চট্টগ্রাম থেকে এর আগেও গিয়েছিল স্বর্ণের ৫টি চালান

আদালতে দুজনের জবানবন্দী

সবুর শুভ

শুক্রবার , ১৫ মার্চ, ২০১৯ at ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ
173

২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ধরা পড়া স্বর্ণগুলো ভারতে পাচারের জন্য চট্টগ্রাম থেকে বায়তুল মোকাররমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন দুই চোরাকারবারি। এর আগেও পাঁচ-ছয় বার চট্টগ্রাম থেকে নেয়া স্বর্ণের বারগুলো ভারতে পাচার করা হয়েছে। ভারতে স্বর্ণ বার পাচারে করিমের পরে যুক্ত হয় রাকিব। সে জন্য রাকিবকে তার পছন্দের প্রেমিকাকে বিয়েও করিয়ে দেন আসামি আবদুল করিম খান। তার মধ্যস্থতায় গত ১৫ জানুয়ারি বিয়েও সম্পন্ন হয়। যে মেয়েটিকে আসামি রাকিব বিয়ে করেছেন সেই মেয়েটিকেও রাকিবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আসামি করিম। স্বর্ণ চোরাচালানের দুই কারিগর বিচারকের সামনে অবলীলায় তথ্যগুলো উপস্থাপন করেছেন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির মাধ্যমে। দুইজনের জবানবন্দী থেকে জানা গেল চোরচালানের স্বর্ণের গনত্মব্য কোথায়। এই চোরাচালানে মিতসুবিশি ও নিশান ব্র্যান্ডের দুটি গাড়ি ব্যবহারের তথ্যও উঠে আসল জবানবন্দিতে। ১১ মার্চ চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শহীদুলস্নাহ কায়সারের আদালত বিকেলে দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী রেকর্ড করেন।
কালুর জবানবন্দি : জবানবন্দিতে চোরাকারবারি করিম খান কালু জানান, আমি ও রাকিবুল হাসান রাকিব ক্লাসমেট। রাকিব ও আমি আমাদের এলাকায় ড্রাইভিং করতাম। রাকিব ঢাকায় থাকতো। সে সুবাদে ঢাকার মোহাম্মপুরের ব্যবসায়ী আলমগীর হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। বায়তুল মোকারম থেকে গাড়ি নিয়ে আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গেটে আসতাম। সেখান থেকে পার্টিকে ফোন দিতাম। তারা এসে গাড়িটি নিয়ে চলে যেতেন। কোথায় নিতে যেতেন জানতাম না। নেওয়ার সময় একজন লোক আসতেন। কিছুক্ষণ পর দুই জন গাড়িটি বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন। চট্টগ্রাম থেকে নিয়ে যাওয়া স্বর্ণের বারগুলো ইন্ডিয়া পাচার হতো। এর আগে বহুবার চট্টগ্রাম থেকে স্বর্ণের বার নিয়ে গেছি আমরা।
রাকিবের জবানবন্দি:
মামলার অপর আসামি রাকিবুল হাসান রাকিব আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে জানান, গত ১৫ জানুয়ারি বিয়ে করার ১০ থেকে ১৫ দিন পর করিম খান ফোন করে দর্শনা থেকে ঢাকায় আসতে বলেন। ঢাকায় আসলে জানান, চট্টগ্রাম যেতে হবে। ঢাকার বায়তুল মোকারম এলাকা থেকে রওনা দিয়ে পরের দিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গেটে যাই। করিম খান ফোন করলে দুজন লোক এসে আমাদের গাড়িটি নিয়ে যান। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর তারা গাড়িটি নিয়ে মেডিকেলের গেটে ফিরে আসেন। তারপর আমরা গাড়িটি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। বায়তুল মোকারমের সামনে যাই। জবানবন্দিতে আরও বলা হয়, করিম ফোন করলে সেখানেও একজন লোক এসে গাড়ি নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আবার গাড়ি দিয়ে যায় তারা। হাজার টাকা বেতনের চুক্তিতে স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত হন বলে জানান তিনি। তার কাজ ছিল স্বর্ণ পাচারের গাড়ি ঢাকা থেকে চালিয়ে চট্টগ্রাম নিয়ে আসা। চট্টগ্রাম থেকে আবার বায়তুল মোকারম এলাকায় নিয়ে যাওয়া। ঢাকা ছাড়াও রাজবাড়িতে স্বর্ণ পাচার করেছেন তারা। চুক্তি অনুযায়ী শুধুমাত্র গাড়িতে বসে থাকাই ছিল আমার কাজ। প্রয়োজনে আবার মাঝে মধ্যে গাড়িও চালাতে হতো আমাকে।
তথ্য অনুযায়ী, জবানবন্দি দেয়া দুইজন হচ্ছেন চুয়াডাঙা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা পৌরসভার আজমপুর গ্রামের মৃত শহীদুল ইসলামের ছেলে রাকিব (৩৪) এবং একই এলাকার মোবারক পাড়া গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে করিম খান কালু (৩৪)।
গত ৩ মার্চ বেলা সাড়ে ১২টার দিকে মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ থানা এলাকার উত্তর সোনাপাহাড় গ্রামে পুলিশের চেকপোস্টে বড় ধরনের স্বর্ণের এ চালান ধরা পড়ে। বিলাসবহুল পাজেরো জিপ (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৮-২১৪৪) গাড়িটির ভেতরের সিট পকেটের নিচে বিশেষ কায়দায় স্বর্ণের বারগুলো রাখা ছিল। স্থানীয় জোরারগঞ্জ থানার ওসির নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে ধরা এ চালান। এছাড়া তাদের কাছ থেকে ওই সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৬টি মোবাইল ফোন সেট।
রাকিব বিচারকের সামনে জবানবন্দিতে আরো জানান, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নেওয়ার সময় পথে ধরা পরা চালান পাচারের আগে আরো পাঁচটি চালান নিয়ে গেছি। প্রত্যেকবারই চট্টগ্রামে আসলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের গেইটে গাড়ি নিয়ে আসতাম। সেখানে আসার পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করতাম। ফোন করার পর দুজন লোক এসে গাড়িটি দিয়ে যেতেন। পরে স্বর্ণসহ গাড়িটি ফেরত দিয়ে যেতেন। আমরা সেখান থেকে স্বর্ণসহ গাড়ি নিয়ে বায়তুল মোকারম মসজিদ এলাকায় যেতাম। এছাড়া আরো দুই বার আমরা চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রাজবাড়িতে দুই বার স্বর্ণ পাচার করেছি। এই চোরাচালানে আমরা মিতসুবিশি ও নিশান ব্র্যান্ডের দুটি গাড়ি ব্যবহার করতাম।

x