চাঁদ সূর্য

দীপক বড়ুয়া

রবিবার , ১১ আগস্ট, ২০১৯ at ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
26

আমার বাবা নেই। আদৌ ছিল কি? তাও জানি না। বড্ডো একা। মনে মনে অনেক প্রশ্ন, কে আমার বাবা, মা! যুগ চলছে যুগের পর, তারপরওে জানলাম না আমার বাবা- মা কে?
এই রকম তো হয় না।
আমার বেলায় হলো। কি দোষ করেছিলাম, যে এভাবে শাস্তি পাচ্ছি।
সহ্য হয় না। সময়ে অসময়ে কাঁদি। চোখ উষ্ণ জল ফেলে। কেউ জল মুছে দেয়না। আমিও মুছি না। ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায়। জলের দাগ লাগিয়ে থাকে চোখের নিচে।
আমার নিজেকে ভালো লাগে না তখন। বিশ্রী মনে হয়।
চাঁদ ডাকে,
– এই সূর্য, শোনো, তুমি কাঁদছিলে কেন? কি দুঃখ তোমার। তুমি কাঁদলে মানায় না। তুমি কাঁদবে না।
আমি চাঁদের কথার উত্তর কি, জানি না।
চুপ থাকি।
চাঁদ রেগে যায় আমার উপর।
কর্কস গলায় বলে,
– আচ্ছা, তুমি কি? তোমার লাজ, রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ কিচ্ছু নেই?
আমি ওসবের মানে কি বুঝি না।
কি বলবো চাঁদকে!
চাঁদতো ছোট।
আমি ঘুমোলে ও জাগে। আমি না থাকিতো, চাঁদের কি দাম। চাঁদ অসহায়, দুর্বল, শক্তিহীন। চাঁদ কি কারো প্রয়োজনে আসে? চাঁদ থাকলে পৃথিবীর কি লাভ? মানুষেরই বা কি লাভ!
চাঁদ সুন্দরী!
রূপের ঝলক আছে। কলংকও আছে। চাঁদ নিয়ে গল্প হয়, শিশুদের ঘুম পাড়ানি গান হয়। চাঁদে মানুষ যায়। ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। হয়তো একদিন বৈজ্ঞানিকেরা চাঁদে ঘর বানাবে। মানুষ থাকবে।মানুষের বসতি হবে।
এটা কি সত্যি!
না কল্পকাহিনী?
শুনেছি মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। সব পারে ওরা।শুধু পারেনা মানুষের প্রাণ দিতে। যদি তাই পারতো, সবকিছুর স্রষ্টার কোনও মূল্যই থাকতো না। কেউ কাউকে মানতো না। মা- বাবা থাকতো না। ধর্ম মানতোনা। বড় ছোট পার্থক্য হতো না।
চাঁদ বলে,
– কিছু ভাবছিলে? কতো প্রশ্ন করলাম, উত্তর দিলে না তো!
বোকা মেয়ে। অদ্ভুত!
সে কি? তার কোন অস্তিত্ব আছে, সে কি জানে আদৌ?
শুধু প্রশ্ন ছুঁড়ছে।
প্রশ্নের পর প্রশ্ন!
রেগে আমি ও বলি,
– তুমি কে? কে আমার? আর এতো কথা বলছো কেন? প্রশ্ন করছো!
– আমি তোমাকে পছন্দ করি, ভালোবাসি। চাঁদ টুক করে বলে।
মনেমনে আমি হাসি।
কি আশ্চর্য! আমাকে ভালোবাসে। কি গুণ আছে, সামর্থ্য আছে আমাকে ভালোবাসার। পিচ্ছি মেয়ে। জীবনভর আমার আলোতে আলোকিত। আমি নাইতো, চাঁদের অস্তিত্ব থাকে।
চাঁদ কাঁদে।
আমার উত্তর না পেয়ে উঁচু গলায় কাঁদে। নাকে চোখে জল বেরুয়।
লজ্বায় হাসি।
চাঁদ বলে,
– তুমি হাসছো? তোমার লজ্জা করে না?
– ওমা, এটা কি বলছো! তুমি কাঁদছো, তাই আমি হাসবো না! না- সে তোমার অন্যায়। ওভাবে বলবে না। আমি বলি।
আবার হাসি।
– এই নীল আকাশে আমরাইতো থাকি। থাকে গ্রহ, তারা।আমাদের যদি ভাব না থাকে! অন্যরা কি ভাববে? চাঁদ নিচু গলায় আবার বলে।
– সেতো ঠিক বলেছে। কিন্তু অন্যরা কে? সেইতো বুঝলাম না।
– মানুষের কথা বলছি। যারা আমাদের পছন্দ করে, ভালোবাসে।
– ও, তাই বলো। তবে কি জানো, তোমারতো কিছুই নেই গর্ব করার মতো। তোমাকে মানুষ ভালোবাসবে কিসের আশায়!
– মানে? কিছু নাই, মানে! আমার ভরা পূর্ণিমা আছে।
– নিজের কোনও আলো আছে? আমার আলোয়তো সব করো।
– হ্যাঁ, আমি জানি, তোমার ইশারায় ভোর হয়, সকাল- দুপুর হয়,সন্ধ্যা- রাত হয়। তুমি কখনও দেখেছে আমার চন্দ্রগ্রহণ? মানুষেরা উৎসুক থাকে ঐ চাঁদের গ্রহণ দেখার জন্য।
তারপর চাঁদ চুপ থাকে। সে জানে তার নিজের আলো নেই।
– জানো, আমি প্রতিদিন থাকি। তুমি থাকো মাসে পনের দিন। বাকি পনের দিন থাকতে পারো না। যে ক’দিন থাকো, তা’ও একই আকারে নয়। পূর্ণিমার পর থেকে ছোট হতে থাকো। আমি বলি।
আমার কথা শুনে চাঁদ বলে,
– লজ্জা দিচ্ছো আমাকে! অহংকার করছো? অহংকার ভালো বিষয় নয়।
-জানি, এবং সেটা আমি করতেই পারি। আমি শ্রেষ্ঠ। আমার উপরে কেউ নেই।
– বাহ্‌, এতো? ও, তুমি বোধ হয় অনেক কিছু জানো না। আমায় দেখে মানুষেরা গুরুত্বপূর্ণ দিন উদযাপন করে। যেমন কোরবানি ঈদ, রমজানের ঈদ, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা:), জন্মাষ্টমী হয়। বুদ্ধ পূর্ণিমা হয়! আরো অনেক কিছু হয়। যা’ তোমাকে দিয়ে কখনও হবার নয়।
এইসব কথার যুক্তি আছে। সত্যও বটে। মনে মনে আমি লজ্জা পাই।
ঐ ক’টা দামি কথা বলেই চাঁদ চুপ।
একটু থেমে আবারও বলে,
– জানো সূর্য, তোমাকে কেউ ছুঁতো সাহস পায়না। জ্বলে ছাই হবার ভয়ে। আমাকে সবাই ছোঁয়। ছুঁয়ে আনন্দ পায়।স্বপ্ন দেখে। আমার আলোয় রাতের পৃথিবীও হাসে। তুমি অস্বীকার করতে পারো?
চাঁদের এই কথাটি দারুণ সত্যিই! তাই চুপ থাকি।
চাঁদ কথা বাড়ায়না।
কাঁদে। শুধু কাঁদে! শব্দ করে!
এবারের কান্না অসহ্য, বিশ্রী।
ভালো লাগেনা। কি ভেবে চাঁদ কাছে আসে। আমাকে ছুঁয়ে বলে,
– আমাকে ভালোবাসোনা তুমি?
– না,ভালোবাসিনা। তুমি কে?
– আমি কে? আমি চাঁদ! পৃথিবীর সবাই জানে। তুমি বলছো,আমি কে?
– হ্যাঁ বলছি,তুমি কে?
– আমি গ্রহ,
– ঠিক আছে; তুমি গ্রহ, গ্রহই থাকো। আর বেড়ো না।
থেমে থেমে চাঁদ কাঁদে।
মেয়েটি কান্না ছাড়া কিছুই পারে না যেন। কাছে টানতে পারি না, দূরেও ঠেলে দিতে পারিনা!
আমিও চুপ থাকি।
আমার চুপ থাকা চাঁদের পছন্দ নয়।
নিজে কান্না থামায়!
বলে,
– সত্যিই, আমাকে ভালোবাসবে না?
– এককথা বারবার বলা ঠিক নয়।
– তা’ হলে কি করবো আমি।
– কি করবে? আমি কি জানি!
– এক জায়গায় থাকি, এক সঙ্গে ভাব জমিয়ে থাকলে অসুবিধে কোথায়? চাঁদ উত্তর দেয়।
– কই! আমরাতো এক জায়গায় থাকি না। আমিও বলি।
– কেন? আকাশের নিচে।
– আকাশের নিচে? হাঃ হাঃ হাঃ!
হাসতে থাকি। হাসছিতো হাসছি!
হাসি থামে না।
চাঁদ এবার অন্য সুরে কথা বলে।
– আচ্ছা সূর্য! আমি, তুমি রাগ ছাড়া চলতে পারি না? যাতে এ রকম আর দ্বিতীয়বার এ ধরনের কথা না উঠে আমাদের জীবনে!
– মন্দ বলোনিতো! কি করতে বলছো? বলো!
– সেই জ্ঞান কি আমার আছে? তুমিই ভালো জানো। হ্যাঁ, তুমিই বলো।
আমি ভাবি।
কি করতে পারি?
অনেকক্ষণ ভাবার পর বলি,
– চাঁদ!
চাঁদের কি খুশি! চাঁদ বলতেই সে বলে,
– কি সুন্দর করে আমায় ডাকলে! চাঁদ! যেন মিষ্টি ঝরছে। লক্ষ্মীটি আবারও ডাকো- চাঁদ।
আমি তৃপ্ত সূর্য।
ভীষণ খুশি!
এইতো চাই।
আমি চাঁদের কথায় অবাক হই।
আমি বলি,
– শোনো, তোমায় একটি বর দিতে চাই আমি।
– কি বর?
– জীবন স্বপ্নের বর। এই বরে আমৃত্যু সম্মানে থাকবে তুমি। পৃথিবীর কেউ তোমাকে অসম্মান, অনাদর করবে না কোনদিন।
– কি বর! বলোনাগো, কি বর! আমার ধৈর্য্য যে সইছে না আর।
– শোনো, তোমার সাথে তো আমার মিল হবেনা কোনদিনও। তাই ভেবেছি, তোমাকে একটি দুর্দান্ত বর দেবো। সেই বরে তুমি হবে অনন্য, ধন্য।
– বলো না, বরটা কি?
চাঁদকে একটু ভাবাতে চাই।
তাই চুপ থাকি। কথা না বলে দূরে চোখ রাখি।
দেরি সয়না চাঁদের। সে ছটপট করে। জানতে আগ্রহ বাড়ে চাঁদের।
ওর ঐ ছেলেমি আমার ভালো লাগে।
যখন চাঁদের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে, তখনি আমি মুখ খুলি,
– চাঁদ শোনো,আমি তোমার চেয়ে বড়ো। জ্ঞানে, গুণে, ক্ষমতায়।
– জ্ঞানে গুণ বড়ো! ঠিক আছে। কিন্তুু! ক্ষমতায়তো বুঝলামনা।
চাঁদের অল্পজ্ঞানী কথায় হাসি পায় আমার। আর দেরি নয়। বলি,
– আমার আলোর তাপ আছে প্রখর। যেটা তোমার নেই। আমার তাপ আছে। মানুষের উপকারে আসে।শুধু মানুষ নয়, সবকিছুর।
তোমার আলোর তাপ মিঠে। তাও আবার ক্ষীণ। দীপ্ত আলো নেই।তাই বলছি,আমি যে বর দিচ্ছি তা’ গ্রহণ করো।
চাঁদ আমার পষ্ট কথা বুঝে বলে,
– বলো, তোমার বরটা কি?
– যেহেতু আমি চতুর্দিকে তোমার চেয়ে বড়ো, সে হিসেবে আমার নাম আগে থাকা বাঞ্চনীয়। অর্থাৎ সূর্যচাঁদ হলে ভালো। তবে সেটা আমি করছি না। যতদিন পৃথিবী থাকবে, প্রাণী থাকবে, সবাই বলবে চাঁদসূর্য।
সূর্যচাঁদ নয়! কি বলো! ভালো হবেনা? এই বরটি তোমাকে দিলাম।
তুমি খুশিতো চাঁদ!
চাঁদের চোখ আমার চোখে। চোখ একটিবারও নড়ে না। যেন কতোকাল আমার চোখ দেখেনি। আমিও চাঁদের চোখের উপর চোখ রাখি। চোখ সরাইনা।
এরপর চাঁদ হাসে, মিষ্টি! স্নিগ্ধ!
চাঁদের এই অনাবিল হাসি কোনদিনও দেখেনি। ভাবি, এতো সুন্দর হাসতে পারে চাঁদ!
চাঁদ অস্পষ্ট গলায় বলে,
– ক্ষতি কি? বরটাতো মন্দ না সূর্য! আমার নামের সাথে তোমার নাম,- চাঁদসূর্য! আহা কি মিষ্টি!
সবাই বলবে, চাঁদসূর্য। কি সুন্দর! মধুময়!
জানো সূর্য, আমি ভীষণ খুশি!
তুমি সত্যিই বড়ো, অনেক বড়ো। মনও বড়ো! তোমার তুলনা নেই।
চাঁদ আর দাঁড়ায় না।
একান্ত নির্বিঘ্নে সহাস্যে নতজানু হয়ে চাঁদ লাজুক পায়ে চলে যায়।
আমি চাঁদের চলে যাওয়া দেখি!

x