চারিদিকে ভাঙনের শব্দ

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ
17

কী রাষ্ট্রীয় কী সামাজিক কী পারিবারিক সর্বত্রই একটা অস্থিরতা। বাংলাদেশে ধনীর সংখ্যা বাড়ছে, জিডিপির হার বাড়ছে। গর্ব করার মত অনেক সূচক হয়তো আমাদের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। তারপরেও চারিদিকে ভাঙনের সুর হারানোর ব্যথা আমাদের বুকের গহীনে অনুরণন তুলছে কি হারাচ্ছি? কোথায় হারাচ্ছি কেন হারাচ্ছি? হারাচ্ছি আমাদের মূল্যবোধ, হারাচ্ছি বিবেক, হারাচ্ছি ধৈর্য, হারাচ্ছি মানবিকতা, হারাচ্ছি পারস্পরিক সম্পর্ক, রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা থেকে শুরু করে সমাজ এবং পারিবারিক জীবনেও নেমে এসেছে সম্পর্কের ধস।

পারিবারিক জীবনে স্বামীস্ত্রীর সম্পর্ক থেকে শুরু করে সন্তান কিংবা মাবাবা, আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধব প্রতিটি সম্পর্কে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এসেছে। রাষ্ট্র ঠিকঠাক মতো না চললে এর প্রভাব সমাজের উপর পড়বে। পরিবারের উপরেও পড়বে। মানুষেমানুষে দূরত্ব বাড়ছে। মানুষের সাথে মানবিকতার দূরত্বটা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। ধৈর্য নামক এক বোধ ছিল মানুষের মধ্যে, সমাঝোতা নামক একটা বিবেচনা ছিল মানুষের। ভালবাসা মায়ামমতার একটা বন্ধন ছিল। মানুষের ভেতরে বিবেক নামক একটা বস্তু ছিল ন্যায়অন্যায় বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। সবকিছুই যেন ঘুণে পোকা খেয়ে ফেলছে।

আগস্টের শেষ দিকে তারিখটা মনে পড়ছে না প্রথম আলো বিবাহ বিচ্ছেদের উপর একটি প্রতিবেদন ছাপে। এই প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানে দেখা যায় সারা দেশে ৭ বছরে তালাকের প্রবণতা বেড়েছে ৩৪% শতাংশ। সবচেয়ে বেশি তালাক বরিশালে প্রতি হাজারে ২.৭৩ সবচেয়ে কম চট্টগ্রামে প্রতি হাজারে ০.৬ জন। শিক্ষিত স্বামীস্ত্রীর মধ্যে তালাক বেশি হচ্ছে।

গত বছর চট্টগ্রাম শহরে বিবাহ বিচ্ছেদ চেয়ে সিটি কর্পোরেশনের সালিশি আদালতে আবেদন করেন ৪ হাজার ৯৭০ জন। অর্থাৎ দিনে গড়ে ১৪টি সংসার ভাঙছে। আর এ বছরের জুলাই পর্যন্ত আবেদন জমা পড়েছে ২ হাজার ৫৩২টি। আবেদন করার পর সমঝোতার মাধ্যমে সংসার টিকে যায় এমন উদাহরণ খুবই কম। আবেদনকারীদের অধিকাংশই নারী উচ্চবিত্ত হোক আর নিম্নবিত্ত হোক সব আবেদনের ভাষা এক। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সালিশি আদালতে জমা দেওয়া বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় প্রধান কারণগুলো হচ্ছে যৌতুকের জন্য নির্যাতন, অন্য নারীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক বা দ্বিতীয় বিবাহ। মতের বনিবনা না হওয়া শাশুড়ির সাথে দ্বন্দ্ব বা স্বামীর মাদকাসক্তি ইত্যাদি। আর ছেলেদের আবেদনের প্রধান কারণগুলো হচ্ছে অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক, সংসার মানিয়ে না চলা, স্বামীর কথা না শোনা ইত্যাদি। ঢাকা শহরে তালাকের আবেদন বাড়ছে। গড়ে প্রতি ১ ঘণ্টায় একটি করে তালাকের আবেদন জমা পড়ছে। আপস হচ্ছে ৫ শতাংশেরও কম। মজার ব্যাপার হচ্ছেঅনেকগুলো কারণের মধ্যে ফেসবুকও একটি কারণ।

প্রথম আলোর এই সমীক্ষায় আমাদের বর্তমান সমাজের অস্থিরতার চিত্রই উঠে এসেছে। নারীপুরুষের মিলিত স্বপ্নে একটি সংসার নির্মিত হয়। আজীবন এক সাথে থাকার প্রতিজ্ঞা বিবাহিত জীবনের শুরু হয়। বিভিন্ন কারণে মোহটা কেটে গেলে দু’জনের দোষগুলো সামনে চলে আসে। কেউ কেউ সমাজ ও পরিবারের কথা ভেবে আপ্রাণ চেষ্টা করে মানিয়ে নেওয়ার। বেশিরকভাগ ক্ষেত্রে ধৈর্যহীন হওয়ায় সংসার টিকে না।

প্রযুক্তির বিভিন্ন শাখাপ্রশাখাগুলোতে আমাদের বিরামহীন ব্যস্ততায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সম্পর্কগুলো। এই পরিসংখ্যান আমাদের কাছে আরো একটি ব্যাপার জানান দিচ্ছে আমাদের সমাজ ও আমাদের ধ্যানধারণায় বিরাট একটা পরিবর্তন আসছে। পশ্চিমা গান শুধু নয় পশ্চিমা জীবনও আস্তে আস্তে আমাদের মনন মগজে ঠাঁই করে নিচ্ছে। বর্তমানে অনেক নারী বাইরে কাজ করছেন। চিরাচরিত পুরুষের প্রভুত্ব এবং ঘরে বাইরে কাজের চাপ সইতে এক পর্যায়ে হাঁপিয়ে উঠছে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও নারীদের তালাকের সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হচ্ছে। যে কারণেই তালাকের সংখ্যা বাড়ুক তা সন্তানদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাবামায়ের মধ্যে তালাক হলে সন্তানেরা অস্থিরতার মধ্যে বড় হয় তার প্রভাব সারাজীবন তাকে বইতে হয়। এতে সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

x