চান্দগাঁও থানা পুলিশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

এলাকাবাসীর সংবাদ সম্মেলন

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ১৩ জুন, ২০১৮ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
73

ইয়াবা ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ, পুলিশ ও সিএনজি টেক্সির ড্রাইভার (সকলে নয়)। এ চারএ অতিষ্ঠ পশ্চিম মোহরাবাসী। একেবারে জিম্মি দশায় আছে এলাকার লোকজন। মাদক ব্যবসায়ীদের টাকার বিনিময়ে ৮৮ ধারায় চালান দেওয়া, চাঁদার জন্য নিরিহ জনসাধারণকে কথায় কথায় পেটানো এবং পুলিশ চাঁদাবাজের পক্ষে নির্যাতিতকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে সাধারণ মানুষকে ধরে এনে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় সবই চলছে এ স্পটে। চান্দগাঁও থানা পুলিশের বিরুদ্ধে উল্লেখিত অভিযোগগুলো এনে সংবাদ সম্মেলন করেছে এলাকাবাসী।

একই সাথে তারা এ অবস্থা থেকে জনসাধারণকে উদ্ধারের জন্য প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সিএমপি কমিশনারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। গত সোমবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ মিডিয়ার সামনে আনে এলাকার লোকজন। এখানে কয়েকজন ভুক্তভোগীও নিজেদের উপর চান্দগাঁও থানা পুলিশের চালানো অত্যাচারের বর্ণনা দেন। এসময় কয়েকজন কান্নায় ভেঙেও পড়েন। পশ্চিম মোহরা মহল্লা কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন চান্দগাঁও থানার ওসি আবুল বাশার।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কাপ্তাই রাস্তার মাথার চাঁদাবাজি, পুলিশ কর্তৃক মাদক ব্যবসায়ীদের মদদ বন্ধ, পুলিশ কর্তৃক সাধারণ মানুষকে ইয়াবা ব্যবসার নামে হয়রানি ও জুলুম বন্ধের দাবিতে আমরা স্থানীয় কাউন্সিলর ও পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি।

স্থানীয় এমপি মঈনউদ্দিন খান বাদল, আওয়াামী লীগ সেক্রেটারি, সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, মহানগর আওয়ামী লীগ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও প্যানেল মেয়র জোবাইরা নার্গিস খান, ৫ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ আজমকে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কিছুতেই কোন কিছু হচ্ছে না। গত ১৫ এপ্রিল কাপ্তাই রাস্তার মাথায় হাজার হাজার মানুষের সামনে মেয়র উপস্থিত হয়ে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়ে দিয়েছেন। চাঁদাবাজি বন্ধের ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশও দিয়েছেন। না হয় উনি নিজে মাঠে নামবেন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এরপরেও অধ্যবধি চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি বরং চাঁদাবাজরা আরো বেশি বেপরোয়া এবং শক্তিশালী হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, ইতিমধ্যে আমরা সিটি মেয়রের চাওয়া অনুযায়ী চাঁদাবাজদের একটি তালিকা উনার নিকট হস্তান্তর করেছি। এরপরেও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা পুলিশ গ্রহণ না করছেনা। পুলিশ সরাসরি চাঁদাবাজদের সাহায্য সহযোগিতা অব্যাহত রাখায় চাঁদাবাজরা বেপরোয়া উচছৃঙ্খল হয়ে উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলা হয়, চান্দগাঁও থানা পুলিশের সরাসরি মদদে কাপ্তাই রাস্তার মাথাসহ চান্দগাঁও থানা এলাকা সকল অপকর্মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।

কাপ্তাই রাস্তার মাথায় কিভাবে চাঁদাবাজি হয় তার বিবরণ দিতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কাপ্তাই রোডের হাজার হাজার যাত্রী ট্যাক্সিযোগে যাতায়াত করে। এছাড়া পটিয়া থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা, কানুনগোপাড়া থেকে কাপ্তাই রাস্তার মাথা, এই সব এলাকার গাড়িগুলি কাপ্তাই রাস্তার মাথা পর্যন্ত যাত্রী নিয়ে আসতে হয়। এই সুবাধে গত পাঁচছয় বছর ধরে চান্দগাঁও থানা পুলিশ এবং কিছু চাঁদাবাজ ইয়াবা ব্যবসায়ী যোগসাজশে এই টেক্সিগুলোর মাঝে টোকেন বিতরণ করে প্রতিটি টোকেন এর দাম ৮০০ থেকে ১২শ’ টাকা। এই তিনটি রুটে আনুমানিক ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার গাড়ি চলাচল করে। প্রতিটি গাড়ির কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে ঘুরে গেলে প্রতি ট্রিপে ১০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। প্রত্যেক দিন চাঁদার পরিমাণ কমপক্ষে ৪ লক্ষ টাকা। টোকেন বিক্রি হয় মাসে কমপক্ষে ৪০ লক্ষ টাকা। ভ্যান গাড়ি থেকে চাঁদা আদায় করা হয় দৈনিক ১৬০ টাকা করে। ভ্যান গাড়ির সংখ্যা প্রায় দেড়শ থেকে দুইশটি। চাঁদা উঠে সাত লক্ষ বিশ হাজার টাকা। রেলের পরিত্যক্ত জায়গায় বাজার বসিয়ে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় হয় ৫ লক্ষ টাকা। একাজে চান্দগাঁও থানা পুলিশ সরাসরি সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। এর মধ্যে অন্যতম চাঁদগাও থানার সেকেন্ড অফিসার মোহাম্মদ ইয়াসিন। তিনি চার বছর ধরে এই থানায় আছেন। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল বাশার, এসআই কাজল সরকার, বেশ কয়েকজন সিনিয়র পুলিশ এসআই ও এএসআই।

চট্টগ্রামে মোটররিকশা সরকার কর্তৃক অবৈধ হলেও চান্দগাঁও থানা এলাকায় অবাধে চলাচল করে হাজারখানেক মোটর রিকশা। রিকশার টোকেন বিক্রি করেন সেকেন্ড অফিসার ইয়াসিন। তার ব্যক্তিগত মোটররিকশা রয়েছে বিশটি এবং সিএনজি ট্যাক্সি রয়েছে দুইটি জনৈক রাজেশ বড়ুয়া নামের ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি তার নিজের গাড়িগুলি পরিচালনা করেন। প্রতি টোকেনের মূল্য দৈনিক ষাট টাকা। প্রতিদিন আয় হয় ৬০ হাজার টাকা। আর মাসে ১৮ লক্ষ টাকা। এই বিশাল মোটা অংকের টাকা পুলিশ এবং চাঁদাবাজদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। এর মধ্যে আরো ভাগ পান ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টি আই) শওকত এবং এই এলাকায় যারা ডিউটিতে থাকেন তারা। ডিউটিরত ট্রাফিক সার্জেন্টের মূল কাজ যানজট নিরসন করা হলেও কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় ট্রাফিক সার্জেন্ট সারাদিন ব্যস্ত থাকেন সিএনজি ট্যাক্সির চেকিং নিয়ে। কোন গাড়ি টোকন না নিলে সাথে সাথে টু করা হয়। কোন ড্রাইভার কোন কারণে প্রতিবাদ করলে তাকে পার্শ্ববর্তী পুলিশ বক্সে নিয়ে গিয়ে এসআই কাজলের সাহায্যে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হয়। বিভিন্ন মামলায় আসামিও করা হয়।

টিটু নামে একজন কাপ্তাই রাস্তার মাথা সকল অপকর্মের মূল নায়ক, তার সহকারী ছাত্রলীগ নামধারী দেলোয়ার সকল চাঁদা সংগ্রহকারী হিসাবে কাজ করেন বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। তাদের মদদদাতা হিসাবে এলাকার কিছু অর্থলোভী নেতাসহ তালিকায় নাম রয়েছে বহিরাগত চিহ্নিত দাগী আসামি আবুল হোসেন, জাকির, হাসান, জাফর, সাহেদ রানা, লুঙ্গি সাহেদ, মেহেদী হাসান, রাসেল, টোকাই জুয়েল, মাহাবু, মোরশেদ ও ভুট্টো এবং এলাকার কিছু বখাটে ইয়াবা সেবী। এরা সংঘবদ্ধভাবে চাঁদা আদায় করে। তাদেরকে সাংগঠনিক ছত্রছায়া দিয়ে থাকে চট্টগ্রাম অটো টেম্পো শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হারুন।

আজাদ ড্রাইভার, আরিফ, আলমগীর, মজিব। এরা চারজনই সিএনজি ট্যাক্সি চালক। তারা চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করার কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার পর তারা ট্যাক্সি চালানো বন্ধ করে দিয়েছে।

অপরদিকে, উক্ত চাঁদাবাজির মূল নায়ক আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। কিন্তু তারা পুলিশের সাথেই চলাফেরা করে, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ছাড়ানোর মধ্যস্থতা করে।

সংবাদ সম্মেলনে জাকির হোসেন নামে একজন বলেন, কয়েক বছর আগে মধ্য প্রাচ্য থেকে দেশে এসে পরিবার পরিজন নিয়ে কোনভাবে দিনাতিপাত করছি। আমার ভাই ইদ্রিস একজন খেটে খাওয়া মানুষ। গত মে চান্দগাঁও থানার এস আই সাইফুল আমার ভাই ইদ্রিসকে ডেকে বলে তোমাদেরকে দুই হাজার করে ইয়াবা দিয়ে চালান দেব। ইদ্রিস তাকে তার আমাদের উপর জুলুম না করার জন্য অনুরোধ করেন। এক পর্যায়ে আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, তোমার ভাইকে নিয়ে যাও। আমি সেখানে গেলে আমরা দুই ভাইকে হ্যাণ্ডকাপ পড়িয়ে চান্দগাঁও থানায় নিয়ে যায়। প্রথমে দুই লাখ টাকা দাবি করে। কিন্তু আমরা তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করি। পুলিশের চাপাচাপিতে শেষে ৫০ হাজার টাকা যোগাড় করে এস আই সাইফুলের হাতে তুলে দিলে আমাকে (জাকির) ছেড়ে দেয়। কিন্তু ইদ্রিসকে ১০০০ পিস ইয়াবা দিয়ে চালান দেয়। আমরা এই বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করি।

আরেকজন ভুক্তভোগী রাশেদা বেগম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রুশ্নি হত্যা মামলার ভিকটিম রুশ্নি আমার মেয়ে। মেয়েকে শ্বশুড় বাড়িতে হত্যা করা হয়। চান্দগাঁও থানায় মামলা করেছি। কিন্ত পুলিশ আমাকে বিভিন্ন সময়ে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে হয়রানি করেছে। মামলার চার্জশিট দেয়নি। আমার মেয়ে জামাইকে যৌতুক হিসেবে দেয়া মালামাল উদ্ধারের জন্য আদালত নির্দেশ দিলেও এস আই লিটন খুনিদের পক্ষ নিয়ে মালামাল গুলি পর্যন্ত উদ্ধার করে দেয়নি।

পশ্চিম মোহরা সেলিমার পিতার বাড়ির আবুল কালামের মেয়ে মনোয়ারা বেগম। স্বামী ও শ্বশুড় বাড়ির লোকজন তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। আশংকাজনক অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১০ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গত ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শুরু থেকেই পুলিশের অসহযোগী মনোভাব, যখনতখন টাকা চাওয়া দেখে তিনি আর মামলা করতে যাননি। কারণ পুলিশকে টাকা দেয়ার মতো আয় তার নেই। তাই বিচার আল্লাহ এর কাছে দিয়েছেন।

লিখিত বক্তব্য রাখেন মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন মো. জাকির ও রাশেদা বেগম। প্রশ্নের উত্তর দেন মোহাম্মদ রফিক কোম্পানি। উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ছৈয়দ মোহাম্মদ ইছহাক কমান্ডার, মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আবুল হাসেম, মোহাম্মদ রফিক এলাহী, সফিকুল ইসলাম সৌরভসহ এলাকাবাসী।

এর আগে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন পশ্চিম মোহরাবাসী। এসময় বক্তারা অবিলম্বে অপকর্মে জড়িত পুলিশ, চাঁদাবাজ এবং মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়।

x