চার দিনের ব্যবধান

কলম থেকে অশ্রু ঝরে - ৮

রেফায়েত ইবনে আমিন

মঙ্গলবার , ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
67

আমার হাতে আর কিছুই করার নাই। আম্মার বিছানার পাশে বসে বসে দোয়াদরুদসুরা পড়া শুরু করলাম। আম্মার মুখেহাতেগায়ে হাত বুলিয়ে দিতে

থাকলাম। জানি না, আমার স্পর্শ ওনার কোন ব্যথাকষ্ট লাঘব করছে কিনা; কিন্তু এইটুকু বলতে পারি যে ওনার স্পর্শ আমার জন্য স্বর্গীয়।

১২ জানুয়ারি, ২০১৭, বৃহস্পতিবার। আর মাত্র চারদিন। মাত্র চারদিন পরে, ১৬ জানুয়ারিতে আমাদের আম্মা একাশি বছরে পড়বেন। কিন্তু, আল্লাহ্‌র হুকুম মনে হয়, চারদিনের সেই ব্যবধান চিরকালের জন্যই রয়ে যাবে।

আমি সকালে একটু কিছু মুখে গুঁজে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে পড়েছি, ডাউনটাউনে সোশাল সিকিউরিটি অফিসে যাবো বলে। গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে আছি, আর আমার চোখ দিয়ে অনর্গল পানি ঝরছে। বাইরেও একই অবস্থা, অঝোর ধারায় বৃষ্টির হচ্ছে তো হচ্ছেই। এটা একটু বেশ ব্যতিক্রমী ব্যাপার। জানুয়ারি মাসে আমাদের শহর টলিডোতে বরফ আর তুষারপাতই হওয়ার কথা, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, মনে হচ্ছে প্রকৃতিও আমাদের মতই, আম্মার জন্য কাঁদছে, কেঁদেই চলেছে। তাই, আজ বরফের বদলে শুধু অঝোরে বৃষ্টিই হচ্ছে। আমার কান্নায় আমার বুক ভেসে যাচ্ছে, আর আকাশের কান্নায় পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে।

সোশাল সিকিউরিটি অফিসের মহিলাকে বললাম, আমার বয়স্কা আম্মার ইমিগ্রেশানের আবেদন মঞ্জুর হয়েছে, আমরা চিঠি পেয়েছি। এখন আমি ওনার ছেলে হিসাবে সোশাল সিকিউরিটির জন্য ফর্ম ফিলআপ করতে পারি কিনা। বাংলাদেশে ন্যাশানাল আইডি যে রকম, এখানে সোশাল সিকিউরিটি নাম্বারও সেরকম প্রায়। কাউন্টারের মহিলা বললো, ফর্ম আমি ফিলআপ করলেও, আম্মার স্বাক্ষর লাগবে। আমি বললাম, আম্মা তো হাসপাতালে, গুরুতর অসুস্থ। ডাক্তাররা কড়া ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে, লাইফসাপোর্টের উপর। সে সহানুভূতিসমবেদনা জানিয়ে, আম্মার দ্রুত রোগমুক্তি কামনা করল। আর বলল, উনি সুস্থ হলে তারপরে স্বাক্ষর করে দিবেন। তখন আমি তাকে আর একটু খুলে বললাম উনি তো আর কোনদিন সুস্থ হবেন না। আজই বিকাল চারটার সময় আমরা ওনার লাইফসাপোর্ট মেশিনগুলো তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এবারে, সেই মহিলা ফ্যালফ্যাল করে আমার মুখের দিকে বোবার মত তাকিয়ে থাকলো অনেকক্ষণ। তার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হতে পারছিলো না। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করতে থাকলো। উল্টা আমিই তাকে বলতে থাকলাম ইট্‌স্‌ অলরাইট ম্যাডাম, ইট্‌স্‌ ওকে। কিছুক্ষণ পরে সে আমাকে ধরা ধরা গলায় জানালো, তাহলে এখন আর আমাদের কিছুই করার নাই। এ সমস্ত ক্ষেত্রে, ফুনারেল হোম থেকেই সব ব্যবস্থা করে দিবে। পরিবারের কাউকে এখন আর কোন কষ্ট করতে হবে না। লাইফসাপোর্ট তুলে নেওয়ার পরে, আম্মা যখন আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, তারপর থেকে অফিশিয়াল সমস্ত কাজগুলোই করবে ফুনারেল হোম। আমি তাকে কৃতজ্ঞাভরে ধন্যবাদ জানিয়ে সেখান থেকে সোজা হাসপাতালে চলে এলাম।

গতকাল, দেশে বড় ভাই এবং মেজভাবী দুইজনের সঙ্গে কথা বলার সময়ে বলেছিলাম, ওনারা তো আম্মাকে দেখতে পাচ্ছে না। এরপরে তো সব শেষ হয়ে যাবে। তাই আজকে স্কাইপ বা ভাইবারের মাধ্যমে হাসপাতাল থেকে সরাসরি ওনাদেরকে আম্মার সবকিছুই দেখাতে পারবো। এই হাসপাতালে খুবই ভালো ওয়াইফাই আছে। আগেই করতে পারতাম, কিন্তু তখন চাই নাই যে দূর থেকে আম্মাকে দেখে ওনারা হয়তো ভেঙ্গে পড়বেন। কিন্তু এখন তো আর সময় নাই। আজই তো সব শেষ হয়ে যাবে। সেই প্ল্যানে, আজ সকালে আমি বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ে সঙ্গে আইপ্যাড নিয়ে এসেছিলাম। বড় ভাইভাবী দুজন চট্টগ্রামে; এবং মেজভাবীভাইজিভাইপো বৌ তিনজন ঢাকাতে অপেক্ষা করছিলেন। আমি একে একে দুই জায়গাতেই যোগাযোগ করে ভিডিওতে ওনাদেরকে আম্মাকে দেখালাম। কাছের থেকে, দূরের থেকে, সারা রুমের সব মেশিনমনিটর, যন্ত্রপাতি সবকিছুই দেখালাম। বড়ভাই আর মেজভাবী, দুজনেই ডাক্তার, তাই ওনারা সবকিছু দেখলেন, বুঝলেন। কিন্তু আমাদের কারো হাতেই কিছুই করার নাই। ওনারা সবাই চোখের পানি ফেলতে ফেলতে, দূর থেকে আম্মাকে দেখলেন আর দোওয়া করলেন। কষ্ট লাগলো ওনাদের জন্য, আম্মা আজীবন দেশে ওনাদের মাঝে কাটালেন; অথচ এখন এই শেষ মুহূর্তে আল্লাহ্‌ আম্মাকে টলিডোতে রেখে দিলেন। দেশে তখন সন্ধ্যা শেষ হয়ে রাত হতে চলেছে। আর আমাদের বিকাল চারটা মানে দেশে ভোররাত দুইটা হবে। কিন্তু ওনারা জানালেন যে, ওনারা আম্মার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জেগেই থাকবেন। কীভাবে ওনারা ঘুমাতে যাবেন?

এখন আমার হাতে আর কিছুই করার নাই। আম্মার বিছানার পাশে বসে বসে দোওয়াদরুদসুরা পড়া শুরু করলাম। আম্মার মুখেহাতেগায়ে হাত বুলিয়ে দিতে থাকলাম। জানি না, আমার স্পর্শ ওনার কোন ব্যথাকষ্ট লাঘব করছে কিনা; কিন্তু এইটুকু বলতে পারি যে ওনার স্পর্শ আমার জন্য স্বর্গীয়। শেষবারের মত সেই স্পর্শ নিতে চাইলাম প্রাণ ভরে। আর কিছু পরে তো আমার জীবনের জান্নাতের একটা দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। আল্লাহ্‌র কাছে মাফ চাইলাম। আম্মার কাছেও মাফ চাইলাম। এই জীবনে আম্মাকে কত কষ্ট দিয়েছি, কতদিন কথা শুনিনাই, কত অবাধ্য হয়েছি, সেগুলোর কথা মনে পড়ে যেতে থাকলো। অনেক অনেক করে মাফ চাইলাম, আমার কৃতকর্মের জন্য। ইসলাম ধর্মমতে, আল্লাহ্‌র পরে কাউকে যদি ইবাদত করতে হতো, তাহলে তা হতো নিজের পিতামাতাকে। এবং পিতামাতার মাঝেও উত্তম হলেন, মা। আমাদের সেই মা আর কিছু পরে থাকবেন না আমাদের মাঝে।

আমার মনের মাঝে আম্মার জীবন ভেসে ভেসে চলতে থাকলো। আম্মার মুখ থেকে যেগুলো শুনেছি বা ওনার লেখায় পড়েছি, ওনার জীবনের সেই ঘটনাগুলো কল্পনা করতে থাকলাম। আবার, যেগুলোতে আমি প্রত্যক্ষভাবে ছিলাম, আমার নিজের জীবনে আম্মাকে জড়িয়ে সেগুলোও কল্পনা করলাম। সেই ছোটবেলা থেকে আমার সারা জীবন। কীভাবে উনি আমাদের ছয়ভাইকে বড় করে তুলেছিলেন। চোখের সামনে অদৃশ্য পর্দার মাঝে ভাসমান অবস্থায় কত কত ঘটনা ঘটে যেতে থাকলো। চিন্তা করলাম, খুলনার পায়গামকস্‌বা গ্রামে জন্ম, বগুড়ারাজশাহীকলকাতাচট্টগ্রামে বড় হলেন। বিয়ের পর থেকেই অল্প কিছুদিন করাচীকুমিল্লায় কাটিয়ে চট্টগ্রামেই চিরস্থায়ী হয়েছিলেন। কিন্তু, আজ সে সমস্ত জায়গা কত দূরে পড়ে আছে। উনি হাজার হাজার মাইল দূরের এই টলিডো শহরের হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন, আমরা শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা করছি এখন।

একটু পরপর, নার্সডাক্তার এসে আম্মাকে দেখে যাচ্ছে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরে ওনার লাইফসাপোর্ট খুলে দেওয়া হবে, এটা সকলেই জানে; কিন্তু তারপরেও সেবাযত্নের কোনো ত্রুটি নাই, কোনো কমতি নাই। সবকিছুই এমনভাবে চালিয়ে যাচ্ছে যেন উনি একজন সাধারন রোগী। সময় ধরে ঠিকই সব ওষুধ দিচ্ছে, স্যালাইনের ব্যাগ বদল করে দিচ্ছে, নিউট্রিশানের ব্যাগ ভরে দিচ্ছে, বাথরুমের ব্যাগ পরিষ্কার করে দিচ্ছে। দুই জনে ধরে পাশ ফিরিয়ে দিচ্ছে, যাতে বেডসোর না হয়। মানুষকে ডিগনিটি দিতে জানে এরা, জীবনকে সম্মান করে এরা। আমাকে প্রস্তুত করার জন্য, তারা জানালো, কীভাবে কি হবে। প্রথমে তারা খাবার ও নিউট্রিশান বন্ধ করে দিবে, তারপরে মরফিন দিবে ব্যথা বেদনা কমানোর জন্য। সবশেষে, আম্মার ভেন্টিলেটার মেশিন, যেইটা দিয়ে আম্মা শ্বাসপ্রশ্বাস নিচ্ছিলেন, সেটা বন্ধ করে দিবে। তখন, আম্মা হয়তো নিজে নিজেই শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন; কিন্তু যেহেতু ব্রেন কোন সিগনাল দিতে পারবে না, তাই ফুস্‌ফুস কাজ করবে না, হার্ট রক্ত পাম্প করবে না; এবং আস্তে আস্তে আম্মার শরীরের সবকিছু ফাংশান বন্ধ হয়ে আসবে।

হাসপাতালে তো শুধু ডাক্তারনার্স না, আডমিনিস্ট্রেশান ডিপার্টমেন্ট আছে, সোশাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট আছে, আরো অনেক কিছুই আছে। সবাই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলো, আম্মার এবং আম্মার পরিবারের দেখভালএর দায়িত্ব তাদের সকলের উপর। আমি সবকিছু বুঝে শুনে পারমিশান দিয়েছি কিনা? আমাদের নিজেদের জন্য মোরাল সাপোর্ট লাগবে কিনা, গ্রীফকাউন্সেলর লাগবে কিনা সব খোঁজখবর রাখছে। ফুনারেল হোম ঠিক করেছি কিনা জেনে নিলো। আমি তাদেরকে জানালাম কোন হোমের সঙ্গে ব্যবস্থা করেছি। হাসপাতাল থেকে জানালো, আমাকে আর কিছুই চিন্তা করতে হবে না। তারাই সময়মত ফুনারেল হোমকে খবর দিবে। আমার মাথা থেকে আরো একটা বোঝা কমিয়ে দিলো।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে থাকলো। ধীরে ধীরে সকল আত্মীয়স্বজন, টলিডোর বাংলাদেশিরা, মসজিদের পরিচিত লোকেরা আসা শুরু করলেন। সকলেই আজ আমাদের পাশে থাকবেন। অনেকেই অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে বা অর্ধেক দিন কাজ করে চলে এসেছে। দুপুরের একটু পরে ডাক্তার ভাই পরিবারসহ সেইন্ট লুই থেকে এসে পৌঁছালেন। গতকাল থেকে তো সেজ ভাইভাবী, ছোটমামা, . রনি সাদায়েন, এবং মালেকা খালা ছিলেন। ভাইঝি দিশামনি ও তার জামাই ওসমানীও এসেছে মিলওয়াকি থেকে। ভাইপো রাহীন মাত্র কয়েকদিন হলো টলিডো শহরেই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং চাকরী শুরু করেছে; কিন্তু তার বস্‌ তাকে বলে দিয়েছে, সে যাতে অফিসে যাওয়ার ব্যাপারে কোন দুশ্চিন্তা না করে। রাহীনকে পাঠালাম, আরাফার স্কুল শেষ হলেই তাকে তুলে নিয়ে সোজা হাসপাতালে চলে আসবে। সুলতান আহ্‌মেদ ভাই আর লুবনাকে রিকোয়েস্ট করারও দরকার হয়নি; ওনারা নিজের থেকেই দুইঘণ্টা, দুইঘন্টা ড্রাইভ করে গেলেন কলম্বাস থেকে ঝোরাকে নিয়ে আসতে।

আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য যে কত বড় সহায়, সেটা সবসময়ই তো বুঝতে পারি, কিন্তু সেদিন আরো বেশি করে অনুধাবন করলাম। সব কাজ সুন্দর করে হয়ে যেতে লাগলো। হাসপাতাল থেকে শেষবারের মত আমাকে আর একবার জিজ্ঞেস করে নিলো, আমি কি আমার সিদ্ধান্ত পাল্টাবো? নাকি, আগের সিদ্ধান্তমত আজকেই আম্মার লাইফসাপোর্ট বন্ধ করে দিবে আমি সম্মতি জানালাম। আল্লাহ্‌র হাতেই সব ক্ষমতা। উনিই আম্মাকে শেষমেশ টলিডোতে নিয়ে আসলেন, এখানেই আম্মার মাটি নির্ধারিত ছিলো। আল্লাহ্‌ই আম্মার জন্য নির্ধারিত করে রেখেছিলেন চারদিন কম একাশি বছর। কেউ সেটাকে খণ্ডাতে পারবে না।

টলিডো, ওহাইও, ২০১৭

x