চাই বিবেকের উত্থান

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
27

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ভাষা শহীদের সম্মান ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী নানা আয়োজন, বইমেলা ও অনুষ্ঠানাদির বিপুল সমারোহ। এর মাঝে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশে বইমেলার উদ্বোধন করেছেন ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনে। বাংলা একাডেমির নতুন মহা পরিচালক কবি ও কথাশিল্পী হাবীবুল্লাহ সিরাজী এবারের আয়োজনে ভিন্ন আঙ্গিক যোগ করেছেন। বইমেলার থিম করা হয়, ‘বিজয়: ১৯৫১ থেকে ১৯৭১ এবং নবপর্যায়।’ এবারের মেলায় ওপার বাংলার খ্যাতিমান কবি শঙ্খ ঘোষ এবং মিশরীয় সাংবাদিক-গবেষক মহসিন আল আরিশি বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে যোগ দেন। আরিশি শেখ হাসিনাকে নিয়ে আরবীতে নিজের লেখা একটা বইয়ের কপি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
বাংলা একাডেমির আয়োজনে একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিপুল পরিসরে আয়োজিত হচ্ছে মাসব্যাপী বইমেলা। বছর বছর মেলার পরিসর বাড়ার পাশাপাশি সারা দেশের জেলা পর্যায়েও বইমেলা আয়োজিত হচ্ছে। বই বিক্রিও বাড়ছে। বাড়ছে লেখক ও প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যাও। বিশ্বের সবচেয়ে মধুর ভাষা হিসাবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আমাদের প্রিয় ভাষা বাংলা বিশ্ব দরবারে নয়া মর্যাদায় তুলে এনেছে পুরো জাতিকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলা ভাষার আধুনিকায়নের কাজটা এখনো ঠিকমতো হচ্ছে না। রাজধানীর তুলনায় চট্টগ্রাম বা দেশের অন্য সব বড় নগরে মান সম্পন্ন লেখক, সাহিত্যিক উঠে আসছেন না। প্রচুর প্রকাশনা সংস্থা ও বই বের হলেও সাহিত্যমান খুব একটা উন্নত নয়। এমনকি বাক্য গঠন ও বানানেও অনেক বই শোভম নয়। ফলে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছেন নতুন লেখকরা। সাহিত্য-সংস্কৃতিও রাজধানী কেন্দ্রিক হয়ে পড়াও মেধা ঘাটতির অন্যতম কারণ। তাছাড়া বৃটিশ ঔপনিবেশিক লেজুড় এখনো প্রিয় ভাষাটিকে টেনে যেতে হচ্ছে। প্রশাসনিক পর্যায়ে বাংলা চালু হলেও এখনো তা মানোত্তীর্ণ নয়। ব্যবহারও সীমিত পরিসরে। উচ্চ আদালতসহ কিছু সরকারি দফতরে বাংলা এখনো অবহেলিত। বাংলা একাডেমি অতীতে ভাষা উন্নয়ন বা যুগোপযোগী করা অথবা ঔপনিবেশিক লেজুড় ঝেড়ে ফেলার উদ্যোগ নেয়নি। তাই ডেপুটি কমিশনারের বাংলা এখনো জেলা প্রশাসক থেকে গেছে। এরকম প্রচুর গোঁজামিল প্রিয় ভাষাটির ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো চেপে আছে। আশা করি, এসব গোঁজামিল দূর করতে একাডেমির নয়া প্রশাসন উদ্যোগ নেবেন। তাছাড়া আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও বাংলা ভাষার ব্যবহার ও আধুনিকায়নের বড় বাধা। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজি মাধ্যমের দাপটে বাংলাকে ব্রাত্য ভাষায় অবনমন ঘটাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় ইংরেজি প্রাধান্য ও মাদ্রাসা শিক্ষায় আরবী উর্দুর বহুল ব্যবহারও বাংলা ভাষাকে চাপে ফেলে দিয়েছে। এমনকি বাংলা এখন নিম্নবিত্তের শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে নিজের ঠাঁই খুঁজে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। রাজনৈতিক দৃঢ় অঙ্গিকার ছাড়া বাংলা ভাষার পূর্ণ মর্যাদা কখনো সম্ভব না।
এ ব্যাপার শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা গড়ার দায়ও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। মনে রাখা উচিত, মাতৃভাষা বাংলায় পূর্ণ দখল ছাড়া অন্য যে কোনো বিদেশি ভাষা আয়ত্ব করা সহজ না। জিপিএ নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থাও ভাষার বড় শত্রু। কারণ, পরীক্ষার উচ্চ জিপিএ চাহিদার দৌড় সৃজনশীল লেখাপড়াবিমুখ করে দিচ্ছে নতুন প্রজন্মকে। জ্ঞান ভান্ডারের চাবি হচ্ছে, সৃজনশীল পাঠাভ্যাস ও চর্চা। দেশপ্রেমিক মননশীল জাতি গঠনে এ ব্যাপারে অভিভাবক সচেতনতাও জরুরি। শুধু পেশানির্ভর বিদ্যা মানুষের মানবিক সত্তার বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়। কিন্তু বিশিষ্টদের বক্তৃতা বিবৃতিতে সুবচন বর্ষিত হলেও বাস্তবায়ন নেই। এমনকি যারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করেন, তারা নিজ পরিবারে তা বাস্তবায়ন করেননা।
আসলে আমরা পারিবারিকভাবে সবসময় মজবুত ও নিরাপদ অবস্থানে থাকতে চাই। যে যত বেশি মজবুত অবস্থানে আছি, ভাবি, আমিই সেরা! আমি যা বলি, করি সব ঠিক! নিজের জীবন বিধান (লাইফ কোড) আমরা নিজেরা বানিয়ে নিই। এখানে মেধা-সংস্কৃতির কোনোই যোগ নেই। চলি-বলি- করি নিজের সংবিধিবদ্ধ নিয়ম ধরে। কে মরে বা বাঁচে, একটুও ধার ধারি না। এদেশে যিনি যতবড় দুর্নীতিবাজ তিনিই শ্রেষ্ঠ দাতা এবং ধার্মিক! সামাজিক এই উল্টাযাত্রায় কীভাবে ভাষা ও সংস্কৃতি মর্যাদা পাবে!
আমরা সুবিধাভোগীরা নিজের পরিজন বা স্বার্থের বাইরে কানা পয়সাও খরচ করি না। এই সংস্কৃতির পোশাকী নাম কর্পোরেট সংস্কৃতি বা ভোগবাদ! ভোগবাদ সবার আগে মানুষের বিবেক-নৈতিকতাকে গলা টিপে খুন করে। বিবেক বিবর্জিত দ্বিপদী ভাষা-সংস্কৃতির মর্যাদা কীভাবে দেবে! এরা যা চর্চা করে, ভাবে তাই আসল সংস্কৃতি -ভাষা সব! বিকৃত সংস্কৃতি সংক্রমিত বিবেকহীন মানুষ বুঝতে পারেন না, তিনি কখন মানবেতর প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছেন? তিনি জানেন না, স্বার্থ বা প্রাপ্তিযোগ ছাড়া নিজের মায়ের ভাষা-সংস্কৃতি বা একজন অসহায়ের ছোট্ট সেবায় আনন্দ ভান্ডারের যে মুখ খুলে যায়, তা কোটি টাকার ভোগে অসম্ভব! তো, আসুন না, আমরা যারা বিবেকের গান গাই তারা বিবেকের একটু সেবা দেই। প্রিয় ভাষা, সংস্কৃতি সুরক্ষার পাশাপাশি দেশ এবং মানুষের জন্য ছোট ছোট কিছু কাজ করি। কী কাজ, নিজেই বাছাই করুন। বিবেক নির্দেশনা দেবে, কোন কাজটা ঠিক। ঠিক কাজটা নিঃস্বার্থভাবে একবার করলে বুঝা যাবে, বিপুল টাকায় কেনা সুখের চেয়ে একফোঁটা ত্যাগের সুখ অনেক-অনেক বেশি উপভোগ্য! আসুননা শুরু করি, আজ থেকেই।
একটু মনোযোগে স্পষ্ট হবে, বিপুল আয়োজন- আড়ম্বরে ফেব্রুয়ারি জুড়ে প্রিয় ভাষা এবং ভাষা শহীদের সম্মানে এত হৈ চৈ’র আসল ফলাফল কী? এটা কি, বছরের বাকি এগারো মাস প্রিয় ভাষা ও ভাষা শহীদের ভুলে থেকে তাদের প্রতি অসম্মান নয়! বাস্তবে তাইতো হচ্ছে! এতে পরিষ্কার, আড়ম্বর- আয়োজনের মাঝে ভাষা বা শহীদের প্রকৃত মর্যাদা সম্ভব না! যতক্ষণ না, আমরা রক্তদামে অর্জিত প্রিয় ভাষা ও সংস্কৃতির শুদ্ধ ব্যবহার ও চর্চা না শিখি। দুর্ভাগ্য, সজ্জন, শিক্ষিত দাবিদারেরা একটা বাংলা বাক্য লিখতে দু’তিনটে ভুল করছি! অবাক কান্ড, একটুও লজ্জা পাইনা! কিন্তু বিপরীতে ইংরেজি বাক্য ভুল হলে খুবই লজ্জা পাই! এটা কী মানসিক বিকৃতির লক্ষণ নয়? এভাবে যথেচ্ছ, মাতৃভাষার শ্লীলতহানী করে ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা কী সম্ভব! আমাদের চারপাশে বিদেশি পণ্যভান্ডার, খাবারের দোকান, চেইন শপিং মল, ডিজাইন হাউজ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান যে হারে বাড়ছে, পাল্লা দিয়ে কমছে লাইব্রেরি, পাঠাগার। এটা শুদ্ধ, সংস্কৃতিমনস্ক জাতি গঠনে একটি বড় বাধা। বোধ-বুদ্ধি ও বিবেকের মড়কের চেয়ে বড় মানবিক অপমাান আর হয় না। বোধের গণ আত্মাহুতির কারণে আমরা লজ্জার মাথা খেয়েছি! আসুন, নিজের সাথে শপথ নিই, আজ থেকে আমি ভুল বাংলা আর লিখব না, ভালবাসবো নিজের সংস্কৃতিকে। ইচ্ছা আর চর্চা যদি এক বিন্দুতে আনা যায়, এটা খুবই সহজ। আমরা যদি সহজ কাজটি সহজভাবে করতে পারি, তাহলে প্রিয় ভাষা ও ভাষা শহীদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রদর্শন সম্ভব। যা মাসব্যাপী শুধু আনুষ্ঠানিক বিপুল আয়োজনে কখনো সম্ভব না।

x