চমেক হাসপাতালে চালু হল ম্যামোগ্রাফি সেবা

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৫:৩২ পূর্বাহ্ণ
240

ডিজিটাল ম্যামোগ্রাফি মেশিনের বহু প্রতীক্ষিত সেবা অবশেষে চালু হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে গতকাল মেশিনটির সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। নারীর স্তনে টিউমারক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয় এই অত্যাধুনিক যন্ত্র। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর গতকাল থেকে পুরোদমে মেশিনটির সেবা চালু হয়েছে। একই সাথে কার্ডিওলজি (হৃদরোগ) বিভাগে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবায় তিন শয্যার আলাদা মুক্তিযোদ্ধা ব্লক (কিউবিকল) উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর নামে ব্লকটির নামকরণ করা হয়েছে। ব্লকটি উদ্বোধনের সময় চট্টগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাহাব উদ্দিন ও মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মোজাফফর আহমদসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ক্যান্সার (রেডিওথেরাপি) ওয়ার্ডে ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি মেশিন স্থাপনের লক্ষ্যে বাংকারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন সিটি মেয়র। এরপর সেবা চালুর অপেক্ষায় থাকা ক্যান্সারের চিকিৎসায় বহু প্রতীক্ষিত রেডিওথেরাপি (কোবাল্ট সিঙটি) মেশিনটিও পরিদর্শন করেন তিনি। এসময় চমেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন, বিএমএ চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান, সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সল ইকবাল চৌধুরীসহ বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। পরে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সভাপতিত্বে হাসপাতালের সম্মেলন কক্ষে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বীর সঞ্চালনায় সভায় সিটি মেয়র বলেন, চিকিৎসকদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। চমেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স নেই। কিন্তু ১৩শ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে কম হলেও তিন হাজার। এটাই বাস্তবতা। এরপরও চিকিৎসকেরা সাধ্যমতো চিকিৎসাসেবা দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। মাঝেমধ্যে চিকিৎসকদের কিছু কিছু ভুল ত্রুটি হতেও পারে। এ জন্য চিকিৎসকদের ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। রোগীরা গরম হলেও আপনাদের শান্ত থাকতে হবে। সেবার মনমানসিকতা নিয়ে স্ব স্ব দায়িত্ব পালনের জন্য চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের কর্মকর্তাকর্মচারীদেরকে প্রতি আহ্বান জানান মেয়র।

ম্যামোগ্রাফি মেশিনের সেবা উদ্বোধন প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, মহিলা রোগীদের মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ স্তন এবং জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত। নারীদের স্তনে টিউমার ও ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ে এখন থেকে ডিজিটাল এ মেশিনটির সেবা পাওয়া যাবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটাই স্তন ক্যান্সার পরীক্ষার অত্যাধুনিক যন্ত্র উল্লেখ করে মেয়র বলেনবর্তমান সরকারের আন্তরিকতা ও স্বদিচ্ছার প্রতিফলন হিসেবেই এই রোগ নির্ণয় যন্ত্র চমেক হাসপাতালে সংযুক্ত হলো। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিশাল সংখ্যক গরীব রোগীর চিকিৎসা সেবায় অপরিহার্য ভূমিকা রাখবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন সিটি মেয়র।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রাইফার মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, এটি দুঃখজনক ঘটনা। ঘটনাটি নিয়ে আমাদের দুই পেশাজীবী সমাজ মুখোমুখি অবস্থানে। কিন্তু সাংবাদিকরা কখনো চিকিৎসকদের প্রতিপক্ষ নন। আবার চিকিৎসকরাও সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ নন। এই বিষয়টি সবাইকে বুঝতে হবে। এটি যত দ্রুত সবাই উপলব্ধি করতে পারেন, ততই আমাদের সকলের জন্য মঙ্গল।

চমেক হাসপাতাল পরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, আজ ডিজিটাল ম্যামোগ্রাফির সেবা চালু হলো। কিছুদিনের মধ্যে ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি (কোবাল্ট সিঙটি) মেশিনটিও চালু হবে। বাংকারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলো। এটি নির্মাণের কাজ শেষ হলেই সেখানে ব্র্যাকিথেরাপি সেবাও চালু হবে। অত্যাধুনিক এসব মেশিন চমেক হাসপাতালে গরীব রোগীদের চিকিৎসা সেবায় নতুন মাত্রা যোগ করছে।

এছাড়া হাসপাতালে আরও সাড়ে ১৬ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম শিগগরই যুক্ত হবে। এর মধ্যে অত্যাধুনিক সিটি স্ক্যান ও আইসিইউর বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও থাকছে। এগুলো যুক্ত হলে হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবায় আসবে আমূল পরিবর্তন। এই পরিবর্তনে অংশীদার হিসেবে সিটি মেয়র, চিকিৎসক নেতা ও হাসপাতালের চিকিৎসকনার্স, কর্মকর্তাকর্মচারির প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন।

সভায় অন্যান্যের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক অশোক কুমার দত্ত, চট্টগ্রাম জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সাহাব উদ্দিন, নগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. মোজাফফর আহমদ, বিএমএ চট্টগ্রামের সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খান, সাধারণ সম্পাদক ফয়সল ইকবাল চৌধুরী, হৃদরোগ বিভাগের প্রধান ডা. প্রবীর কুমার দাশ, রেডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. সুভাষ মজুমদার, রেডিওথেরাপী বিভাগের প্রধান ডা. সাজ্জাদ মো. ইউসুফ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

সভায় চমেক হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকনার্স ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ম্যামোগ্রাফি মেশিনের সেবা : চিকিৎসকরা বলছেন, মহিলাদের স্তনে যে কোন ধরনের টিউমার নির্ণয়ে ও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে স্তনের ক্যান্সার নির্ণয়ে ম্যামোগ্রাফ করা হয়। এছাড়াও ৩৫ বছরের উর্ধ্বে প্রত্যেক নারীর স্তনের পরীক্ষায় এই ম্যামোগ্রাফ স্ক্রিনিং করা উচিত। ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়া প্রত্যেক নারীর (সাধারণত ৫০ বছর বয়সের পর) যারা হরমোন থেরাপি নিয়ে থাকেন, তাদের বছরে অন্তত একবার হলেও অবশ্যই ম্যামোগ্রাফ করা উচিত। পাশাপাশি নিজেরা স্তন পরীক্ষা করে কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে বা মনে হলে নারীদের এই ম্যামোগ্রাফ করানো উচিত। তবে এই মেশিন থেকে রেডিয়েশন (তেজস্ক্রিয়তা) বের হওয়ায় গর্ভবতী নারীদের এই ম্যামোগ্রাফ (টেস্ট) করা উচিত নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চমেক হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের তথ্যমতে, রেডিওলজি বিভাগে সিঙ্গেল (একটি) স্তনের ম্যামোগ্রাফ টেস্টে ৪০০ টাকা এবং ডাবল (দুটি) স্তনের টেস্টে ফি ৮০০ টাকার বেশি নয়। কিন্তু প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে এই টেস্ট ফি সিঙ্গেল টেস্টে দেড় হাজার এবং ডাবল স্তন টেস্টে তিন হাজার টাকার কম নয় বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। উল্লেখ্য, হাসপাতালে পৌঁছানোর প্রায় দেড় বছরের মাথায় অবশেষে মেশিনটির সেবা চালু হলো।

x