চলছে কালুরঘাট বাস সার্ভিস পানসে, বাসী, লক্কর ঝক্কর

আয়শা আদৃতা

বৃহস্পতিবার , ২৯ মার্চ, ২০১৮ at ৪:৪৬ পূর্বাহ্ণ
60

এক সময় চট্টগ্রামে আন্দরকিল্লা থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কিছু বাস সার্ভিস চালু ছিল। এসব সার্ভিস এতটাই লক্কর ঝক্কর মার্কা ছিল যে, যাত্রীরা এটাকে মুড়ির টিন নামেই অভিহিত করত। চট্টগ্রামের যে কোনো মানুষ মুড়ির টিন বললেই বুঝে নিত, কালুরঘাট বাস সার্ভিসের কথাই বলা হচ্ছে। হাজার লেখালেখি করেও উন্নতি করা যায় নি সে সার্ভিসের। ফলে একটা সময় নির্ধারিত করুণ পরিণতিই বরণ করতে হল এ সার্ভিসকে। বাধ্য হল ব্যবসা গুটিয়ে নিতে। কালের পরিক্রমায় কষ্টকর সে যাত্রাকালকেও মানুষ ভুলে গেল। আর এটাই প্রকৃতির নিয়ম। মানুষ সবসময় তার কষ্টকালকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে। আমাদের আশঙ্কা যে, কালুরঘাট বাস সার্ভিসের মত চট্টগ্রামের মানুষ একসময় বিটিভি চট্টগ্রাম নামে যে একটা চ্যানেল আছে, সেটিকে ভুলে থাকতে চাইবে। বিরক্তিকর অনুষ্ঠান আর মানহীন, যাচ্ছেতাই অনুষ্ঠানের এ স্মৃতিকাল যতটা ভুলে থাকা যায় ততই মঙ্গল।

বছরের পর বছর একই অনুষ্ঠান চলছে, দর্শক পছন্দ করুক আর নাই করুক, অনুষ্ঠান ‘অনুষ্ঠান’ হয়ে ওঠুক আর না ওঠুক, তাতে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যাথা আছে বলে মনেই হচ্ছে না। যে অনষ্ঠানগুলো চলছে কয়েক বছর ধরে, একই স্টাইলে, একই ‘সৃজনশীল চিন্তায়’। যেসব অনুষ্ঠানের কথা অসংখ্যবার বলা হয়েছে এ আলোচনায়।

ধরা যাক, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীদের অনুষ্ঠান পাহাড়ি মন অনুষ্ঠানের কথা। আমি যদি ধরেই নিই যে, কোনো একজন দর্শক এ অনুষ্ঠানটি নিয়মিত দেখেন, তাহলে তিনি দুয়েক পর্ব দেখার পর পরের পর্বে আর নতুন কী পাবে? যাতে করে তিনি একই অনুষ্ঠানের নতুন আরেকটি পর্ব দেখতে উদ্বুদ্ধ হবেন? প্রতি পর্বে সেই একই তো নাচের সমাহার, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই গানের সাথে নাচ, উপজাতি ভাষায় দুয়েকটি গান ণ্ডএই তো অনুষ্ঠানের মূল উপজীব্য। এসব অনুষ্ঠান বড়জোড় এক কিংবা দুইবার ভালো লাগতে পারে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কিংবা মাসের পর মাস নিশ্চয় নয়। সেখানে বছরের পর বছর একই চিন্তা ভাবনার অনুষ্ঠান দর্শকদের কি পরিমাণ বিরক্ত করে তুলছে তাও ভাবনা চিন্তার অবকাশ নেই কর্তৃপক্ষের। ‘চলছে গাড়ি যাত্রাবাড়ি’ স্টাইলেই যেন চলছে সবকিছু।

বলা যেতে পারে সাহিত্যে নারী অনুষ্ঠানটিরও কথা। এ অনুষ্ঠানে যে উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করা হয় সে উপন্যাসের কাহিনী উপজীব্য করে নির্মিত চলচ্চিত্রের ফুটেজ দেখানো হয়। (অথবা বলা যায়, যেসব উপন্যাসের কাহিনি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, শুধুমাত্র সেসব উপন্যাসকেই আলোচনার বিষয়বস্তু করা হয়)। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে চলচ্চিত্রের ফুটেজ আলোচনাকে শ্রবণযোগ্য করে তুলতে এবং বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলে নিঃসন্দেহে। কিন্তু আলোচনার মিনিটে মিনিটে যদি চলচ্চিত্রের ‘কাট পিস’ ঢুকিয়ে দেওয়াটা আলোচনার ধারাবাহিকতাকে নষ্ট করে। আলোচনার প্রসঙ্গ শেষ হওয়ার আগেই ভিডিও ফুটেজে চলে যাওয়াটা আলোচক এবং দর্শক উভয়ের জন্যই বিভ্রান্তিকর।

শুধু এ দুটি অনুষ্ঠানটিই নয়, তথ্য অধিকার, স্বাস্থ্য তথ্য, সুষম খাবার প্রতিদিন, অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠান আমাদের সন্তান, অর্থনীতি বিষয়ক অনুষ্ঠান বাণিজ্যে চট্টগ্রাম, ইউনিয়ন পরিচিতমূলক অনুষ্ঠান ইউনিয়ন পরিক্রমা, রান্না বিষয়ক অনুষ্ঠান ঘরোয়া, শুদ্ধাচার, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা, সাহিত্যে নারী ণ্ডএরকম আরো অনেক অনুষ্ঠানও দিনকে দিন একই রকমভাবে চলার কারণে পানসে হয়ে ওঠছে। এসব অনুষ্ঠানের নির্মাতা, প্রযোজক, উপস্থাপক সবাইকে আরো ভাবতে হবে, কি করে এসব অনুষ্ঠানকে দর্শকের কাছে পৌঁছানো যায়। যদি সত্যিকার অর্থে সে আন্তরিকতা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা থাকে তবে এসব অনুষ্ঠানও হয়তো দর্শক দেখবে। নয়তো বছরের পর বছর ধরে অনুষ্ঠানের পর অনুষ্ঠান বানিয়েই যাবেন, সেসব অনুষ্ঠান দর্শকের দোড়গোড়ায় পৌঁছাবে না। এবং সব শেষে কিছু পণ্ডশ্রম ছাড়া হিসেবের খাতায় আর কিছুই মিলবে না। আর তারও পরে বিটিভি চট্টগ্রাম এক সময় কালুরঘাট বাস সার্ভিসের খাতায় নাম লেখাবে। সেটি যেন কোনভাইে না হয়, ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষকে এখনই বিষয়টি নিয়ে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

এই বিরক্তির মাঝে হঠাৎ হঠাৎ আলো হয়ে আসে দুয়েকটি অনুষ্ঠান। চলতি সপ্তাহে সেরকমই একটি অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন অভিনেতা আফজাল হোসেন এবং সুবর্ণা মোস্তফা। এক সময়ে বাংলাদেশের জনপ্রিয় এ টেলিভিশন জুটি সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে চট্টগ্রাম আসেন। সে সুযোগে বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে কামরুল হাসান বাদলের সাথে আলাপচারিতায় অংশ নেন এ দুজন। আলাপে তাঁরা নিজেদের অভিনয় জীবনের কথা, বর্তমানের নাটক আর শিল্পীদের নিয়েও মূল্যায়ন করেন। সুন্দর এ অনুষ্ঠানটিও সঠিক সম্পাদনার অভাবে কিছুটা দৃষ্টিকটূ মনে হয়েছে। ক্যামেরার সামনে উপস্থাপক এবং অতিথিদের ‘অপ্রয়োজনীয়আন অফিসিয়াল লুকিং’ কাট করা যেত। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে সচেতন দৃষ্টি রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ।

x