চট্টগ্রামে ১৩৫ গার্মেন্টস কারখানা স্পর্শকাতর

শ্রমিক-কর্মচারীদের ঈদ বোনাস অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বৈঠক করবে শিল্প পুলিশ

হাসান আকবর

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ
965

আসন্ন ঈদে ছাপ্পান্ন হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন ও বোনাসকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের গার্মেন্টস পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেডসহ চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে বিশেষ অনুসন্ধান চালিয়েছে শিল্প পুলিশ। প্রাথমিকভাবে ১৩৫টি কারখানাকে কিছুটা স্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কারখানায় যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য আজ থেকে ধারাবাহিক বৈঠক শুরু করেছে প্রশাসন। গার্মেন্টস মালিক, পদস্থ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে নিয়ে শিল্প পুলিশ বিশেষ সভার আয়োজন করেছে। নগরীকে পৃথক পৃথক ব্লকে বিভক্ত করে এসব বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বিজিএমইএর পক্ষ থেকে আগামী সপ্তাহে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, মহানগরী এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬৯৭টি গার্মেন্টস কারখানা আছে। এর বাইরে ৫০৫টি রয়েছে অন্যান্য কারখানা। মোট ১ হাজার ২০২টি কারখানার ৫ লাখ ৫৮ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। চট্টগ্রামের সব শিল্প কারখানার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখার দায়িত্ব চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের। সাত শতাধিক সদস্য দুটি ইপিজেডসহ সব শিল্প কারখানার ওপর নজরদারি করে। বছরের অন্য সময়ে তেমন শঙ্কা না থাকলেও দুই ঈদ নিয়ে শঙ্কায় থাকে পুলিশ। বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। অতীতের অভিজ্ঞতা এবং সামপ্রতিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে শিল্প পুলিশ চট্টগ্রামের ১৩৫টি কারখানাকে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব কারখানায় ৫২ হাজারের মতো শ্রমিক এবং চার হাজার কর্মচারী আছে। ৫৬ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীকে ঈদের আগে বেতন-বোনাস ঠিকভাবে দেওয়া না হলে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হবে বলে মনে করছে শিল্প পুলিশ।
চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ মোমতাজ দৈনিক আজাদীকে বলেন, আমরা আশাবাদী, পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে। সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদ করবেন। তিনি বলেন, কয়েকটি কারখানায় কিছু সমস্যা আছে। তারা বেতন-বোনাস দিতে পারবে কি পারবে না তা নিয়ে আমরাও নিশ্চিত নই। তবে, সেক্ষেত্রে তাদেরকে যেকোনোভাবেই বেতন-বোনাসের সংস্থান করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।
তিনি বলেন, উক্ত ১৩৫টি কারখানার মালিক, পদস্থ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী শ্রমিক এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছি। আজ সকালে ডবলমুরিং এলাকায় বৈঠক হবে। কাল হবে বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায়। আগামী ২০ মে হবে চান্দগাঁও এলাকায়। এভাবে চট্টগ্রামের ১৩৫টি কারখানায় যাতে কোনো সমস্যা না হয় সেজন্য ধারাবাহিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। এসব বৈঠক থেকে একটি কর্মপন্থা নির্ধারণ করব। যাতে শ্রমিকেরাও তাদের প্রাপ্য পায়, মালিকেরাও ঠিকভাবে বেতন-বোনাস পরিশোধ করতে পারেন।
অপর এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এবারের ঈদ মাসের প্রথম দিকে হওয়ায় গার্মেন্টস মালিকদের জন্য বেশ সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে গার্মেন্টসে বেতন হয় ৮ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যে। আজ-কালের মধ্যে চট্টগ্রামের সব গার্মেন্টসই এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ করবে। অথচ সপ্তাহখানেক পরেই তাদেরকে আবার বোনাস পরিশোধ করতে হবে। এর থেকে সপ্তাহ-দশ দিনের মধ্যে মে মাসের বেতন ঈদের আগে দিয়ে দিতে হবে। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ঈদ হওয়ায় ২/৩ তারিখের মধ্যে মে মাসের বেতন দিতে হবে। ফলে দুই-আড়াই সপ্তাহের মধ্যে দুই মাসের বেতন এবং একটি বোনাস পরিশোধ করতে গিয়ে গার্মেন্টস মালিকদের বিপুল অর্থের সংস্থান করতে হচ্ছে।
অপরদিকে, গার্মেন্টস শ্রমিকেরা পুরো বছর কাজ করেছেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদ করবেন। তাদের বেতন-বোনাসও জরুরি। এই বিষয়টিকে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে বলে উল্লেখ করেছেন পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোমতাজ। তিনি বলেন, ৫৬ হাজার মানুষের ঈদ উৎসবে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা রয়েছে। গার্মেন্টস মালিক এবং শ্রমিকসহ সকলে মিলে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে।
চট্টগ্রামের একাধিক গার্মেন্টস মালিক আজাদীকে জানান, বছরের পর বছর ধরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্প কারখানা শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত যোগান দিয়ে আসছে। বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্তভাবে দুই-চারটি কারখানায় বিভিন্ন সময় সমস্যা হয়েছে। এসব সমস্যা খোলা চোখে যেভাবে দেখা যায় পরিস্থিতি হয়ত অতটা সহজ থাকে না। নানা সমীকরণ মিলিয়ে একেকজন ব্যবসায়ীকে ব্যবসা করতে হয়। কারখানায় উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি হলেই কেবল ডলার আসে। সেই ডলার ব্যাংকে রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন কিংবা মালিকের মুনাফা পাওয়া যায়। দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া এবং একটি চেইন এখানে কাজ করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উক্ত মালিকেরা জানান, এই প্রক্রিয়ার কোথাও একটু সমস্যা হলে পরিস্থিতি মালিকের হাতের বাইরে চলে যায়। সময়মতো চেক পাস না হতে পারে, কোনো কারণে এক-দুদিন দেরি হতে পারে, পণ্যের মূল্য না-ও আসতে পারে। স্টকলট হতে পারে। আরো বিভিন্ন সমস্যায় মালিক সময়মতো শ্রমিকের পাওনা পরিশোধ করতে পারেন না। বিষয়টি সাময়িক। দুই-চার দিনের মধ্যে কিন্তু পাওনা দিয়ে দেওয়া হয়। দেশের এবং শিল্পের বৃহত্তম স্বার্থে দুই-চার দিনের বিষয়টি মেনে নিলে অনেক অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো যায়।

x