চলে গেলেন তিন কৃতী সংস্কৃতিজন

অভাব সহজে পূরণ হওয়ার নয়

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

বৃহস্পতিবার , ২৯ নভেম্বর, ২০১৮ at ১২:২৮ অপরাহ্ণ
7

প্রথমে গেলেন উস্তাদ মিহির নন্দী, তারপর রবীন দে, সবশেষে রণজিৎ রক্ষিত। মিহিরদা আর রবীন দা গানের মানুষ, রণজিৎদা আবৃত্তির; নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন তিনজনই কৃতী। মিহিরদা উচ্চাঙ্গ সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ, ডিএল রায়, পুরাতনী টপ্পা গানে পারদর্শী ছিলেন। সঙ্গীত সাধক ছিলেন তিনি, শুদ্ধ গান গাইতেন। গান শেখাতেন, গানের সংগঠনও করেছেন। আবার ডিসি হিলে পয়লা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তী ইত্যাদি বারোয়ারি অনুষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত থাকতেন। এক সাঙ্গীতিক, সংগীতময় গীতল জীবন ছিলো তাঁর। মিহির নন্দীর জীবনাবসানে চট্টগ্রামের উচ্চাঙ্গ ও রবীন্দ্র সঙ্গীতের জগতে বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়া, মনোরঞ্জন বড়ুয়া, অমিতাভ বড়ুয়া চলে যাওযার পর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ভুবনে লালা ও নন্দী- দুই মিহির ছিলেন। এখন মিহির নন্দীও চলে গেলেন। রইলেন একা এবং একজন মিহির লালা। চট্টগ্রামের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের গুরুভার বইবার দায় এখন তাঁরই।
সুখের কথা, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বরণ বড়ুয়া, মনোরঞ্জন বড়ুয়া, অমিতাভ বড়ুয়া-দের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ধারাকে এগিয়ে নিতে উঠে এসেছেন স্বর্ণময় চক্রবর্তী। তিনি ‘সদারঙ্গ’ নামে একটি সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তার মাধ্যমে মার্গ সঙ্গীতের প্রসারে অনন্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন।
রবীনদা একটি আলোকপ্রাপ্ত পরিবারের সন্তান, যে পরিবার থেকে সৃষ্টি হয়েছেন দেশখ্যাত শিল্পী চন্দ্রশেখর দে, আরেকজন সঙ্গীত শিল্পী রবীন দে, তাঁর ছোট ভাই প্রবাল দে-ও সঙ্গীতপ্রিয়, বোন মায়া-দি শিক্ষক। রবীনদা উদীচীর কর্ণধার-বহু বছর ধরে তিনি উদীচীর লিড সিঙ্গার ছিলেন। রবীনদা মূলত গণসঙ্গীত শিল্পী। সাম্যবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ উদীচীও মূলত উদ্দীপনামূলক সঙ্গীতই পরিবেশন করে। জাগরণী গান গেয়ে জনগণকে দেশাত্মবোধে, মুক্তির মন্ত্রে জাগ্রত করার কাজটি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করে গেছেন রবীনদা।
রণজিৎ রক্ষিতের জন্ম একটি আয়ুর্বেদী চিকিৎসক পরিবারে। তাঁর ঠাকুর্দা শরৎ রক্ষিত ছিলেন একজন বিখ্যাত আয়ুর্বেদ। তাঁর নামে অদ্যাবধি একটি পরিবারিক আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকান আছে সদরঘাটে। রণজিৎদার পিতা যতীন রক্ষিত, মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশে ও পশ্চিমবঙ্গে। মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। তবে যে কারণে যতীন রক্ষিতের নাম ইতিহাসে সামান্য হলেও জায়গা করে নেবে সেটি হলো দেশভাগ। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের পূর্বে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চলেছিলো, যার মূল কথা ছিলো চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চল, যে অঞ্চলের অধিবাসীরা পাকিস্তান বা ভারতের নাগরিক না হয়ে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে চায়। তা না হলে তারা ভারতের সঙ্গে যাবে, কিন্তু কিছুতেই পাকিস্তানের সঙ্গে না। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা একটি মানচিত্রও তৈরি করেছিলেন। এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁর নাম এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি, তিনি হচ্ছেন নেলী সেনগুপ্তা। এই ইংরেজ দুহিতা বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়তে যাওয়া চট্টগ্রামের সুসন্তান জেএম সেনগুপ্তকে ভালোবেসে তাঁর ঘরণী হয়ে চট্টগ্রামে চলে এসেছিলেন এবং স্বামীর রাজনৈতিক আদর্শকে স্বীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন। নেলী সেনগুপ্তা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতিও হয়েছিলেন। তিনি দেশবিভাগের পরেও কিছুদিন চট্টগামে ছিলেন।
যাই হোক, উপর্যুক্ত পরিকল্পনা নিয়ে বাউন্ডারি কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য তিনি যতীন রক্ষিতকে দিল্লি পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন। যতীন রক্ষিত দিল্লি গিয়েছিলেন, কিন্তু তখন শেষ মুহূর্ত, ভারতকে দুটি দেশে ভাগ করে দিয়ে চলে যাবার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছিলো ব্রিটিশ রাজ। ফলে যতীন রক্ষিতকে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিলো। ওদিকে রাঙামাটির রাজাও ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হলেও ১৬ আগস্ট পর্যন্ত রাঙামাটিতে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন নি। যতীন রক্ষিতের মিশনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি।
মিহির নন্দী

মিহির কুমার নন্দী সাতকানিয়া থানার কেঁওচিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ফণীন্দ্র লাল নন্দী। মিহির নন্দী বি, সি, আই, সি, শাখা চট্টগ্রামের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। রবীন্দ্র সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র ‘আনন্দধ্বনি’র প্রশিক্ষক ছিলেন তিনি। মিহির নন্দী সংগীতে তালিম পেয়েছেন ওয়াহিদুল হক ও আচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদারের নিকট থেকে। তাছাড়া উচ্চাঙ্গ সংগীতে বছরাধিক উস্তাদ নিরোদ বরণ বড়ুয়ার কাছে, প্রয়াত সৌরিন্দ্রলাল দাশগুপ্তের (চুলুবাবু)’র কাছে পাঁচ বছর ধ্রুপদ ও খেয়ালে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
মিহির নন্দী স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্রের একজন নির্ভীক কণ্ঠ সৈনিক। ১৯৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে চলে যান। সেখানে তিনি বাংলাদেশের শিল্পীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী সংসদ’-এর উদ্দীপনামূলক সংগীত পরিবেশন করেন। তাছাড়া বাংলাদেশ-এর স্বাধীনতার স্বপক্ষে প্রচারাভিযানের জন্যে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে সংগীত পরিবেশন করেন।
শিল্পী মিহির নন্দী মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী সংসদের মাধ্যমে কলকাতায় এইচ.এম.ভি. কোম্পানিতে স্বদেশ পর্যায়ের ৮টি (সম্মেলক) রবীন্দ্র সংগীত রেকর্ড করেন, অনুষ্ঠানটির পরিচালনায় ছিলেন সংগীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হক।
মিহির নন্দী চট্টগ্রাম বেতারের অডিশন বোর্ডের সদস্য ও ‘ক’ বিশেষ শ্রেণীর সংগীত পরিচালক ছিলেন। ‘ক’ বিশেষ শ্রেণীর উচ্চাঙ্গ সংগীত পরিবেশন করতেন। রবীন্দ্র সংগীত ও উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পী হিসেবে চট্টগ্রাম টেলিভিশনে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
মিহির নন্দী ১৯৮০ সালে রবীন্দ্র সংগীত শিক্ষক হিসেবে কলকাতায় অনুষ্ঠিত “সুরঙ্গমা” কর্তৃক আয়োজিত রবীন্দ্র সংগীত শিক্ষক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলন পরিষদের চট্টগ্রাম শাখার কার্যকরী সংসদের সহ-সভাপতি ছিলেন।
রবীন দে

শিল্পী রবীন দে সম্পর্কে সাংবাদিক ও লেখক সুভাষ দে লিখেছেন : চট্টগ্রামের গণসংগীতের ভুবন গত ৪ দশক ধরে আলোকিত ও সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। গড়ে তুলেছেন কিশোর-তরুণ গণসংস্কৃতি কর্মীদের। তিনি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী চট্টগ্রাম জেলা সংসদের সহ-সভাপতি, খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরীর সহ-সভাপতি ও খেলাঘর চট্টগ্রাম মহানগরীর সংগীত স্কুল ‘শৈশব’ এর অধ্যক্ষ। প্রবর্তক বিদ্যাপীঠ এর শিল্পীদের গণসংগীত ও দেশাত্মবোধক গান শিখিয়েছেন প্রায় ৩ দশক ধরে। তিনি পতেঙ্গা শিল্পাঞ্চলে জেনারেল ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্ট (জি ই এম প্লান্ট) যেখানে চাকরি করতেন সেখানে দক্ষ ট্রেড ইউনিয়ন নেতারূপে পরিচিতি ও সম্মান লাভ করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ও নেতা হিসেবে তিনি সমাজ পরিবর্তনের একনিষ্ঠ সৈনিক ছিলেন। তার ট্রেড ইউনিয়ন এর কাজ, সংগীত সাধনা একই লক্ষ্যে নিবেদিত ছিল।
উদীচীর প্রধান ধারা গণসংগীত, সেটি রবীনের হাতে প্রাণ পেয়েছে, বিপুল আবেগ, শ্রম, মেধা আর সতেজতা নিয়ে তিনি এর সাথে জড়িয়ে ছিলেন; সংগীতের যে ব্যাকরণ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা, সেটি অর্জন করেছেন μমাগত অনুশীলন আর তার অগ্রজ শিল্পী পণ্ডিতদের কাছ থেকে, তাদের সাহচর্যে থেকে নিজেকে শাণিত করেছেন।
এক্ষেত্রে আমাদের মিহির নন্দী ছিলেন তার পথপ্রদর্শক। রবীন তার যোগ্য শিষ্য হয়ে উঠতে পেরেছেন। মিহির তাকে ধরিয়ে দিতেন আর ঘন্টার পর ঘন্টা উদীচীর একেবারে আনকোরা ছেলেমেয়েদের নিয়ে মহড়ায় মেতে থাকতেন। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তিনি এ কাজটি করেছেন। গণসংগীতে প্রাণ সঞ্চার করেছেন তিনি, উদীচীর কিশোর-তরুণদের তিনি খুবই প্রিয় ছিলেন।
উদীচীর গণসংগীতের যে স্কোয়াড শহরের শিল্পাঞ্চল, গ্রামের কৃষক সভা কিংবা জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে যেতো, তার নেতৃত্ব দিয়েছেন রবীন। গণসংগীতের যে সঞ্জীবনী আর লোকসংলগ্নতা সেটি পুষ্ট হয়েছে তার হাতে। নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন সংস্কৃতির সাধনায়, উদীচীকে প্রতিষ্ঠা আর বিকশিত করতে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামে গণসংগীতে জনপ্রিয় টিম উদীচী।
তেজেন সেন, হরি পাল, রুনু বিশ্বাস, অচিন্ত্য চμবর্তী প্রমুখ যারা চট্টগ্রামে আইপিটিএ এর সাথে যুক্ত ছিলেন তারা বাংলায় গণসংগীতের-গণনৃত্যের শিল্পী হিসেবে পরিচিত পেয়েছেন। চট্টগ্রামে তাদের ঐতিহ্য বহন করেছেন রবীন। একক নয়, যৌথভাবে গণসংগীতের আবেদন শ্রমিক-কৃষকের অন্তরলোকে পৌঁছিয়ে দিতে প্রয়াস ছিল তার। মানুষকে শোষণ থেকে মুক্তি দিতে, আমাদের সমাজের বৈষম্য, অসঙ্গতি, মানুষের দুঃখ-বেদনার যে মর্মবাণী গণসংগীতে ফুটে উঠে তার পিছনে মার্কসবাদের বিশ্ব বীক্ষা রবীন চিনে নিয়েছেন।
রবীন দে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ছিলেন, পরে পার্টির সংগঠক ও নেতায় পরিণত হন। সত্তর দশকে সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট দেখতেন কমরেড মাহবুবুল হক, পতেঙ্গা এলাকায় পার্টির জেলা কমিটি থেকে কমরেড আব্দুল আউয়াল ও পরে কমরেড বালাগাত উল্লাহ শ্রমিক আন্দোলন ও পার্টির কাজ দেখাশুনা করতেন।
উদীচীতে তার সাফল্যের প্রেরণা ছিলেন মৃদুল সেন। পতেঙ্গায় শ্রমিক কর্মচারীদের ছেলে- মেয়েদের গান শেখাতে রবীন গানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঐ এলাকায় ‘পূর্বাচল পাঠাগার’ এর সাথেও তিনি যুক্ত ছিলেন। জি ই এম প্লান্ট, স্টিল মিল, ইস্টার্ন রিফাইনারী, ইস্টানর্ ক্যাবল শিল্পাঞ্চলে তার জনপ্রিয়তা ছিল ঈর্ষণীয়। তার ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনা ও শ্রমিক সংগঠনে কাজ থেকে আজকের শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীরা অনেক কিছুই শিখতে পারেন।
রণজিৎ রক্ষিত

আশির দশকের মাঝামাঝি সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে এসে আমি যখন সম্পূর্ণরূপে সংস্কৃতি চর্চায় মগ্ন হয়ে যাই। তখনই কোন এক সময় রণজিৎদার সঙ্গে আমার পরিচয় ও নিবিড় যোগাযোগ স্থাপিত হয়। নব্বই দশকের গোড়ায় চট্টল ইয়থ কয়ারের উদ্যোগে মুসলিম হল প্রাঙ্গণে আয়োজিত ‘একুশ মেলা’ আমাকে আকর্ষণ করে। একুশ মেলা আসলে বইমেলা, একুশে ফেব্রুয়ারিকে উপলক্ষে করে আয়োজন করার কারণে ‘একুশ মেলা’ নামকরণ। পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে মেলা চলতো। মেলার পরিসর বাড়তে বাড়তে মুসলিম হল প্রাঙ্গণও অপর্যাপ্ত হয়ে যাওয়ায় শহীদ মিনারের সম্মুখভাগেও মেলা সম্প্রসারণ করতে হয়। চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের একটা মিলনমেলা হয়ে উঠেছিলা একুশ মেলা। সকাল থেকে মধ্যরাত অব্দি গমগম করতো মানুষ। একুশ মেলার দুর্নিবার আকর্ষণে লেখক, প্রকাশক, পুস্তক বিক্রেতা, পাঠক, সঙ্গীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, অভিনয় শিল্পী, নৃত্যশিল্পী, আবৃত্তি শিল্পী- প্রত্যেকেই সন্ধ্যা হতে না হতে গুটি গুটি পায়ে হাজির হয়ে যেতেন মুসলিম হল মাঠের সাংস্কৃতিক তীর্থে। মৃণাল সরকার, রণজিৎ রক্ষিত, অঞ্চল চৌধুরী, পঞ্চানন চৌধুরী, আবদুল হালিম দোভাষ, ইন্দিরা চৌধুরী, তপন চৌধুরী, কুমার প্রীতিশ বল, মিলি চৌধুরী, রাশেদ হাসান-চট্টগ্রামের আবৃত্তি জগতের এসব প্রাণের মানুষেরও এক অপরিহার্য গন্তব্য ছিলো একুশ মেলা। একুশ মেলায় একবছর আমি মুসলিম হলের প্রবেশ পথে লম্বালম্বি কার্পেট বিছিয়ে বসন্তোৎসবের আয়োজন করেছিলাম। নৃত্যগীতআবৃত্তির নৈবেদ্য সাজিয়ে ঋতুরাজের চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের সেই মনোরম সন্ধ্যাটি উপভোগ করতে সেখানে আমাদের সঙ্গে রণজিৎদাও হাজির ছিলেন। সেই প্রথম এবং শেষ বসন্তোৎসব।
তবে একুশ মেলা চালু ছিলো। একুশ মেলা পরে ডিসি চলে আসে। ডিসি হিলেও বসন্তোৎসব আয়োজনের চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে এক বছর রণজিৎদা আমাকে ১৩,১৪ ফেব্রুয়ারি দু’দিন একুশ মেলার আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ জানালেন। কেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তাঁরা বোধনের পক্ষ থেকে ডিসি হিলে ঐ দু’দিন বসন্তোৎসব আয়োজনের কথা ভেবেছেন। তাঁরা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। প্রশাসন তাদেরকে বলেছেন মাঠ এক মাসের জন্য একুশ মেলাকে লিজ দেয়া হয়েছে। আপনারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এরপর রণজিৎদা আমার কাছে আসেন। আমি সানন্দে দু’দিনের জন্য বোধনকে মাঠ ছেড়ে দিই। কারণ বোধন তো আমাদের কাজই করছে। বসন্তোৎসবের প্রবর্তক তো আমরাই।
রণজিৎ রক্ষিত এর জন্ম ১৯৪৮ সালে ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম শহরে রূপায়ন ক্লাব এবং গ্রামে বান্ধব পাঠাগারের প্রতিটি অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি সংস্কৃতি চর্চায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৬২ সালে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে জড়িত হন।
১৯৬৫-তে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে পুলিশের নির্মম নির্যাতন ও কারাবরণ, ১৯৬৭তে বেতারে এবং স্বাধীনতার পরে টেলিভিশনে নিয়মিত অংশ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজকে গড়ে তোলেন। স্বাধীনতার পর পর উদীচীর মাধ্যমে গণমানুষের সঙ্গে কাজ করে তিনি ‘গণায়ন’ ও ‘নান্দীকার’ এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের একজন হিসাবে প্রচুর নাটক করেন। বাংলাদেশের প্রথম পথ নাটকেও তিনি কাজ করেন।
সমাজের বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর অক্লান্ত কাজ করার অন্যতম প্রয়াস ‘খেলাঘর আন্দোলন’। তিনি মহানগরী খেলাঘরের সহ-সভাপতি হিসাবে অনেক বছর সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৮৭ সালে ‘বোধন’ আবৃত্তি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসাবে তিনি বাংলাদেশের আবৃত্তি আন্দোলনে যুক্ত হন। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান নির্বাহী হিসাবে প্রতিষ্ঠানকে দেশের অন্যতম হিসেবে পরিণত করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তিনি পর পর ৪ বার বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতি মন্ডলীর সদস্যপদ লাভ করেন। ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম শিশু আবৃত্তি উৎসবে তিনি সভাপতির আসন অলংকৃত করেন।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘বোধন’ আবৃত্তি স্কুলের অধ্যক্ষ হিসাবে তিনি বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসাবে ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম সহায়ক সমিতি’র ব্যানারে মিজোরাম, আসাম ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন ক্যাম্পে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।
বিগত দিনে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে, গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় জনতার মঞ্চে, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মঞ্চে শহীদ মিনারে আবৃত্তিকে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
দেশ ও দেশের বাইরে আবৃত্তিকার হিসাবে তিনি নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। চট্টগ্রামে রামকৃষ্ণ মিশনের আজীবন সদস্যপদ ছাড়াও তিনি অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করছেন। চট্টগ্রামে পর পর ৩টি বিজ্ঞান মেলার সদস্য সচিব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক।

x