চামড়া শিল্পে শিশু শ্রম বন্ধে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা চাই

শুক্রবার , ৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ৮:৩৩ পূর্বাহ্ণ
24

বাংলাদেশের চামড়া শিল্পে শিশুশ্রমের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। গত ২৩ অক্টোবর চামড়া খাত সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে এ কথা জানিয়েছে ৩০০ বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জোট ইন্টারফেইথ সেন্টার অন কর্পোরেট রেসপনসিবিলিটি (আইসিসিআর)। চিঠিটির অনুলিপি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়ের চিফ ইনোভেশন অফিসার, শিল্পমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিব এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান বরাবরেও পাঠানো হয়েছে। পত্রিকান্তরে গত ২৭ অক্টোবর এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরের বিবরণে বলা হয়, চিঠির শুরুতেই বলা হয়েছে, গত এক বছর বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে চামড়ার যোগানদাতাদের সম্পৃক্ত করে সাপ্লাই চেইন চর্চার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছে। এসব বিষয়ের মধ্যে শিশু শ্রম থেকে শুরু করে শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং পরিবেশগত প্রভাবও অন্তর্ভুক্ত। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শ্রমিক ও পরিবেশের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে ট্যানারি স্থানান্তরের সময়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য কঠিন সময়। বাংলাদেশে ১৮ বছরের কম বয়সি কোন শ্রমিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও চামড়া শিল্পে প্রায়ই অপ্রাপ্ত বয়স্কদের সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের মাঝে উদ্বেগ তৈরি করেছে- এমন মত জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা ট্যানারি পরিদর্শনের মাধ্যমে শিশু শ্রম শনাক্ত করে তাদের বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। পাশাপাশি ট্যানারির শিশু শ্রমিক যেন অন্য কোন শিল্পে অবৈধভাবে ব্যবহার করা না হয়, তাও নিশ্চিত তাগিদ জানাচ্ছি। চামড়া শিল্প নগরী স্থানান্তরের পর পরিবার নিয়ে জীবনযাপনকারী প্রাপ্ত বয়স্ক শ্রমিকদের আবাসিক নির্মাণের বিষয়েও বাংলাদেশ সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
দেশের দ্বিতীয় সম্ভাবনাময় রফতানিমুখী শিল্প চামড়া। এক্ষেত্রে তৈরি পোশাক শিল্প প্রথম। তারপরেই স্থান চামড়া শিল্পের। এ কারণে চামড়া শিল্পকে গত বছর (২০১৭) প্রডাক্ট অব দি ইয়ার ঘোষণা করা হয়েছিল। অধিকতর অগ্রগতি নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে চামড়া শিল্প নগরী হাজারিবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই শিল্পের জন্য খসড়া রফতানি রোডম্যাপও প্রণয়ন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে সরকারি ভর্তুকি। বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুবিধার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাদের চামড়া শিল্পের প্রতি আগের চেয়ে অধিকতর আগ্রহী হয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকার কারণে বিনিয়োগকারীরা চামড়া শিল্প খাতে পুরোপুরি আস্থাশীল হতে পারছেন না। আইসিসিআর দেশের চামড়া খাত সংশ্লিষ্ট সরককারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো উল্লিখিত চিঠিটাতেই এর প্রকাশ স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের চামড়া শিল্পে শিশু শ্রমের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উল্লিখিত বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কথা ওই চিঠিতেই উল্লেখিত হয়েছে। বিশেষ করে শিশু শ্রম নিয়ে তাঁদের ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আপেক্ষিকভাবে অধিক। আমাদের দেশে ১৮ বছর বয়সের কম বয়সী শ্রমিক নিয়োগ ও ব্যবহার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু চামড়া শিল্পে প্রায়শ ১৮ বছরের কম বয়সী শ্রমিক নিয়োগ করতে দেখা যায়। এ শিল্পে নিয়োজিত শিশুরা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির শিকার। শিশু শ্রম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল। স্বভাবত আইসিসিআর শিশু শ্রম সম্পর্কে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কাজেই বিষয়টি আমলে নিয়ে চামড়া শিল্প খাতে শিশু শ্রম বন্ধ করতে শ্রম মন্ত্রণালয়ে ত্বরিত হস্তক্ষেপ জরুরি। প্রধানত প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের চেয়ে তুলনামূলক কম মজুরি দেওয়া যায় বলে কারখানা মালিকেরা শিশু শ্রমিক নিয়োগ করে থাকে। এ প্রবণতা আইনসঙ্গত নয়। এ বেআইনি কাজ বন্ধ করা দরকার। দেখা যায়, চামড়া কারখানায় উৎপাদন কাজে ক্রোমিয়াস, লেড, আর্সেনিক, অ্যাসিড, রঙসহ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর উপকরণের মধ্যেই শিশু শ্রমিকদের কাজ করতে হচ্ছে। এতে শিশুরা সহজেই স্বাস্থ্যহানির শিকার হচ্ছে। যে বয়সে তাদের আনন্দময় শৈশব উপভোগ করার কথা, সে বয়সেই তারা ভুগছে স্বাস্থ্যগত নানা জটিলতায়। এটি ভবিষ্যৎ সুস্থ সবল জাতি গঠনের ক্ষেত্রে বিরাট প্রতিবন্ধক। তার চেয়েও বড় কথা, এ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে কাজ করা শিশুরা পরবর্তী সময়ে অকালে নিজেদের কর্মক্ষমতা হারাবে, পরিণত হবে রাষ্ট্রের বোঝায়। কাজেই চামড়া শিল্পে আর দেরি না করে শিশু শ্রম পুরোপুরি বন্ধ করতেই হবে।
লক্ষ্যণীয়, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় চামড়া শিল্প বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কাঙ্ক্ষিত সম্ভাবনার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, সেটি যথাযথভাবে কাজে লাগানো দরকার। তাই তাদের উদ্বেগের ক্ষেত্রগুলো, বিশেষ করে শিশু শ্রম বিষয়টিকে গভীরভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা চিঠির মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ট্যানারি পরিদর্শন করে। শিশু শ্রম শনাক্তপূর্বক তাদের বিকল্প সুবিধার পাশাপাশি ট্যানারির শিশু শ্রমিকদের অন্য কোন শিল্পে ব্যবহার করা না হয়, সরকারকে তা নিশ্চিত করতে তাগিদ দিয়েছে। শিশু শ্রম বন্ধ না হলে বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড়ে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়া শিল্পজাত পণ্যের সদর্প অন্তর্ভুক্তি কঠিন হবে। তাই এক্ষেত্রে ন্যূনতম শিথিলতা অনুচিত। এক্ষেত্রে কেবল সরকারকে উদ্যোগ নিলে চলবে না, একই সাথে দেশি উদ্যোক্তাদেরও সচেষ্ট হতে হবে। মাথায় রাখতে হবে শিশু শ্রম অমানবিক। এর সর্বতোভাবে অবসান জরুরি। একই সাথে পরিবেশ দূষণ, শ্রম কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন। আমরা চাই, সরকার ও চামড়া খাতের উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে চামড়া শিল্পে পুরোপুরিভাবে কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা হোক।

x