চট্টগ্রামে বহু আকাংখিত সুইমিংপুলের উদ্বোধন আজ

সুইমিংপুলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এখন চট্টগ্রামবাসীর : সিটি মেয়র ।। চট্টগ্রামের মানুষের বহুদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে

ক্রীড়া প্রতিবেদক

মঙ্গলবার , ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ
257

চট্টগ্রামবাসীর জন্য একটা সুইমিংপুল-তা ছিল স্বপ্নের মতো ব্যাপার। ছোট হতে বড়-যে কেউ একটু সাঁতার কাটবে কিংবা সাঁতার শিখবে-সে জন্য কোন সুইমিংপুল ছিল না এখানে। থাকলেও তা ছিল বড় কোন ফাইভ স্টার হোটেলে বা অভিজাত কোন ক্লাবের অধীনে। যেখানে গণ মানুষের যাওয়ার সুযোগ ছিল না। বাধ্য হয়ে তাদের গন্তব্য হতো পুকুর। কিন্তু সেই পুকুরও শহরে কমে গেছে অসম্ভব বাণিজ্যিক চাহিদার কারণে। সুতরাং সাধারণ মানুষের হা হুতাশ করা ছাড়া কোন গত্যন্তর ছিল না। চট্টগ্রামবাসীর সৌভাগ্য একটু দেরিতে হলেও সে স্বপ্নের বাস্তবায়ন হয়েছে। চট্টগ্রামের কিছু উদ্যোগী ব্যক্তিত্বের সাহসী প্রচেষ্টা সে স্বপ্ন বাস্তবে ফলেছে। চট্টগ্রামবাসী দেখতে পেয়েছে তাদের স্বপ্নের সুইমিংপুলকে। সেই স্বপ্ন দেখা সুইমিংপুলের উদ্বোধন আজ। আজ ১০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকাল ১১টায় আউটার স্টেডিয়ামে অবস্থিত নবনির্মিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় সুইমিংপুলের উদ্বোধন করবেন প্রধান অতিথি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো.জাহিদ আহ্‌্‌সান রাসেল এম পি। এই সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ. জ. ম. নাছির উদ্দীন,যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে ১১ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে এই সুইমিংপুল নির্মিত হয়। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের ৩০ জুনে। কিন্তু কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় প্রায় পাঁচ মাস বেশি সময় লেগেছে সুইমিংপুলের নির্মাণ কাজ শেষ হতে। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর এর তদারক ও পরিচালনার দায়িত্ব এখন চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার (সিজেকেএস)। আন্তর্জাতিক মানের এই সুইমিংপুল পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নিয়োগ দেয়া হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারী। সাঁতার প্রশিক্ষণের জন্য দু’জন পুরুষ এবং দু’জন মহিলা প্রশিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করার জন্য পুরোপুরি তৈরি এখন এই সুইমিংপুল। উদ্বোধনের পরপরই এর কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সুইমিংপুলকে ঘিরে চট্টগ্রামবাসীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের নেপথ্যে অন্যতম কারিগর ছিলেন চট্টগ্রামের সিটি মেয়র এবং সিজেকেএস সাধারণ সম্পাদক আ.জ.ম.নাছির উদ্দীন। সুইমিংপুল উদ্বোধনের আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান চট্টগ্রাম মহানগরীতে এক সময় অনেক পুকুর ছিল। সাঁতার শিখতে পারতো এখানকার ছেলেমেয়েরা। সময়ের বিবর্তনে পুকুরগুলো ভরাট করে সেখানে গড়ে উঠেছে স্থাপনা। এতে করে পুকুর গেছে কমে,সেখানে যে সাঁতার শিক্ষাটা হতো তা আর হচ্ছে না। ফলে সাঁতারের মতো দরকারি জিনিষটা আর শেখা হয়ে উঠছে না বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের। এর ফলটা হচ্ছে প্রতি বছর ঈদ-পূজা পার্বণে এসব ছেলে মেয়েরা যখন গ্রামের বাড়ীতে যায় সেখানে পুকুরে নেমে হারিয়ে যায়। মৃত্যুবরণ করে তারা। আবার যারা ক্রীড়াবিদ আছেন তাদের জন্য সাঁতারটা একান্ত প্রয়োজনীয়, অত্যাবশ্যক। দেখা যায় স্টেডিয়ামে খেলছে এমন অনেক ক্রীড়াবিদ আছেন তার হয়তো টেকনিক ভালো কিন্তু ফিজিক্যাল ফিটনেস নেই। প্রতিভা আছে পারফর্ম করতে পারছে না। এসব ক্রীড়াবিদদের জন্য সাঁতার সর্বোত্তম ব্যায়াম। ফিজিক্যাল ফিটনেসের জন্য তাদের খুবই প্রয়োজন এই সাঁতার। সাঁতারের এতসব প্রয়োজনীয়তা লক্ষ্য করে আমি সিজেকেএস এর পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করি। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রী তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে চট্টগ্রামে সাঁতারের প্রয়োজনীয়তার কথা অবহিত করেছিলাম। তবে সুইমিংপুল স্থাপন নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিভিন্ন জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে যে সব সুইমিংপুল গড়ে দিয়েছিল তা অনেক জায়গাতেই এখন কার্যকর নেই। এটা রক্ষণাবেক্ষণ করা বেশ ব্যয় সাপেক্ষ। ফলে দেখা গেছে অনেকস্থানেই সুইমিংপুলগুলো শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। এগুলো ঠিকমতো পরিচালনা করা হয়নি। এটা একটা চ্যালেঞ্জের মতো,তাতে ব্যর্থ হয়েছে সেইসব ক্রীড়া সংস্থা। ফলে নতুন করে সুইমিংপুল গড়ার পক্ষপাতি ছিলেন না অনেকেই। তবে দু’বছর আগে মন্ত্রী,সচিব পর্যায়ে এখানকার অবস্থানটা তুলে ধরতে পেরেছিলাম। ফলে তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রীর এখতিয়ার ছিল ২৫ কোটি টাকা। তিনি সেখান থেকে সাড়ে ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। যা দিয়ে এম এ আজিজ স্টেডিয়াম সংলগ্ন চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার অধীনে অত্যাধুনিক সুইমিংপুল গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। ক্রীড়াবিদদের জন্য চট্টগ্রাম উর্বর জায়গা। তাদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সাঁতার জরুরি। তারা এখন সাঁতার চর্চা করার জন্য বেশি দূর যেতে হবে না এখানেই তা করতে পারবে। সিটি মেয়র হিসেবে নগরবাসীর জন্য দায়বদ্ধতা আছে। সেদিক থেকে চেষ্টা করেছি নগরবাসীর ছেলেমেয়েরা যেন স্বল্প অর্থ খরচ করে সাঁতার শিখতে পারে,দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে পারে। ইতিমধ্যেই সুইমিংপুলকে ঘিরে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। তাতে অস্বচ্ছল, প্রতিবন্ধীদের জন্যও সাঁতার শেখার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিনা অর্থে তাদের সাঁতার শেখানো হবে। আশা করি আমাদের ক্রীড়াবিদসহ নগরবাসী এই সুইমিংপুলকে ভালোভাবে ব্যবহার করে উপকৃত হবেন। সিটি মেয়র এবং সিজেকেএস সম্পাদক আ.জ.ম. নাছির উদ্দীন আরো বলেন সাঁতার কমিটির সভাপতি এ কে এম এহেছানুল হায়দর চৌধুরী (বাবুল) এর নেতৃত্বে সিজেকেএস সাঁতার কমিটি সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা এই সুইমিংপুল পরিচালনায় ইতিমধ্যে সুন্দর একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। এখন এর আলোকে সুন্দরভাবে সুইমিংপুল পরিচালনা করতে হবে। নগরবাসী তাদের সহযোগিতা করবেন। এখন মূলতঃ চট্টগ্রামের এই স্বপ্নের সুইমিংপুল ব্যবহার,তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পুরো নগরবাসীর। তাদেরকে সচেতন থেকে এমন একটা সুইমিংপুল পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের পূর্ণ সহযোগিতা করে যেতে হবে। তাহলেই আমরা সবাই এই সুইমিংপুল থেকে উপকার পাবো। তবে এখন বড় কথা আমরা যদি সফলতার সাথে এই সুইমিংপুল পরিচালনা করতে সমর্থ হই তাহলেই এটা হতে সুফল মিলবে। যা ভোগ করতে পারবেন পুরো নগরবাসী। সুইমিংপুল স্থাপনের শুরুর দিকে কিছু প্রতিকূল অবস্থা ছিল। সিটি মেয়র বলেন কোন কাজ করতে গেলে সমস্যা হতেই পারে। তবে আমি কনফিডেন্ট ছিলাম। কারণ এটা আমার স্বার্থ নয় এটা পুরো নগরবাসীর স্বার্থ। তাই আমরা সবাই মিলেই এটা করতে পেরেছি। সিজেকেএস নির্বাহী সদস্য এবং সাঁতার কমিটির সভাপতি এ.কে.এম এহেছানুল হায়দর চৌধুরী (বাবুল) বলেন সাঁতার জানা সৌখিনতা নয়, নিজের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। সুস্থতার জন্য সাঁতারের মতো শারীরিক ব্যায়াম বেশ সহায়ক। নিজের এলাকা রাউজানের একটি হিসেব দিয়ে এই উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন প্রতিবছর ঈদ-পার্বণে যারা নানার বাড়ীতে যায়, যারা প্রবাসী-এসব ফ্যামিলির অনেক সন্তানই দেখা যায় পুুকুরে মৃত্যুবরণ করে সাঁতার না জানার কারণে। প্রতিবছর এদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০-৩৫ জনের মতো। চট্টগ্রাম শহরে এখন তেমন একটা পুকুর-দীঘি নেই যে আমাদের ছেলেমেয়েরা সাঁতার শিখবে। আবার বড়লোকদের জন্য আছে বড় বড় হোটেল,ক্লাব ইত্যাদির সুইমিংপুল। যা অভিজাত পরিবারের জন্য সীমাবদ্ধ। এক সময় লালদীঘিতে সাঁতার প্রতিযোগিতা হতো। কিন্তু আধুনিক সাঁতারের সুযোগ-সুবিধাগুলো সেখানে নেই। এসবের প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের মানুষের বহুদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে সুইমিংপুল নির্মানের মাধ্যমে। তিনি বলেন এই সুইমিংপুলে ছেলেদের জন্য যেমন সুযোগ আছে মেয়েদের জন্যও তেমন আছে এবং তা পূর্ণ নিরাপত্তার সাথে। এখানে সৌখিন সাঁতারুদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্রীড়াবিদদের জন্য যেমন এই সুইমিংপুল ভূমিকা রাখবে তেমনি গরিব,মেধাবী এবং অসহায়দের জন্য বিনা ফিতে এখানে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন সবার সহযোগিতা ছিল বলে এই সুইমিংপুল সিজেকেএস এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সবার সহযোগিতা কাম্য। যেমন সুইমিং করতে আসা সবার পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ব্যবহারকারীদের নিয়ম মেনে চলতে হবে যাতে এই সুইমিংপুলটি আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত না হয়। তিনি দৈনিক আজাদীকেও ধন্যবাদ দেন চট্টগ্রামে সুইমিংপুল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য। দৈনিক আজাদী ইতিমধ্যে তিন-চারটি রিপোর্ট ছাপিয়ে সুইমিংপুল সম্বন্ধে চট্টগ্রামবাসীকে বিস্তারিত অবহিত করেছে।

x