চসিকের ২৪৮৫ কোটি টাকার বাজেট

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ৩১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ
120

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০২০) জন্য দুই হাজার ৪৮৫ কোটি ৯১ লাখ ৭৮ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এতে নগর উন্নয়নে সর্বোচ্চ এক হাজার ৬৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকার ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়। বিদায়ী অর্থবছরের ন্যায় এবার ঘোষিত বাজেটও অনুদান নির্ভর। উন্নয়ন অনুদান খাতে সর্বোচ্চ এক হাজার ৭০২ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউটে বাজেট ঘোষণা করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। এসময় গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের সংশোধিত দুই হাজার ৪৫ কোটি ৫১ লাখ ৯৮ হাজার টাকার বাজেটও ঘোষণা করেন তিনি। গত অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ছিল দুই হাজার ৪২৫ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার টাকা। প্রসঙ্গত, বর্তমান পর্ষদের মেয়র হিসেবে নিজের শেষ বাজেট ঘোষণা করলেন নাছির।
বাজেট অধিবেশনে সিটি মেয়র বলেন, নগরবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর প্রত্যাশা ও চট্টগ্রাম মহানগরকে পরিবেশগত, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ নান্দনিক ও বাসযোগ্য নগর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়ন করেছি।
অর্থ ও সংস্থাপন কমিটির চেয়ারম্যান কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন হিরন বাজেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সভা পরিচালনা করেন চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা। এসময় উপস্থিত ছিলেন প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, জোবাইরা নার্গিস খান, ড. নিছার উদ্দিন আহমদ মঞ্জু, চসিক সচিব আবু শাহেদ চৌধুরী, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা সুমন বড়ুয়া, মেয়রের একান্ত সচিব আবুল হাশেম, প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাইফুদ্দিন, অতিরিক্ত প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির প্রমুখ।
বাজেটের ব্যয় খাতসমূহ : ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নগর উন্নয়ন খাতে সর্বোচ্চ ব্যয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। টাকার অংকে এক হাজার ৬৩৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা। নগর উন্নয়নে প্রস্তাবিত ব্যয় খাতগুলো হচ্ছে এডিপির আওতায় ১৫টি প্রকল্পে এক হাজার ৪৫২ কোটি টাকা, রাজস্ব তাহবিলে ২৩ খাতে ১৬৪ কোটি টাকা এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় আরো দুটি খাতে ২৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এসব খাতে ব্যয় হয় এক হাজার ৫৭২ কোটি ৪১ লাখ ১৪ হাজার টাকা।
বরাদ্দ বেড়েছে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে : নগর উন্নয়নের বাইরে কর্পোরেশনের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৫৪৫ কোটি ১৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে এবারের বাজেটে। গত অর্থবছরে ১৫ খাতে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ব্যয় হয়েছিল ৩৬১ কোটি ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা। পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় বেতন, ভাতা ও পারিশ্রামিক খাতে ২৮২ কোটি ৯০ লাখ টাকা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ৫৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা খাতে ৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সর্বোচ্চ আয় অনুদান খাত : প্রস্তাবিত বাজেটে ত্রাণ ও উন্নয়ন অনুদান খাতে সর্বোচ্চ আয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রকল্পের বিপরীতে সরকার ও বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা থেকে অনুদান খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ৭০২ কোটি টাকা। এতে ২৫০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া ত্রাণ সাহায্য খাতে আয় ধরা হয়েছে ২০ লাখ টাকা।
বিগত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এক হাজার ৬৮০ কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ খাতে আয়ের প্রস্তাব ছিল। বিপরীতে চসিক পেয়েছে এক হাজার ৫৫৫ কোটি ৮৮ লাখ ১৪ হাজার টাকা। ত্রাণ খাতে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এক টাকাও আয় হয়নি।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় গৃহকর খাতে : ২০১৯-১৯২০ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পৌরকর বা হোল্ডিং ট্যাঙ খাতে। এক্ষেত্রে বকেয়া ও হাল মিলিয়ে প্রস্তাবিত গৃহকরের পরিমাণ ৩৪৬ কোটি ১৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে হাল গৃহকর ১৪৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং বকেয়া গৃহকর ২০১ কোটি ৮৩ লাখ ১৮ হাজার টাকা। সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী গত অর্থবছরে বকেয়া ও হাল মিলিয়ে গৃহকর আদায় হয়েছে ১৩৩ কোটি ৫৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
অন্যান্য উৎসের আয় খাতগুলো : গৃহকর খাতসহ নিজস্ব উৎসের ৯টি খাতের বিপরীতে প্রস্তাবিত বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৩২ কোটি ২৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। গত অর্থবছরে এসব খাতে আয় হয়েছিল ৪৪৮ কোটি ৭৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
অন্যান্য আয় খাতগুলোর মধ্যে রাস্তা খননসহ ১১টি বিষয়ে ফি হিসেবে ১১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, জরিমানা বাবদ ৫০ লাখ টাকা, সম্পদ হতে অর্জিত ভাড়া খাতে ৯১ কেটি ৫৫ লাখ টাকা, ব্যাংক স্থিতি থেকে ৫ কোটি টাকা, বিবিধ খাতে ২০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং নগর শুল্কের পরিবর্তে সরকারি অনুদানসহ তিন ধরনের ভর্তুকি হিসেবে ২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ফিস বাবদ আয় দেখানো হয় ৯৬ কোটি ২৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এছাড়া জরিমানা ২৫ লাখ টাকা, সম্পদ হতে অর্জিত ভাড়া খাতে ৭০ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ব্যাংক স্থিতি থেকে আড়াই কোটি টাকা, বিবিধ খাতে ১১ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা এবং ভর্তুকি ২০ কোটি ৫ লাখ টাকা আয় হয়েছিল।
মেয়র যা বললেন : বলা হয়, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টি সর্বশেষ যে সমাবর্তন অনুষ্ঠান করে সেখানে চসিকের কোনো প্রতিনিধি ছিল না। বর্তমানে যে বোর্ড অব ট্রাস্টি বোর্ড সেখানে প্রয়াত সাবেক মেয়র মহিউদ্দীন চৌধুরী পরিবারের তিনজন সদস্য রয়েছেন। সিটি কর্পোরেশনের কোনো অস্তিত্ব সেখানে নেই।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, এ বিষয়ে আপনারা (সাংবাদিক) জানেন। আমাদের প্রয়াত নেতা আলহাজ্ব এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী যখন মেয়র হিসেবে বাজেট দিয়েছিলেন, তখন কি উল্লেখ করেছিলেন। প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়টা কার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাজেট দিয়েছেন। ওখানে তো সিটি কর্পোরেশনের মনোগ্রাম ছিল। এটার তো আপনারাই সাক্ষী। এটা যেহেতু বিচারাধীন বিষয়, তাই এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলছি না।
তিনি বলেন, এই নগরে যত স্থাপনা আছে সবগুলোর বিপরীতে প্রত্যেকে ট্যাঙ প্রদান করেন। এটা রাষ্ট্রের আইন। একমাত্র প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় যে ভবনে পরিচালিত হয় তার বিপরীতে সিটি কর্পোরেশন ট্যাঙ নেয়নি। শুরু থেকে আজ অব্দি নেয়নি। কারণ, এটা সিটি কর্পোরেশনের বলেই নেয়নি।
কাজীর দেউড়ি থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত সড়কে লাগানো এলইডি লাইটের অনেকগুলোই নষ্ট। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মেয়র বলেন, পাইলট প্রকল্প হিসেবে এ সড়কে এলইডি লাইট লাগানো হয়েছিল। যারা লাইটগুলো সরবরাহ করেছিল রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হলে তাদের জানাই। তারাই এগুলো বিদেশ থেকে আনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন। এ কারণেই বিভ্রাট দেখা গেলে সারিয়ে তুলতে কিছুটা সময় লাগে।
বাজেট বক্তৃতায় মেয়র বলেন, চট্টগ্রামকে আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তুলতে স্মার্ট সিটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ডিপিপি প্রণয়ন করে মন্ত্রণালয়ে জমা করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রথম স্মার্ট নগর হিসেবে চট্টগ্রাম আত্মপ্রকাশ করবে।
তিনি বলেন, ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬ কিলোমিটার নর্দমা হতে মাটি উত্তোলন ও অপসারণ, ৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৭ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার ও নির্মাণ, ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৬ কিলোমিটার ফুটপাত সংস্কার ও নির্মাণ, ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।
নগরীর আলোকায়নের কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ৪১টি ওয়ার্ডের সকল রাস্তা ও অলিগলিতে স্থিত পিডিবি পোলে এবং নতুন জিআই পোল স্থাপন করে টিউব, এনার্জি, হাইপ্রেসার ও এলইডি বাতি দ্বারা শতভাগ আলোকায়ন কাজ প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত চার বছরে নগরীর প্রতিটি সড়কের পাশে পরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ হাজার ৬শত কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প সিডিএকে অনুমোদন দিয়েছেন, যার বাস্তবায়ন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন সরকারের প্রকল্প সহায়তায় জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হলে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে দৃশ্যমান পরিবর্তন হবে। দৃষ্টিনন্দন হবে আমাদের প্রিয় নগর।

x