চবি আবৃত্তি মঞ্চের নবম আবৃত্তি উৎসব

মাহবুব এ রহমান

বৃহস্পতিবার , ৮ আগস্ট, ২০১৯ at ৪:২৫ পূর্বাহ্ণ
37

ইংরেজি বছর ক্যালেন্ডারের ২৪ জুলাই। শ্রাবণের স্নিগ্ধ সকাল। মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে পুবের আকাশ রাঙিয়ে জেগেছে অরুণ। কবিগুরুর ভাষায় বর্ষাকালে ‘বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর’। কিন্তু বর্ষার সেই সকালে বাদলের ধারাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পৃথিবীকে আলোকিত করে পুব আকাশে হেসে ওঠে সূর্যিমামা। ঘড়ির কাটা তখন সকাল ৯ টার ঘরে। একদল উদ্যমী তারুণ্যের পদভারে প্রাণোচ্ছল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদ প্রাঙ্গণ। চারিদিকে কেমন উৎসবমুখর পরিবেশ। গোলাপি শাড়ি আর লাল-নীল পাঞ্জাবিতে সজ্জিত সবাই। আজ সেই বহুলাকাঙ্ক্ষিত উৎসব। আবৃত্তি উৎসব। দীর্ঘ ১ মাসের প্রাণবন্ত আর ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টার ফসল আজকের এই দিন। ‘পতিত মানবতায় কবিতা আবাদ’ এই স্লোগানকে ধারণ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় আবৃত্তি সংগঠন ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চের নবম আবৃত্তি উৎসব।
সকাল সাড়ে দশটা বাজতেই বেজে উঠে উৎসবের সুর। সমাজবিজ্ঞান মিলনায়তন থেকে একে একে সবাই বেরিয়ে আসেন। ইতোমধ্যে এসে উপস্থিত উৎসবের প্রধান দুই আকর্ষণ প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন এবং নন্দিত অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। শুরু হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। রঙিন প্ল্যাকার্ড হাতে জয় বাংলা চত্বর অভিমুখে এগিয়ে চলে গোলাপি আর লাল-নীলের মিছিল। শহিদ মিনার, জয় বাংলা চত্বর আর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার মোড় ঘুরে এসে সে মানবঢেউ থামে উৎসবস্থলে। মঞ্চের উপদেষ্টা জেবুন নাহার শারমিন ও সহ-সভাপতি উম্মে শাকিলা নুর ইফফাত এর উপস্থাপনায় শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। মঞ্চে উঠেন আবৃত্তি মঞ্চের প্রধান উপদেষ্টা মাছুম আহমেদ। সাথে সাথে মঞ্চে উঠেন সেলিনা হোসেন এবং জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। মঞ্চের পেছন থেকে সুইচ অন হয় মাইকের। ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানের সুরে মঞ্চে জ্বলে ওঠে মঙ্গল প্রদীপ। ২ দিনব্যাপী এ উৎসবের উদ্বোধক কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ডায়াসে দাঁড়ালে পর্দা উঠে উৎসবের। ধীর পায়ে গিয়ে ডায়াসে দাঁড়ান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ আরিফ। স্বাগত বক্তব্য দেন। শুরু হয় উৎসবের মূল আয়োজন। ততক্ষণে উৎসবস্থলে এসে হাজির প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি যথাক্রমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ ডিন অধ্যাপক ড. সেকান্দর চৌধুরী।
অতিথিদের উপস্থিতিতে উৎসব স্মারক ‘কালান্তক’ -এর মোড়ক উন্মোচন করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। এর পর পরই শুরু হয় অতিথিদের বক্তব্যের পালা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার বলেন,‘যা কিছু অপশক্তি আছে তাকে আমরা রোধ করব সাংস্কৃতিক বলয় দিয়ে। সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করতে হলে সুন্দর কিছু উচ্চারণ করতে হবে। সুন্দরকে মাথায় ধারণ করতে হবে। প্রদীপ্ত বিশ্বাসে পৃথিবীতে পথ চলা উচিত। সুকুমারবৃত্তি ছাড়া অপশক্তিকে মোকাবেলা করতে পারব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাংস্কৃতিক কর্মীরা মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে এক হয়ে লড়েছে সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে। তাঁদের কণ্ঠে বিজয়ের গান, নতুন জীবনের গান আমাদের অনুপ্রেরিত করে। ’ বক্তব্যে সেলিনা হোসেন বলেন, “কবিতার অনেক পঙক্তি, অনেক অংশ আমাদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়ে থাকে যার মধ্য দিয়ে আমরা শাশ্বত সুন্দরকে লালন করি। আমাদের নান্দনিক সাংস্কৃতিক বোধকে পরিশুদ্ধ করার একটি দিক হচ্ছে কবিতা। যারা কবিতা চর্চা করে, আবৃত্তি চর্চা করে তাদের মধ্যে অশুদ্ধতা নেই।”
সবাই বক্তব্য শেষ হলে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি মঞ্চ সম্মাননা-২০১৯’ এর জন্য মনোনীত কথাশিল্পীর হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন আবৃত্তি মঞ্চ পরিবার। এবং আবৃত্তি মঞ্চ আয়োজিত একক আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরষ্কার ও দ্বাবিংশ আবর্তনের সম্মানিত প্রশিক্ষকদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন অতিথিবৃন্দ।
ঠিক তখনই মঞ্চে উঠে দ্বাবিংশ আবর্তনের নবীনদের বৃন্দ পরিবেশনা ‘পালকির গান’। ছন্দের তালে তালে যেনো নেচে উঠেছিল পুরো মিলনায়তন। বৃন্দ পরিবেশন শেষে শুরু হয় আবৃত্তি মঞ্চের শিল্পীদের একক পরিবেশনা ‘জয় হোক মানবতার’। কবিদের কবিতা পাঠ পর্বে উপস্থিত ছিলেন, কবি ইউসুফ মুহাম্মদ, আশীষ সেন সহ আরো অনেকে। আবৃত্তিকার হিসেবে মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন ফারুক তাহের, মুজাহিদুল ইসলাম এবং রাশেদ হাসান । সবশেষে আবৃত্তি নিয়ে মঞ্চে উঠেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পরিবেশনার মধ্যদিয়ে শেষ হয় উৎসবের প্রথম দিনের কার্যক্রম।
২৫ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সকাল সাড়ে ১০ টায় আবৃত্তি মঞ্চের উপদেষ্টা কণা দাশ ও সিনিয়র সদস্য শিবা বড়ুয়া চৌধুরীর সঞ্চালনায় এবং প্রধান উপদেষ্টা মাছুম আহমেদের সভাপতিত্বে শুরু হয় উৎসবের ২য় দিনের কার্যক্রম। শুরুতেই আশীর্বচন পর্বে অংশ নেন ডালিয়া আহমেদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য, ড. কুন্তল বড়ুয়া, অসীম দাশ, ড. প্রকাশ দাশগুপ্ত, সুবীর মহাজন, সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং রানা ঠাকুর। সাড়ে ১১ টায় দ্বাবিংশ আবর্তনের প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে সনদ বিতরণ শেষে শুরু হয় আবৃত্তি মঞ্চ শিল্পীদের বৃন্দ পরিবেশনা ‘বোধন’; কথিকা ‘তোতা কাহিনী’ ও প্রযোজনা ‘অসজ্ঞায়িত প্রেম’।
ফাঁকে ফাঁকে চলে উৎসবে আমন্ত্রিত বন্ধুসংগঠন উচ্চারক আবৃত্তি কুঞ্জ; বোধন আবৃত্তি পরিষদ; রঁদেভু; অঙ্গন,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; উত্তরায়ণ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; প্রথম আলো বন্ধুসভা, চবি এর আবৃত্তি, পুঁথিপাঠ, গান ও নৃত্য পরিবেশনা। পাশাপাশি আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী জেবুন নাহার শারমিন, শুভাশীষ শুভ, প্রণব চৌধুরী, মিলি চৌধুরী। কবিতা পাঠ করেন তরুণ কবি মাধব দীপ, আজিজ কাজল, মনিরুল মনির, আখতারী ইসলাম এবং স্বপন চৌধুরী। শেষে প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী ডালিয়া আহমেদের একক আবৃত্তি পরিবেশনার মধ্য দিয়ে ইতি টানা হয় দুদিনব্যাপী এই উৎসবের।

x