চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের নবজন্ম হতে পারে যেভাবে

ইকবাল হোসেন

বুধবার , ৮ মে, ২০১৯ at ৬:১৮ পূর্বাহ্ণ
533

একসময় খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ে সিংহভাগ ব্যবসা হতো নৌপথে। সময়ের বিবর্তনে দখল, খাল ভরাটসহ যোগাযোগ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই ছেড়েছেন। যারা আছেন তাদেরও ভোগান্তির কমতি নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সব মিলিয়ে চাক্তাই খাল খনন ও সম্প্রসারণ হলে নতুন করে জাগতে পারে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসা।
জানা যায়, বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর মোহনায় চট্টগ্রাম বন্দরকে ঘিরে ঘরে ওঠে দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ-চাক্তাই। ১৮৭৫ সালে খাতুনগঞ্জে ব্যবসা শুরু হয়। নৌপথে যোগাযোগ সুবিধার কারণে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকে ঘিরে সম্প্রসারণ ঘটে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসা। প্রথম দিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সিংহভাগ পরিচালিত হতো নদীপথে। পাশাপাশি চাক্তাই, কোরবানীগঞ্জ, আছদগঞ্জ, বিটলিগঞ্জ, টেরিবাজার, বকশিবাজার, মিয়াখান নগর, ফিরিঙ্গিবাজার, সদরঘাট ও মাঝিরঘাটে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক পরিধি বাড়তে থাকে।
শুরু থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় সড়ক পথে মালামাল পরিবহন ছিল সীমিত। চাক্তাই, বদরখালী খালসহ বেশ কয়েকটি খালকে ঘিরে খাতুনগঞ্জে পণ্য আনা-নেওয়া করা হতো। প্রথম থেকে নদীপথ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হলেও সময়ের বিবর্তনে সড়কপথ যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হতে থাকে। বাড়তে থাকে সড়কপথে পণ্য পরিবহনও। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে যোগাযোগের জন্য লালদীঘি, কোতোয়ালী, সদরঘাটের সাথে রাজাখালী ও চাক্তাই দিয়ে ট্রাক যাতায়াত শুরু হলে নদীপথে যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। তারপরেও যোগাযোগ খরচ কম হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা এখনো নৌপথে পণ্য পরিবহন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
তাছাড়া বর্ষায় নগরীর বড় অংশের পানি চাক্তাই খাল দিয়ে কর্ণফুলী নদীতে পড়ে। কিন্তু ভরাট ও দখলে রুগ্ন চাক্তাই খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়ে পুরো নগরী জলাবদ্ধতার শিকার হয়। জোয়ারের সময়েও জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। ইতোমধ্যে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় থাকা ৩৬টি খালের মধ্যে চাক্তাই অন্যতম।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, চাক্তাই খালে পণ্যবোঝাই সারি সারি নৌকা। গন্তব্যে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেও ভাটার কারণে খালে আটকা পড়েছে নৌকাগুলো। বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি শুরুর প্রায় এক বছরের অধিক সময় পার করলেও এখনো চাক্তাই খালের তেমন একটা উন্নতি ঘটেনি। খালের ভাটির মুখে শুধুমাত্র স্লুইস গেট বসানোর কাজ চললেও খনন, সম্প্রসারণের কাজ এখনো শুরু করা হয়নি। ফলে চাক্তাই খালে পণ্যবাহী নৌকা ঢুকলে বের হতে একদিন সময় লাগে। অতি জোয়ারে যেমন চাক্তাই চামড়া গুদাম সেতু পার হওয়া যায় না, তেমনি অল্প ভাটার সময়ও খালে আটকে যায় পণ্যবাহী নৌকাগুলো।
কুতুবদিয়ার আবুল হোসেন প্রতি সপ্তাহে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকে ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি তেল নিয়ে যান। সড়ক যোগাযোগ না থাকায় তিনি এখনো নৌ পথেই পণ্য আনা-নেওয়া করেন। তিনি বলেন, চাক্তাই খাল একেবারে ভরাট হয়ে পড়েছে। আগে চাক্তাই খালে পানি থৈ থৈ করত। এখন আবর্জনা ও পলি জমে খালের উচ্চতা কমে গেছে। নৌকা নিয়ে ঢুকলে পানি কম থাকলে আর বের হওয়া যায় না।
মধ্যম চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ী আবুল বশর বলেন, আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ে ব্যবসা করছি। আমার পেঁয়াজের আড়ত রয়েছে। এখনো নৌপথে বাঁশখালী, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, সন্দ্বীপের অনেক ব্যবসায়ী চাক্তাই থেকে মালামাল কিনতে আসেন। কিন্তু আগের তুলনায় বর্তমানে ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক কম। এখন অনেক পণ্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে সরাসরি খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে চলে যাচ্ছে।
চাক্তাই শিল্প ও ব্যবসায়ী সমিতির সচিব মো. ইউনুচ দৈনিক আজাদীকে জানান, দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি পণ্যের বাজার চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ। একসময় নৌকাযোগে হাজার হাজার ব্যবসায়ী এখান থেকে পণ্য কিনে নিয়ে যেতেন। এখন চাক্তাই খালটি একেবারে মরে গেছে।
তিনি বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সিডিএ একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে এক বছর সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু চাক্তাই খালের মাটি খালেই রয়ে গেছে। চাক্তাই খালটি সঠিকভাবে খনন করা হলে সহজভাবে নৌকা যাতায়াত করতে পারবে। এতে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ দুটোই বাঁচবে।

x