চবিতে জেন্ডারবিষয়ক গবেষণার আন্তর্জাতিক আয়োজনে যা উঠে এল

মাধব দীপ

শনিবার , ১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ
60

দিনের পড়ন্ত বেলা। কক্ষভর্তি দর্শক-শ্রোতা তখনো তন্ময় হয়ে শুনছেন দেশ-বিদেশের স্কলারদের কথা। সবার সুর ও স্বরে যেনো উঠে আসছে একই কথা। একই যাতনার কথা। এই কথা আমার-আপনার চারপাশ থেকেই নেওয়া অতি পরিচিত ও আটপৌরে বাস্তবতা। কিন্তু, যাঁরা বলছেন- তাঁরা এসব কথা বলছেন- তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। গবেষণার অংশ হিসেবে উঠে এসেছে এসব ঘটনা বাস্তব-করুণ গল্প হিসেবে।
বলতে গেলে- ‘রিথিংকিং ডেভেলপমেন্ট ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের এই প্যারালাল সেশানটিতে সিমন দ্যা ব্যুভেয়ারের সেই পুরনো কথাই যেনো নতুন আঙ্গিকে ওঠে এলো। সিমন দ্যা ব্যুভেয়ার মনে করতেন- ‘দ্যা ওয়ান’ হচ্ছে পুরুষ। আর ‘দ্যা আদার’ হচ্ছে নারী। অর্থাৎ- আমাদের এই সমাজ তা শিক্ষিতই হোক বা অশিক্ষিতই হোক উভয় স্থানেই ‘পুরুষ মানেই সক্রিয়, কর্মতৎপর, জগৎ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ও সমাজ পরিবর্তনে সক্ষম। আর নারী মানেই লাজুক, অলস, কর্মবিমুখ, বহির্জগতে প্রভাব বিস্তার করার গুণ ও ক্ষমতাহীন। পুরুষ জীবননাট্যেও অভিনেতা, নারী দর্শকমাত্র।’
যাই হোক, সেশানের প্রথমেই নিজ প্রবন্ধের উপর প্রেজেন্টেশান দিলেন- এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, থাইল্যান্ডের ‘জেন্ডার ও ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ’ বিষয়ের পিএইচডি ফেলো জাকিয়া বেগম। তিনি কথা বললেন- বাংলাদেশের নারী গৃহকর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে। অত্যন্ত চমৎকারভাবে তিনি তাঁর উপস্থাপনায় তুলে ধরলেন- দেশের নারী গৃহকর্মীদের করুণ সব গল্প। তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখালেন যে- গৃহকর্মী ছাড়া আজকাল শহরের বাসা-বাড়ি বলতে গেলে অচল, যার হাত ধরে হয়তো বেড়ে উঠছে আমাদের শিশুরা- সেই গৃহকর্মীই কীভাবে হরহামেশা আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছেন। কীভাবে তাঁরা সামজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গবেষকের মূল বক্তব্য অনেকটা যেনো এরকম: আপনার বাসায় যে গৃহকর্মী রয়েছে তাঁর কোনোদিন মাথাব্যথা ও জ্বর হওয়ার কথা না, কোনোদিন ডায়রিয়া হওয়ার কথা না, কখনও দাঁতের ব্যথায় সে কাত হয়ে পড়ার কথা না, কখনও তাঁর কোনো জরুরি কাজ পড়ার কথা না; তাঁর জীবনে কখনো কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে না, তাঁর বাচ্চার কখনও কোনো অসুখ হতে পারে না, একটানা ৫/৬ দিন কাজ করার পরে সপ্তাহে একদিন তাঁর পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে মন চাওয়ার কথা না। এককথায়, গৃহকর্মী হবে কেবল একটা যন্ত্র। তাঁর কোনো যন্ত্রণা থাকতে পারবে না। -এমনটিই আশা করেন এদেশের বেশিরভাগ গৃহকর্তারা। আমি বলবো- আমাদের চারপাশের ঘটে যাওয়া রীতিমত অমানবিক এই সত্যগল্পগুলোই বলে গেলেন তিনি।
জাকিয়া বেগমের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের স্কলার মৌমিতা পাল বললেন- বাংলাদেশের নারী ও প্রাযুক্তিক অগ্রসরতা নিয়ে। তিনিও অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরলেন- জেন্ডার সমতা আনয়নে ও নারীর ক্ষমতায়নে ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’র ব্যাপক ভূমিকা থাকলেও প্রকৃতপ্রস্তাবে নারী প্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধের শিকারও কম হচ্ছেন না। এরপর রাজশাহী শহরের কর্মজীবী নারীদের সমূহ দুর্ভোগ নিয়ে বললেন- আব্দুল্লাহ-আল-মিজান। তিনি এসেছিলেন রাজশাহী প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের স্কলার হিসেবে। আব্দুল্লাহ-আল-মিজান আবারও আমাদের দেখিয়ে দিলেন- কর্মজীবী নারীরা কীভাবে তাঁদের নিত্য দিনকার চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর উপস্থাপনা শুনে বারবার মনে হচ্ছিলো- হ্যাঁ, নারীর জীবনের এই বাস্তবতা বহু পুরনো। যতো শিক্ষিতই হোক নারী তাঁর জীবনে নিজের জন্য কোনো সুখ থাকতে নাই। তার সব সুখই পরের জন্য নিবেদিত। কী ঘরে। কী বাইরে। কী কর্মজীবনে কিংবা কী সংসার জীবনে। বিয়ের পর কিংবা আগে, কী বাপের বাড়ি কিংবা স্বামীর বাড়ি- নারীর অবমূল্যায়ন সবক্ষেত্রেই সুনিশ্চিত। চুলাতেই তার সব খুশি। এটাই নারীর নিয়তি। এর ব্যতিক্রম হওয়া যাবে না। এর ব্যত্যয় ঘটালেই কিংবা বাসায় বা কর্মক্ষেত্রে একটু অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নারী রসাতলে গেলো বলে চোখ লাল করবে সমাজ।
সবার শেষের গবেষক ছিলেন মো. আব্দুস সবুর। তিনি এসেছিলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ইপশা’ থেকে। সংস্থাটির প্রোগ্রাম ম্যানেজার তিনি। দারুণভাবে ফুটিয়ে তুললেন- প্রান্তিক নারীরা কীভাবে এখনো ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন- সেই সত্যগল্প। যদিও ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যেকেই আইনের চোখে সমান। কিন্তু, তিনি দেখালেন- সেই সমতা এখনো প্রান্তিক নারীর মর্যাদাকে, তাঁদের হাহাকারকে ছুঁতে পারেনি।
অবশ্য, এর আগে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্কলার মণি পাল শোনালেন- কীভাবে জেন্ডার বৈষম্য নারীর ক্যারিয়ার গঠনে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় সেই চিরচেনা গল্প। এজন্য তিনি সিলেটের হবিগঞ্জকে তাঁর ‘কেস-স্টাডি-জোন’ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সেই গবেষণায় তিনি দেখালেন- নারী কতোটা কষ্ট করে- শক্ত হাতে নানা প্রতিকূলতা সামলে নিয়ে অফিস ও বাসার কর্মে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেন। অনেক উচ্চকিত স্বরেই তাঁর গবেষণা আমাদের জানান দিলো- কর্মস্থলের পুরুষ সহকর্মীদের দ্বারা নারীর অসম্মানিত হওয়ার গল্প। এমনকি কীভাবে অনেক নারী তাঁর কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতন পুরুষ কর্মকর্তার দ্বারা অবমূল্যায়নের শিকার হন- তারও একাধিক কেসস্টাডি হাজির করলেন তিনি। বললেন- ‘এখনও অফিসিয়াল কাজের ক্ষেত্রে নারীরা আনঅফিসিয়াল শত-শত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন- যা কর্মক্ষেত্রে নারীকে তাঁর প্রাপ্য বুঝে পাওয়ার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
তিনিও বললেন- কীভাবে প্রান্তিক নারীরা ন্যায়বিচার ও আইনি সুবিধা থেকে বছরের পর বছর ধরে বঞ্চিত হয়ে চলেছে সেই গল্প। সব মিলিয়ে বলা যায়- জেন্ডার বিষয়ক এই পুরো সেশান জুড়েই ছিলো দেশের উন্নয়ন-বাস্তবতার একধরনের পুনর্পাঠ। যেখানে দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিলো ক্রিটিক্যাল ঘরানার।
তবে সব ছাপিয়ে এটাও উঠে এসেছে যে- নারীবাদী আন্দোলন তথা জেন্ডার বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারীর নিজস্ব পরিসর সন্ধানের এই আন্দোলন এখন পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সাধারণ সচেতন মানুষের আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। আর একারণেই সফল হয়ে উঠেছে- এই সম্মেলন।
জেন্ডার বিষয়ক এই সেশানটির মডারেটর ছিলেন অধ্যাপক ড. আইনুন নাহার। আলোচক ছিলেন ড. ইশিতা শ্রুতি। পুরো সম্মেলন কক্ষই যেনো ধ্বনিত হচ্ছিলো লেখক ভার্জিনিয়া উলফের বিখ্যাত সেই উক্তি- “নারীর জন্য ‘এ্যা রুম অব হার ওউন’ নিশ্চিত করতে হবে।”
সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী বলেছিলেন, “মানুষের গড়া সমাজে মানুষের এমন দুর্গতি কেন? কেন এত অসাম্য? ‘এই পৃথিবী আমার-ই জন্য’ -ক্ষমতাবানদের এমন নির্লজ্জ চিন্তা কেন? তুচ্ছের জন্য মানুষ এভাবে নিজেকে বিকোয় কেন? মেয়েদের সবকিছুতে এত অধিকারহীনতা কেন? তাদের উপর অন্যায় শাসনের যাঁতা চাপানো কেন? তার জীবন অবরোধের মধ্যে কেন?’
-এই হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার তাগিদ ছিলো সম্মেলন থেকে। সেশানটির শেষবাক্য কটা ছিলো এরকম- ‘নিতে হবে এর প্রতিরোধের ব্যবস্থা। উদ্যোগ। নারী নয়, পুরুষকেই এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে, পুরুষতন্ত্রের কর্তৃত্ববাদী খোলস ত্যাগ করতে হবে, তবেই দেশ হবে নারী-পুরুষের। সকলের। সকল মানুষের।’ -বলছিলেন ড. আইনুৃন নাহার।
আর হ্যাঁ, বলতেই হয়- সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত দু’দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথম দিনের শেষ প্ল্যানারি সেশান ছিলো এটি। অন্যান্য প্লেনারি সেশানেও দেশ-বিদেশের গবেষকরা অংশগ্রহণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে ওই সম্মেলন শুরু হলেও শেষ হয় বান্দরবানে অনুষ্ঠিত একটি ‘রিট্রিট’-প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে। সম্মেলনে আমেরিকা, চীন, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীীলংকা, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপালের ২০ জন গবেষকসহ মোট ১৫০ জন শিক্ষক ও গবেষক অংশ নিয়েছেন। দু’দিনব্যাপী সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৯০টি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। মোট ১২টি প্যানেলে প্যারালাল সেশন চলে। এছাড়া সম্মেলনে উন্নয়ন বিতর্ক নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দিল্লীর সেন্টার ফর ডেভলপমেন্ট স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক অনুপ কুমার ধর। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের সম্মানিত ডিন ও সম্মেলন সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহামেদ স্যারকে ধন্যবাদ জানাই এমন একটি আন্তর্জাতিক মিলনমেলা আয়োজনের জন্য। আবার হোক- এই আয়োজন। এই প্রত্যাশা রাখছি।

x