্তের মধ্যে বাসটিতে আগুন ধরে যায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। সে সময় বাসের কয়েক যাত্রী জানালা দিয়ে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচতে পারলেও দগ্ধ হন অন্তত ২০ যাত্রী। তাদের মধ্যে আটজন নিহত হন।

এ ঘটনায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, প্রয়াত এম কে আনোয়ার, ভাইস চেয়ারম্যান শওকত মাহমুদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, সালাউদ্দিন আহমেদ এবং মামলার প্রধান আসামি জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরসহ ৭৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। পরবর্তী সময়ে সে মামলার অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেন আদালত।

x