চাপ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত বিএনপি

মোরশেদ তালুকদার

খালেদার মামলার রায়

রবিবার , ২৮ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ
223

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ মামলার রায়ের তারিখ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিএনপির ওপর এক ধরনের ‘রাজনৈতিক চাপ’ সৃষ্টি করেছে সরকার। একইসঙ্গে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত রায়ে দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার ‘শাস্তি’ হলে এ চাপ আরো দ্বিগুণ হবে নিঃসন্দেহে। এ বিষয়ে বিএনপি নেতারাও একমত। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এ চাপ মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত বিএনপি? যদিও দলটির শীর্ষ নেতারা রাজনৈতিকভাবেই এ চাপ মোকাবিলার কথা বলছেন। তবে এই ক্ষেত্রে কোন পথে অগ্রসর হবে বা দলটির পরিকল্পনা কি সেটা স্পষ্ট করেন নি দলটির শীর্ষ নেতারা।

দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেছেন, গত রাতে অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে একটি রুপরেখাও তৈরি হয়েছে। মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে শাস্তি দেয়া হলে বিএনপি কি করবে তাও চূড়ান্ত হয়েছে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে। বৈঠকে গৃহীত রুপরেখা বাস্তবায়নের জন্য তৃণমূলের কাছে শীঘ্রই বার্তা পৌঁছে দেয়া হবে। আজ রোববার সকাল সাড়ে ১১টায় দলের সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, মামলার রায়ে খালেদা জিয়ার শাস্তি হলে বিষয়টিকে দুইভাবে মোকাবিলা করার প্রস্তাবনা আছে সিনিয়র নেতাদের। একপ চাচ্ছেন বড় ধরনের আন্দোলনকর্মসূচিতে না গিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা। অর্থাৎ আইনগত প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হওয়া এবং সর্বশেষ ধাপে আন্দোলন। তবে আরেকটি পক্ষ বলছে এখনই আন্দোলনে যাওয়ার। অর্থাৎ অতীতের ন্যায় হরতাল এবং অবরোধ কর্মসূচিতে ফিরে যাওয়া। অবশ্য এইক্ষেত্রেও আছে বাধা। কারণ, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে এসএসসি পরীক্ষা। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে হরতালঅবরোধের কর্মসূচি দিলে জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করবে।

বিএনপির নেতাকর্মীদের ভাষায় খালেদার রায় দলটির উপর সরকারের এক ধরনের ‘চাপ’ সৃষ্টির চেষ্টা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গতকাল সন্ধ্যায় দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আর কত চাপ দিবে। চাপ তো সারা বছরই আছে। এই আর এমন কি? যখন হবে (রায়) তখন আপনারাও দেখবেন, কি হয়। কিভাবে মোকাবিলা করি।’

বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন এবং নির্বাচন’ দুটো বিষয়ে প্রস্তুতির কথা বলে আসছিলেন আপনারা। এখন যদি আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির রায়ে দলীয় চেয়ারপার্সনের শাস্তি হয় সেক্ষেত্রে বিএনপির আন্দোলনমুখী হওয়ার সম্ভাবনা কতটুক?’ এমন প্রশ্নে গয়েশ্বর রায় বলেন, ‘আগাম বলার সুযোগ নেই। প্রয়োজন হলে আন্দোলন হবে।’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার রায়কে কিভাবে দেখছেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ভালোভাবে দেখছি না। অনৈতিকভাবে বিরোধী নেত্রীকে নির্বাচনের বাইরে রাখার যে প্রক্রিয়া তার অংশ এটি।’

এ বিষয়ে গতকাল সন্ধ্যা সাতটার দিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘রাজনৈতিক যে কোন চাপ রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে আমরা প্রস্তুত। আজ(গতকাল) রাতে আমাদের স্থায়ী কমিটির মিটিং আছে, সেখানে সিদ্ধান্ত হবে।’ ‘রায়ের তারিখ ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকারের বিশেষ কোন উদ্দেশ্য দেখছেন?’ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘উদ্দেশ্য তো জাতির কাছে পরিস্কার। বাংলাদেশের জনগণকে বাইরে রেখে ভোট দেয়ার চেষ্টা। আবারো ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া।’

রায়ে বেগম জিয়ার শাস্তি হলে বিএনপি আন্দোলনে যাবে কী না’ জানতে চাইলে আমীর খসরু বলেন, ‘সেটা সিদ্ধান্ত হবে। তবে এখানে বিএনপির একার বিষয় তো না। সারাদেশের মানুষের ভোটাধিকারের বিষয়। সারাদেশের মানুষের ভোটাধিকার, নাগরিক অধিকার সবকিছু কেড়ে নিয়ে, দেশের মালিকানা কেড়ে নিয়ে ক্ষমতায় আছে। এটা বিএনপির একার ইস্যু তো না । সাধারণ জনগণের ইস্যু। তাই সিদ্ধান্ত সেভাবেই হবে। মানুষ যেভাবে চায়।’

রায়ের পিছনে সরকারের উদ্দেশ্য কি থাকতে পারে’ এমন প্রশ্নে আমীর খসরু বলেন, ‘এটা তো বিচারিক সিদ্ধান্ত না। রাজনৈতিক নিদ্ধান্ত। তাদের মনের ইচ্ছা। ক্ষমতা দখলের সিদ্ধান্ত। ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়ার জন্য যখন যেটা প্রয়োজন সেটার ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের মানুষ এটা ভাল করেই জানে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া করছে। বেগম জিয়াকে বাইরে রাখলে তাদের (আওয়ামী লীগ) উদ্দেশ্য সফল হবে। তবে বাংলাদেশের মানুষ তো সেটা গ্রহণ করবে না।’

জানতে চাইলে গত রাত আটটার দিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাজাহান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘স্থায়ী কমিটির বৈঠকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। তাই আপাতত কিছু বলা উচিত হবে না।’

উল্লেখ্য, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা ৫টি মামলা আছে। এর মধ্যে দুটি মামলা তথা ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি। গত বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেছিল আদালত। এ মামলায় বেগম জিয়ার ‘সাজা হয়ে যেতে পারে’, এমন শঙ্কা আছে খোদ বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও। তাদের ধারণা, শাস্তির মধ্য দিয়ে আগামী নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করার একটি চেষ্টা থাকবে সরকারের। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যেও এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সমাবেশে তিনি বলেন,‘ খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষণা নিয়ে সরকারের মন্ত্রীএমপিদের বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যে পরিষ্কার হয় যে, এ মামলার রায় আগে থেকেই নির্ধারিত। প্রহসনের এ বিচারের কোনো প্রয়োজন ছিল না।’ এর আগে গত শুক্রবার অপর এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে তড়িঘড়ি করে রায় দিতে চায় সরকার।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ এবং ‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ মামলায় রাজধানীর বকশিবাজার আলীয়া মাদ্রাসায় স্থাপিত অস্থায়ী আদালতেখালেদা জিয়া ২০১৭ সালে ২৩ বার হাজিরা দিয়েছেন। দুইবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছিল। বার বার আদালতে হাজিরার মধ্য দিয়ে সরকার বিএনপিকে মূলত এই বার্তাই দিয়েছে, ‘মামলাগুলো পরিণতির দিকে যাচ্ছে।’ এইক্ষেত্রে মামলার রায় বিপক্ষে গেলে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে বিএনপি। আর সেক্ষেত্রে আন্দোলন দমাতে কঠোর হবে সরকার।

অবশ্য বিশ্লেষকরা এটাও বলছেন, মামলার রায় বিপক্ষে গেলেও উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন বেগম জিয়া। হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ ও রিভিউসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া আছে সেসব শেষ করে মামলার চূড়ান্ত রায় হতে হতে বছর পার হবে। অর্থাৎ নির্বাচনকে ঘিরে গুরুত্বপূর্ণ ২০১৮ সালের বেশিরভাগ সময় বিএনপি চেয়ারপার্সনকে ব্যস্ত রাখার একটা চেষ্টা আছে সরকারের।

অবশ্য বিএনপি নেতারা বলছেন, মামলার রায় দ্রুত দেয়া হবে সেটা তাদের ধারণার বাইরে ছিল। ফলে আপাতত তৃণমূলে দল গুছানোতেই তাদের মনোযোগ ছিল বেশি। সম্প্রতি চট্টগ্রামসহ সারাদেশে যে সাংগঠনিক সফর হয়েছিল সেটিও এই দল গুছানোর অংশ। কিন্তু হঠাৎ করে রায়ের তারিখ ঘোষণায় এক ধরনের বেকায়দায় পড়ে বিএনপি। তৈরি করে বাড়তি চাপ।

x