চট্টগ্রামে প্রাচীন জাহাজ নির্মাণ শিল্প

ইয়াসমিন ইউসুফ

রবিবার , ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ২:২০ অপরাহ্ণ
42

পূর্ববঙ্গ গীতিকায় নছর মালুম কাব্যের মতন সাগর পাড়ি দেয়ার গল্প আছে অসংখ্য। প্রায় প্রতিটি গীতিতে জাহাজ না হোক অন্তত নৌকার চমৎকার বয়ান লিখেছেন গ্রাম বাংলার কবিরা। মহাত্মা দীনেশচন্দ্র সেন তার বৃহৎবঙ্গে আমাদের সুলুক দিয়েছেন “লোক কবিতায় বর্ণিত এমন কিছু জাহাজের।’ নামগুলোও বেশ কবিতাসুলভ রাজবল্লভ, রাজহংস, সমুদ্রফেনা, শঙ্খচুড়, উদয়তারা, গঙ্গাপ্রসাদ, দুর্গাবর। সেন মহাশয় লিখেছেন পুরো বাংলায় জাহাজ নির্মাণে খ্যাত ছিল সপ্তগ্রামের। “সপ্তগ্রাম বাঙ্গালার প্রাচীন বন্দর ছিল। এখানে জাহাজ নির্মাণ করা হইত। সমুদ্র যাত্রার প্রাক্কালে সরস্বতী নদী হইতে বণিকেরা মিঠাপানি তুলিয়া নিত। ঐ নদী শুকাইয়া যাওয়ার পর সপ্তগ্রামের ঐশ্বর্য্য হরণ হয়।” এই হল বঙ্গদেশের চাটিগ্রাম বা চট্টগ্রামে জাহাজ নির্মাণের আরম্ভ কথা। সেই থেকে এই চট্টগ্রামের জাহাজ মুগ্ধ করেছে পরিব্রাজক, যাজকসন্ত, ভিনদেশী রাজাসহ অসংখ্য মানুষকে”। দীনেশ চন্দ্র সেন আরও জানান যে “কোষা নামক ডিঙির কথা পল্লী গাঁথায় পাওয়া যায়। ঈশা খাঁর গীতিতে এই কোষার বর্ণনা আছে।জাহাজগুলোতে যেটিতে স্বয়ং সওদাগর থাকিতেন এবং যাহা সুসজ্জিত হইত তাহা মধুকর নামে অভিহিত হইত। আমরা কাব্যগুলোতে জাহাজের বহু নাম পাইয়াছি। তাহার কোন কোনটি বেশ কবিত্বময়, কোন কোন নাম প্রকৃতযুগের, যথাগুয়ারেখী, চিরাঠুটি, বিজু সুজু (বিজয় গুপ্ত)। ইহা পুরাকালে বৃহদাকৃত হইত। তাহাতে সন্দেহ নাই। তখন রাজপুত্রও সওদাগরের পুত্রের মর্যাদা প্রায় তুল্য ছিল। চাঁদ সওদাগর রাজদন্ড কেন ব্যবহার করেন, লঙ্কার রাজা এই প্রশ্ন করিলে তিনি বলিয়াছিলেন, বাঙ্গালা দেশে বণিকেরা রাজার মতই সম্মানিত। সপ্তগ্রাম বাঙ্গালার প্রাচীন বন্দর ছিল। চট্টগ্রাম বঙ্গদেশে প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজে চড়িয়া বাঙালিরা এককালে লঙ্কা, নাক্ষাদ্বীপ, মাটাবাটান প্রভৃতি দেশে যাইতেন। চট্টগ্রাম ও তাম্রলিপ্ত বঙ্গদেশের এই দুই বন্দর বিশ্বশ্রুত। চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর তীরবাসী বালামী নামক এক শ্রেণির লোক জাহাজ নির্মাণ করিত। এখনও বালামীদের বংশধরেরা ছোট জাহাজ নির্মাণ করিয়া থাকে। বালামী নৌকা ইহাদের নামানুসারে পরিচিত।” চীন পরিব্রাজক মাহুন্দের লিখিত বিবরণ থেকে জানা যায়-“একদা তুরস্কের সুলতান আলেকজান্দ্রিয়ার জাহাজ নির্মাণ পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট হইয়া চট্টগ্রাম থেকে অনেকগুলি জাহাজ নির্মাণ করাইয়াছিলেন। ” আরবী লেখক ইদ্রিশ দ্বাদশ শতাব্দীতে চট্টগ্রামের সাথে বাণিজ্য সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন। “তিনি সে দেশের নাম করিয়াছেন কর্ণবুলএই শব্দ কর্ণফুল শব্দের অপভ্রংশ। ১৪০৫ খৃ: অব্দে চীন দেশের মন্ত্রী চেংহো বাণিজ্য সম্বন্ধে কতগুলো প্রশ্নের সমাধানার্থে স্বয়ং চট্টগ্রামে আসিয়াছিলেন এবং ১৮৮৩ খৃষ্টাব্দে সুপ্রসিদ্ধ আরবীয় পর্যটক ইবনেবতুতা চট্টগ্রামের জাহাজে চড়িয়া জাবা এবং চীনে গমন করিয়াছিলেন। ১৫৫৩ খৃষ্টাব্দে পর্তুগীজ নানু ডি চোনা গোয়ার শাসনকর্তা) তার সেনাপতি দি মান্নাকে চট্টগ্রামে তাহাদের একটা বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপনার্থে পাঠাইয়াছিলেন।চট্টগ্রামের অষ্ঠাদশ শতাব্দীর অনেক জাহাজের মালিকদের নাম লোকে বলিয়া থাকেতাহারা জগতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিতেন। মুসলমান রাজত্বের শেষভাগে তাহারা জীবিত ছিলেনরঙ্গ, বসির, মালুম, মদন কেরানি, দাতারাম চৌধুরী প্রভৃতি জাহাজ অধ্যক্ষদের কোন কোন জনের শতাধিক জাহাজ ছিল। ইহারা হার্ম্মাদের অত্যাচারের সময় বৃহৎ নৌ সঙ্ঘ লইয়া অগ্রসর হইতেন। এই শ্রেণিবদ্ধ জাহাজগুলোকে শ্লুপবহর বলা হইত। যিনি হার্মাদদিগকে দমন করিয়া খ্যাতি লাভ করিয়াছেন, তাঁহাকে বহরদার বলা হইত। ঊনবিংশ শতাব্দীর আদিকালেও নাবিকগণের কেহ কেহ জীবিত ছিলেন, পিরু সওদাগর, নসুমালুম, রামমোহন দারোগা প্রভৃতির নাম এখনও শোনা যায়। রামমোহন দারোগার জাহাজ বাণিজ্যদ্রব্য লইয়া স্কটল্যান্ডের টুইট বন্দরে গিয়াছিল। ” অধুনা মাধব, কালী কুমার ও দ্বারকানাথ জাহাজ নির্মাণে খ্যাতি লাভ করিয়াছেন। পল্লীগীতিকাসাহিত্যে নসর মালুম নামক গাঁথায় (পূর্ববঙ্গগীতিকা, ৪র্থ খন্ড, ৪৪ পৃ🙂 জাহাজ ও সমুদ্রযাত্রা সম্বন্ধে অনেক তথ্য লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। মালুমেরা সমুদ্রপথের সমস্ত বিষয় অবগত হইতেন, তাঁহারা দীর্ঘ পর্যটনের প্রাক্কালে মানচিত্র আঁকিয়া লইতেন এবং নক্ষত্র দেখিয়া দিক নির্ণয় করিতে পারিতেন। জাহাজের অংশগুলোর যে নাম চট্টগ্রামে প্রচলিত আছে তাঁর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা গেল : বাক (রিব) মাস্তুুলের চালুতা, (রেক অব দ্য মাস্ট), ইসকা (ব্যাটেন), নুরন্নেহা ও কবর নামক গাথায় (, ৯৩১৩০) নৌসৈন্য লইয়া জাহাজের বহর কিভাবে যুদ্ধ করিতে যাইত তার এক উল্লেখযোগ্য বিবরণী প্রদত্ত হইয়াছে। জানা যায়, মুসলমান ব্যবসায়ীরা ৬ষ্ঠ শতক থেকে ষোল শতক পর্যন্ত সমুদ্রের উপর রাজত্ব করেছিল। আরব থেকে সুলতানেরা এ সময় বাণিজ্য করতে আসতো। ১৪ শতকে এসে বাংলার সুলতানরা শাসন ব্যবস্থাকে একটি স্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে নিয়ে আসে। প্রাচীনকালে পালের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম। সেকালে সরের জাহাজ বলা হতো কাঠের তৈরি জাহাজকে। সর অর্থ পাল। পালবাহী দাঁড়টানা জাহাজগুলো সরের জাহাজ নামে বিখ্যাত ছিল। আরবের সুলতানেরা সে সময় চট্টগ্রামে নৌ বাণিজ্য করতে আসতো। তার প্রভাবে আরবি এবং ফারসি নামে সরের জাহাজের বিভিন্ন অংশের নাম রাখা হতো। যেমন : এরাক, তাড়া, সুকান, বাদাম ও জাহাজ পরিচালনাকারী মালুম, সারাং, কছফ, লস্কর, খালাসি নামে খ্যাত ছিল সরের জাহাজের বিভিন্ন অংশ। এখানে জাহাজ নির্মাণ শিল্প গড়ে উঠার ১টি প্রধান কারণ হলো চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলে লোহাকাঠ, সেগুন ও জারুল জাহাজ নির্মাণের প্রধান উপকরণ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। জাহাজের বহির্গামী পালকে সর বলা হয়। আর নৌকা সাম্পানের অভ্যন্তরীণ পালকে বলা হয় বাদাম। সরের জাহাজ নির্মাণকারী শিল্পীরা যে এলাকায় থাকতো সেটি বালামী পাড়া নামে খ্যাত ছিল। তারা ছিল জাহাজ নির্মাণের সুনিপুন শিল্পী। তাদের কোন অক্ষর জ্ঞান বা একাডেমিক লেখাপড়া ছিল না। বংশানুক্রমে একে অপরের কাছ থেকে জাহাজ নির্মাণের কলা কৌশল শিখে নিত। সেকালে শুলকবহর ও ষোলশহরের গুদীর পাড়ায় জাহাজ নির্মাণ হতো। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মান সরকার চট্টগ্রাম থেকে একখানি সরের জাহাজ নির্মাণ করিয়ে নিয়েছিলেন। জার্মানীতে নেয়ার পর জাহাজখানির নাম দিয়েছিলেন ডয়চল্যান্ড ফ্রিগেট। এক সময় জাহাজটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেলে এটি জার্মানীর ব্রেমাহাফেন শিপ বিল্ডিং মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়েছে। পরবর্তীকালে বিদেশী স্টিম জাহাজের সাথে প্রতিযোগিতায় চট্টগ্রামে নির্মিত সরের জাহাজ হেরে যায়।

সূত্র : ১। বৃহৎবঙ্গ, দীনেশ চন্দ্র সেন

২। বন্দর শহর চট্টগ্রাম, আবদুল হক চৌধুরী

লেখক : সাংবাদিক

x