চট্টগ্রাম বন্দরের প্রথম পিপিপি প্রকল্প লালদিয়া টার্মিনাল

আজাদী প্রতিবেদন

বিদেশি কোম্পানিকে সম্পৃক্ত করায় অসন্তোষ, নিজস্ব অর্থায়নে করার দাবি

সোমবার , ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৫:০৪ পূর্বাহ্ণ
451

চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানিরফতানি কার্যক্রম সহজ করা এবং সক্ষমতা বাড়াতে লালদিয়ায় নির্মিত হবে একটি মেগা কন্টেনার টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) এ প্রকল্পে ব্যয় হবে তিন হাজার কোটি টাকা। ৫২ একর জমির ওপর টার্মিনালটি নির্মিত হবে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি)’র আওতায়। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ইতোমধ্যে বহুদূর অগ্রসর হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)’র সহায়তায় পাঁচ সদস্যের একটি কনসোর্টিয়াম এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। গতকাল চবকের ট্রেনিং ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এক মতবিনিময় সভায় একথা জানানো হয়। বন্দরের বিদায়ী চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল সভায় এই প্রকল্পকে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে প্রথম পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প বলেও উল্লেখ করেন।

সভায় বন্দর পতেঙ্গা আসনের সংসদ সদস্য এবং নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এম এ লতিফ বিদেশিদের নিকট ধর্ণা না দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে এ টার্মিনাল নির্মাণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বন্দর সিবিএর পক্ষ থেকেও বিদেশিদের না দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লালদিয়া টার্মিনাল বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানানো হয়।

প্রসঙ্গত, এর মধ্যে প্রকল্পটির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ, টেন্ডার আহ্বান, আগ্রহীদের মাঝ থেকে শর্টলিস্ট তৈরিসহ নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। আগ্রহী কোম্পানিগুলোর মাঝ থেকে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ বছরের জন্য লালদিয়া এলাকার ৫২ একর জায়গা দেয়া হবে। ওখানে ওই কোম্পানি টার্মিনাল নির্মাণ এবং ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করে জাহাজ হ্যান্ডলিং করবে। ওই টার্মিনালে চারটি বার্থের দুটিতে কন্টেনার জাহাজ এবং দুটিতে কার্গো ভ্যাসেল হ্যান্ডলিং হবে। ২৫ বছর পর ওই কোম্পানি ইকুইপমেন্টসহ টার্মিনালটি বন্দর কর্তৃপক্ষের নিকট হস্তান্তর করে দিয়ে চলে যাবে। গতকালের সভায় আগ্রহী বিদেশি কোম্পানিগুলোর টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) নিয়ে আলোচনা হয়। কোম্পানিগুলোর সাথে কি ধরনের চুক্তি হতে পারে, ট্যারিফ কি হবে, জাহাজ হ্যান্ডলিং এর প্রেক্ষাপট কি হবে, পাইলটিং কাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, টাগ কার থাকবে এসব প্রসঙ্গ আলোচনার জন্যই এ সভার আয়োজন করা হয়। এতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা, বন্দরের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য এম এ লতিফ। তিনি বন্দরের হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে অলস পড়ে থাকলেও মাত্র তিন হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের জন্য বিদেশিদের দুয়ারে ধর্ণা দেয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিদেশিরা অনেক ক্ষেত্রে শর্ত সমূহ মানে না। তাছাড়া এ প্রকল্পের জন্য যে তিন হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যয় করতে পারে। বন্দরের টাকা বিভিন্ন জায়গায় নেয়া হয়েছে। অথচ বন্দরের টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় করা হচ্ছে না। এই টার্মিনাল বন্দরের একক সম্পত্তি হবে না, পুরো দেশের হবে, দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে এই টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এমএ লতিফ বলেন, বন্দর তার টাকা ব্যাংকে জমা রাখছে। অথচ টার্মিনাল করার জন্য অন্যের নিকট ধর্না দিচ্ছে। বন্দর ব্যাংকে টাকা না রেখে নিজেরা লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ করলে অনেক লাভজনক হবে। তিনি বলেন, ইতিপূর্বেও বন্দরের টাকা ছিল। কিন্তু উদ্যোগের অভাবে তা হয়নি। বর্তমানে পতেঙ্গা টার্মিনাল, বেটার্মিনাল এবং লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি বন্দর কর্তৃক লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও অপারেশন কাজ নিজেরা করার পক্ষে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেন।

মতবিনিময় সভায় বন্দর সিবিএ সভাপতি আবুল মনসুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি পদ্মা সেতু নির্মাণ নিজস্ব অর্থায়নে করতে পারেন, তাহলে লালদিয়া টার্মিনাল বন্দর তার অর্থে নির্মাণ করতে পারবে না কেন? তিনি শ্রমিককর্মচারীর পক্ষ থেকে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ ও অপারেশনাল কার্যক্রম নিজেরা করার দাবি জানান।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদায়ী চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার শুরুতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বুয়েটের অধ্যাপক ড. রাকিব হোসেন প্রকল্পটির ব্যাপারে পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশান উপস্থাপন করেন। সভায় বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর সাঈদ বক্তব্য রাখেন। সভায় অন্যান্যের মধ্যে নৌ বানিজ্য কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জালাল উদ্দিন, সিএন্ডএফ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন বাচ্চু, এফবিসিসিআই এর প্রতিনিধি মাহফুজুল হক শাহ, চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক অঞ্জন শেখর দত্ত, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, শিপার্স কাউন্সিল এর প্রতিনিধি খায়রুল আলম সুজন, বার্থ অপারেটর কর্মকর্তা আবু বকর, মহিলা চেম্বারের আবিদা মোস্তফা, চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার খায়রুল মোস্তফা, গোলাম মর্তুজা, বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) গোলাম ছরওয়ার, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সেলিনা আকতার, বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য হাদি হোসেন বাবুল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদায়ী চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, একটি নির্দিষ্ট সময়ের তথা ২৫/৩০ বছরের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান এ টার্মিনাল পরিচালনা করবে। এরপর এটি চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে নেবে। তাদের সাথে আমাদের নির্দিষ্ট চুক্তি ও শর্তের ভিত্তিতে টার্মিনাল পরিচালিত হবে। এটি কোন বেসরকারি পোর্ট হবে না। আমরা ল্যান্ডলর্ড পোর্টের ভূমিকায় যাচ্ছি। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত নতুন। আমাদের অভিজ্ঞতা নেই। আমাদেরকে আরো অনেক কিছু শিখতে হবে। তাই চুক্তি করার আগে আমরা বিষয়টি নিয়ে সকলের সাথে আলাপ করছি। যাতে সকলের আলোচনায় দেশের স্বার্থে একটি উইন উইন পরিস্থিতিতে চুক্তি করতে পারি।

বন্দরের কর্ণফুলী নদী সংলগ্ন ১৪ ও ১৫নং খালের মধ্যবর্তী জমির ওপর লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একটি কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ইতিমধ্যে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ টিম মাস কয়েক পূর্বে এই প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেয়া হয়।

দু’বছর পূর্বে এটি পিপিপিএর অধীনে করার অনুমোদন পায়। উক্ত জমিতে বসবাসকারীদের বন্দরের হামিদচর এলাকায় পুর্নবাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রায় ৫০০ পরিবারকে পুর্নবাসনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাঁচশটি ঘর তৈরি করে পাঁচশ’ পরিবারকে দেয়া হবে। প্রতিটি ঘরে দু’টি বেড রুম, ড্রয়িং ডাইনিং কিচেন এবং বাথরুম থাকবে।

২০২০ সালে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। যে ৫টি প্রতিষ্ঠান পিপিপি’র অধীনে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে দুবাই এর ডিপি ওয়ার্ল্ড, ভারতীয় আদানি পোর্টস এন্ড স্পেশাল ইকোনোমিক জোন লিমিটেড, ফ্রান্সের ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড, চীনের চায়না হারবার এবং সিঙ্গাপুরের গ্লোবাল পোর্ট সার্ভিসেস। এগুলোর মধ্যে যে কোন একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করতে যাচ্ছে বন্দর। চলতি বছরের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হতে পারে বলেও গতকাল বৈঠকে আলোচনা করা হয়েছে।

বন্দর চেয়ারম্যানের শেষ কর্মদিবসের বৈঠক :

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল আজ সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকারের নিকট দায়িত্বভার হস্তান্তর করবেন। কমডোর জুলফিকার গত প্রায় দুই বছর বন্দর কর্তৃপক্ষের মেম্বার (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল দায়িত্ব হস্তান্তর করে নৌবাহিনীতে যোগ দেবেন। গতকালের বৈঠকটিকে বন্দর চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের শেষ আনুষ্ঠানিক বৈঠক বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কালই আমার শেষ কর্মদিবস। আমি চলে যাচ্ছি। নতুন চেয়ারম্যান নিশ্চয় আজকের এই বৈঠকের ধারাবাহিকতায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন। তিনি প্রয়োজনে আরো একটি ফলোআপ বৈঠকও করতে পারেন। তিনি বলেন, এক বছর দশ মাস বন্দর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে বন্দরের উন্নয়নে নানাভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি। চট্টগ্রাম বন্দর বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি করেছে। ইকুইপমেন্ট সংকট ঘুচানোর জন্য বহু ইকুইপমেন্ট আনা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

x