চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের বাস্তবায়ন জরুরি

শনিবার , ২০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৮:২৪ পূর্বাহ্ণ
79

চট্টগ্রাম ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য বড় ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। এ প্রকল্পের জন্য বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ চলতি সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা মনে করি।
চট্টগ্রামের নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের কাছে অবাক করা বিষয় হচ্ছে -চট্টগ্রাম শহরে এ যাবৎ ওয়াসার কোনো স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা নেই। আজাদীতে এক লেখক দুঃখের সঙ্গে লিখেছিলেন, প্রত্যেকটা বাসার পায়খানা/ময়লার টাংকির আউট লাইন ড্রেনের সাথে সংযুক্ত। এভাবে সব বাসাবাড়ি থেকে পায়খানা বের হয়ে ড্রেনে পড়ে তা শেষ গন্তব্য কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ে। স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও কোনো সরকার চট্টগ্রামে স্যুয়ারেজের ব্যবস্থা স্থাপন করে নি। এর ফলে চট্টগ্রামের হলিশহর ও সিডিএ আবাসিক এলাকা সহ যেসব এলাকায় জোয়ারের পানি উঠে সে সব এলাকায় জোয়ারের পানির সাথে পায়খানার টাংকির আউট লাইনের বের হওয়া পায়খানা মিশে একাকার হয়ে যায়। সে মিশে যাওয়া পানি ওয়াসা লাইনের লিকেজ দিয়ে ঢুকে আবার বাসাবাড়ির টাংকিতে গিয়ে পড়ে। সেই পানি মানুষের পেটে গেলেই জন্ডিসসহ নানা রোগের প্রকোপ দেখা দেয়।
আসলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই মহানগরীতে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা নেই, তা শুনতেই যেন খারাপ লাগে। অত্যন্ত লজ্জা ও শ্লাঘার বিষয় যে, স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা এখনো পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বছরের পর বছর কেবল প্ল্যানই করা হয়েছে। জানা যায়, সড়ক, হাটবাজার ও গৃহস্থালির আবর্জনা বা কঠিন বর্জ্যসংগ্রহ করে নির্দিষ্ট এলাকায় ডাম্পিং করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এতে করে নগরী কিছুটা পরিচ্ছন্ন হলেও পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই।
আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াসার প্রধান কাজ পানীয় জলের সংস্থানের পাশাপাশি স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনাও। কিন্তু চট্টগ্রাম ওয়াসা গত ৫৭ বছরে স্যুয়ারেজের কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অবশেষে স্যুয়ারেজের একটি প্রকল্প তৈরি করেছে। নগরীর ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ সিস্টেম নিয়ে দুই বছর ধরে পরিচালিত মাস্টার প্ল্যানের অংশ হিসেবে প্রকল্পটি তৈরি করা হয়। এই প্রকল্পের আওতায় পুরো নগরীকে ছয়টি ব্লকে বিভক্ত করে বিশ লাখ মানুষকে স্যুয়ারেজের আওতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্প (প্রথম পর্যায়)’ নামের এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮০৮ কোটি ৫৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর বিস্তৃত এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।
চট্টগ্রাম মহানগরীতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের বসবাস। জনসংখ্যার সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে নগরীর পরিধি, বাড়ছে আবাসিক ভবন দালান কোঠাও। বৃদ্ধি পাচ্ছে কলকারখানার সংখ্যাও। অথচ এই নগরীতে নেই কোনো স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা। ফলে নগরবাসীর সৃষ্ট পয়ঃবর্জ্য খাল নালা হয়ে সরাসরি গিয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে। এতে করে বিষিয়ে উঠছে নগরীর খাল-নালা ও কর্ণফুলীর পরিবেশ। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, প্রতিদিন টনে টনে টয়েলেট বর্জ্য খাল-নালা হয়ে নদীতে পড়ছে। কোনো প্রকার পরিশোধন ছাড়াই এসব তরল বর্জ্য খোলা নালা-নর্দমা হয়ে যাচ্ছে নদীতে। এতে করে নগরীর পরিবেশ মারাত্মক দূষণের শিকার হচ্ছে। আবাসিক ভবনগুলোতে টয়েলেট বর্জ্য সাময়িক সংরক্ষণের জন্য রিজার্ভার থাকলেও এসব বর্জ্য নির্দিষ্ট সময় পর ওই রিজার্ভার থেকে তুলে সরাসরি নালা নর্দমায় ফেলা হচ্ছে। খোলা নালা-নর্দমা হয়ে এসব বর্জ্য যাচ্ছে নদীতে। বর্ষাকালে বৃষ্টির কারণে নগরীর নালা-নর্দমাগুলো সচল থাকে। পানির সাথে এসব বর্জ্য ভেসে যায় নদীতে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব নগরীতেই আধুনিক স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরে এর ছিটেফোঁটাও নেই। এতে এখানকার পরিবেশগত ক্ষতি দিন দিন বাড়ছে। ওয়াসা পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার বাস্তবায়ন জরুরি। তবে এক্ষেত্রে নগরীকে কয়েকটি ধাপে বিভক্ত করে ভ্যাকুয়াম বাহনের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের পর প্লান্টে পরিশোধনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে বলে তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেন।
স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ও জরুরি। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নে একযোগে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ওয়াসার সংজ্ঞা পরিপূর্ণ হয় না। এজন্য এ প্রকল্প বাস্তবায়ন জরুরি।

x