চন্দ্রকথা

সাজিয়া আফরিন

শুক্রবার , ১৭ মে, ২০১৯ at ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
34

টুনটুন শব্দ মোবাইলে, হোয়াটস আপে মেসেজ এসেছে। মেসেজের শব্দ হলেই বুকের ঠিক মাঝখানটায় কেমন যেনো চাপ লাগে অরিত্রীর, সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে মেসেজ দেখা পর্যন্ত ঐ ২,৩ সেকেন্ড সময়টা কাটিয়ে দেয় প্রচণ্ড আশা নিয়ে যে মেসেজটা আদ্রিকই পাঠিয়েছে।গত চার পাঁচদিন সারাটাক্ষণ মোবাইল ফোনটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে সে কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত মেসেজ আর আসে না।
: অরু, কেমন আছো? আমি খুব খুব সরি,কানে ধরছি। আমি সত্যি ব্যস্ত ছিলাম। সরি।
এক আকাশ সমান অভিমান,আবার হঠাৎ খুব আকাঙ্ক্ষিত জিনিস পেয়ে যাওয়া দু্থটা অনুভূতি একসাথে কাজ করছে অরিত্রীর। দু্থচোখ ভর্তি জল টলমল করছে,অফিসে বসে কান্নাকাটি করলে লোকে কি ভাববে!! খুব চেষ্টা করছে কান্নাটাকে গিলে ফেলতে।
: ঠিক আছে। তুমি কেমন আছো?
: ঠিক নেই কিছু। গাল ফুলায় বসে আছো,বকা টকা দাও, রাগ করো। এতো স্বাভাবিক দেখলে তোমাকে বরং অস্বাভাবিক লাগে। জ্বর টর হয় নাই তো!!
: রাগ করলেও সমস্যা, না করলেও!! তোমার যে কখন কি ভাল্লাগে!
: তোমাকেই ভালো লাগে সবসময়, তুমি যেমন ঠিক তেমনটা ভাল্লাগে। খুব কষ্ট দিয়েছি, না?
: আমার প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছে আদি। তোমাকে বুঝাতে পারবোনা।
: জানি আমি।খাওয়া দাওয়া-ও তো করো নাই, ঘুমাও-ও নি ঠিকমতো, তাই না?
আবার কোত্থেকে যেনো চোখে জল চলে এলো অরিত্রীর, সেটা আটকাতে গিয়ে মাথা আর কপালটা ঝিনঝিন করে উঠলো।
এটাই তো তার আদ্রিক। গত কটা দিন কি যে কেটেছে! শেষ ৪ – ৫ টা দিন মেসেজ করলে উত্তর দেয়নি,ফোন করে করে হাত ব্যথা হয়ে গেছে,একটা লাইন কথাও ঠিকমতো বলেনি, বরং একবার ফোন ধরে তো বকাই দিয়েছে,অরিত্রী নাকি সারাক্ষণ যন্ত্রণা দিচ্ছে তাকে, অফিসের কাজে ক্ষতি হচ্ছে তাতে।
খুব কষ্ট পেয়েছিলো কথাটাতে সে, কতো দিন অর্ধেক অফিস করে বের হয়ে গিয়েছে অরিত্রী কেবল আদ্রিক দেখা করতে চেয়েছে তাই। এমনও হয়েছে কখনো কখনো অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরিও হয়েছে,আদ্রিক ফোন করে বললো আজকে না যাও;সে যায় নি, আদ্রিকের সাথে সময় কাটিয়েছে। সেই মানুষটা যখন তাকে বলে তোমার জন্য আমার চাকরিতে সমস্যা হচ্ছে। বিরক্ত করছো তখন বুকের ভেতরের দলা পাকানো কষ্টটা মেঘের মতো জমাট বেঁধে গলার কাছে এসে ঠেকে,চোখ থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে।
: আমি ঠিক আছি। তোমার কথা বলো
্ত অরিত্রী জানতে চাইলো।
আদ্রিক জানে কি করলে অরুর মন ভালো হয়,অরুর পুরো পৃথিবী জুড়ে এই মানুষটা। অরিত্রী নিজেও যথেষ্ট বুঝে আদ্রিককে কিন্তু এরপরও মাঝেমধ্যে বড্ড অবুঝ হয়ে যায়।আদ্রিকের সাথে ঠিকমতো কথা না হলেই কেমন এক হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি তৈরি হয়,অস্থিরতা তৈরি হয়।
আর ওদিকে আদ্রিকের হলো নতুন চাকরি,তাও আবার নতুন শহরে। সবকিছু বুঝে উঠতে সময় লাগছে।আর চাকরি শেষে ঘরে ফিরে তখন আর প্রেম জাগেনা মনে, ক্লান্তি ভর করে শরীরে, ঘুম এসে দুচোখের কার্নিশে জড়ো হয়। কিন্তু অরিত্রী হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও আদ্রিকের জন্য আলাদা সময়টা বের করে নেয়,শত ক্লান্তি, শত অবসাদেও আদ্রিকই তার কাছে প্রথমে,বাদবাকি সবটা বাদে আসে, এমনকি নিজের শরীরও। খুব অযত্ন করতে পারে সে নিজেকে, তবে আদ্রিকের যত্নের দিকে কড়া নজর তার।
এতে করেই মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে থাকে দুজনের মাঝে, মান অভিমান জমতে থাকে মনে,কেমন যেনো অচেনা লাগে অরিত্রীর এখন খুব চেনা মানুষটাকেও।
আদ্রিকের সকাল থেকেই আজ মন কেমন করছে,চোখের সামনে ঠোঁট বেঁকিয়ে গাল ফুলানো,চোখ ছলছল করা অরিত্রীর চেহারাটাই ফিরে ফিরে আসছে। প্রচণ্ড অভিমানে চুপ করে এভাবেই বসে থাকে মেয়েটা।
: অরু তুমি আমাকে ভুলেই গেছো। আমাকে দেখতেও ইচ্ছে হয় না এখন আর।
সাজিয়া removed a message
: আমি ভুলে গেলাম? তাই সারাদিন ফোন করি খবর নিতে আর ফোন তুমি ধরো না।
: আজকে অফিস তাড়াতাড়ি ছুটি হবে,কাল পরশু দুদিন অফ। তুমি এখানে থাকলে একসাথে সময় কাটানো যেতো,গল্প করা যেতো,কতো কথা বলা যেতো!জানতেও তো চাও না কখন ফ্রি থাকি।
: বলেছো তুমি আমাকে একবারও!!
: আগে তো বুঝতা, এখন বলতে হয় বুঝি! আসলে দূরে থাকি তো তাই মনেও আর রাখোনা।
আদ্রিকের কথা শুনে হেসে ফেললো অরিত্রী।সে সবসময় নিজের জেদটাই খাটায়,নিজের দোষ কখনো স্বীকার করেনা,এখন অরিত্রীর উপর সব চাপিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হবে।
দুপুরেও কথা হলো মেয়েটার সাথে,এখন আর পাচ্ছেনা ফোনে,বেশ ক্থবার চেষ্টা করে কেমন যেনো একটা অস্বস্তি লাগছিলো আদ্রিকের,সে সরাসরি অরিত্রীর অফিসে ফোন দিলো,অফিস থেকে জানালো ম্যাডাম তো জরুরি কাজে ঢাকা যাচ্ছেন,বিকেল সাড়ে পাঁচটার ফ্লাইটে। ঘড়িতে তখন সোয়া পাঁচটা,এর মানে অরু ফ্লাইটে উঠছে কিংবা অপেক্ষা করছে। আদ্রিকের মনটা ঝলমল করে উঠলো।পাগলী একটা!!তাকে সারপ্রাইজ দিতে চায়,তাই এতোদূর থেকে উড়ে আসছে।
ফ্লাইটে বসে আছে অরিত্রী। এগারোটার দিকে আদ্রিকের সাথে কথা শেষ করেই টিকেট কনফার্ম করেছে সে,তবে আদ্রিককে সারপ্রাইজ দিতেই আর জানায়নি। খুব একটা সময় আদ্রিক এখন পায় না অবসরের জন্য,পাচ্ছে যখন তখন এ সময়টা নষ্ট করতে চায়নি অরিত্রী। আদ্রিকের বাসার চাবি একটা ওর কাছে থাকে আর তার ব্যবহারের জিনিস ঢাকার বাসায় রাখা আছে,তাই বাসায় আর না গিয়ে অফিস থেকে সোজা এয়ারপোর্টেই এসেছে অরিত্রী।
ওয়ারি থেকে এয়ারপোর্ট কতোটা রাস্তা !!মনে হচ্ছে এক আলোকবর্ষ দূরে যেনো, রাস্তা আর ফুরোয়ই না। ট্রাফিক জ্যাম, ধোঁয়া উফ অসহ্য! মেয়েটাকে চমকে দিতে সে নিজেই যাচ্ছে নিয়ে আসবে বলে। এয়ার পোর্ট থেকে বের হয়ে তাকে দেখলে খুব খুশি হবে অরিত্রী। খুব অল্পতেই ভীষণ খুশি হওয়ার অদ্ভুত গুণ আছে অরিত্রীর। একটা চাঁপা ফুলের মালা, এক ঝুড়ি শিউলি ফুল কিংবা কাঠগোলাপ হাতে করে নিয়ে গেলেই খুশিতে ঝলমল করে উঠে মেয়েটা।
আদ্রিকের সামনে হঠাৎ হাজির হয়ে চমকে দিবে বলেই এই লুকোচুরি। ফ্লাইটে বসে কতো কি ভাবছিলো অরিত্রী,আজ আবার ফ্লাইট ডিলে করছে,প্লেনে বসেই আছে আধঘন্টার মতো।এ তিনটা দিন কি কি করবে,কোথায় ঘুরবে,আদ্রিকের জন্য কি কি রান্না করবে বসে বসে কতো কি ভাবছিলো অরিত্রী! আদ্রিক নিশ্চয় ওকে দেখলে অবাক হবে,কতোটা খুশি হয় সেটাই দেখার ব্যাপার।
এতোক্ষণে কি পৌঁছে গেলো অরু!সে কি দেরি করে ফেললো পৌঁছাতে! অরুকে ফোন দিয়ে দেখে এখনও অফ মোবাইল। মিনিট পনোরো আরও লেগে গেলো এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে আদ্রিকের, প্রায় দৌড়েই সে ভেতরে ঢুকলো, খবর নিয়ে জানলো ফ্লাইট ডিলে ছিলো,মাত্র এসে নেমেছে।
ঐ তো দূরে দেখা যাচ্ছে মহারাণীকে, কি সুন্দর শান্ত মায়া মায়া চেহারা! কেবল আদ্রিকের জন্য, ওর খুশির জন্য,ওর চাওয়াটা পূরণ করতে মেয়েটা চলে এসেছে! নিজের মাঝেই কেমন একটা ভালো লাগা কাজ করছিলো আদ্রিকের। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দরজার কাছাকাছি আসতেই অরিত্রীর চোখ গিয়ে পড়লো আদ্রিকের দিকে,সে কি ভুল দেখছে। এক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীটা যেনো দুলে উঠেছে,নিজেকে সামলাতে কষ্ট হচ্ছে,হ্যা তো এ তো আদ্রিক!!
কি সুন্দর হাসি ছেলেটার! কি সুন্দর করেই না হাসছে! ইচ্ছে হচ্ছে পাখির মতো ছুটে যেতে কিন্তু পা দু্থটো যেনো মাটিতে আটকে গেছে। আদ্রিক হাত বাড়িয়ে রেখেছে।অনেক কষ্টে ভারী দুটো পা নিয়ে এগিয়ে যেতেই একহাতে অরিত্রীর ব্যাগটা নিলো, আরেক হাতে তাকে জড়িয়ে ধরলো আদ্রিক। জড়িয়ে ধরতেই বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে কান্না সামলাতে ব্যস্ত মেয়েটা। আদ্রিকের মনে হচ্ছে বিশ্বজয় করে সে তার রাণীকে পেয়েছে।আলতো করে মুখটা তুলে কপালে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে কানে কানে বললো
: দেখো তো কেমন চমকে দিতে গিয়ে নিজেই ভড়কে গেলে!
মুচকি হেসে অরিত্রী বললো
: আপনার জন্য আরও চমক আছে মশাই! এতো টুকুতেই কি আর জিতে গিয়েছেন ভাবলেন!!
ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা খাম বের করে অরিত্রী সামনে ধরলো আদ্রিকের, হাতে নিয়ে খুলে দেখতেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো তার। এরচেয়ে আনন্দের সময় কি জীবনে আর কখনো এসেছে! একহাতে তার ভালোবাসার মানুষটাকে জড়িয়ে ধরে আছে, আরেক হাতে সেই ভালোবাসার পূর্ণতার ফলাফল।।
আহা! জীবন বড়ই সুন্দর। চাঁদ জ্যোৎস্নায় মাখামাখি হয়ে থাকা আকাশটাকেও আজ প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই সুন্দর দেখাচ্ছে।

x