চট্টগ্রামে গ্যাসনির্ভর কার্যক্রমে স্থবিরতা

এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রেসারে ধস ।। রান্নার চুলাও জ্বলছে না অনেক এলাকায়

হাসান আকবর

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৪ পূর্বাহ্ণ
167

চাহিদার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি গ্যাসের অভাবে চট্টগ্রামে গ্যাস নির্ভর কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রেসারে ধস নেমেছে। এতে করে রান্নার চুলাও জ্বলছে না বিভিন্ন এলাকায়। এদিকে সামনের কৃষি মৌসুমকে সামনে রেখে কাফকো এবং সিইউএফএল একই সাথে উৎপাদনে গেছে। ফলে আমদানিকৃত এলএনজির একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে সার উৎপাদনে। ফেব্রুয়ারিতে এলএনজি নিয়ে নতুন জাহাজ না আসা পর্যন্ত রেশনিং করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। এখানে গ্যাস দেয়া হচ্ছে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কম। এরমধ্যে আমদানিকৃত এলএনজি রয়েছে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। বাকিটুকু ন্যাশনাল গ্রিড থেকে দেয়া হয়। এই গ্যাসের প্রায় অর্ধেকই চলে যাচ্ছে দুটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র- কাফকো ও সিইউএফএলে এবং কর্ণফুলী পেপার মিলে। কাফকো এবং সিইউএফএল ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার করে সার উৎপাদন করে।
এছাড়া রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিকলবাহা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কর্ণফুলী পেপার মিলে একশ’ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি গ্যাস পোড়াতে হয়। হাতে থাকা বাকি একশ’ মিলিয়নেরও কম গ্যাস দিয়ে চট্টগ্রামের শিল্পখাত, বানিজ্যিক খাত, ৬০টিরও বেশি সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, ছয় লাখেরও বেশি আবাসিক গ্রাহকের গ্যাসের যোগান দিতে হচ্ছে। এতে করে গ্যাসের স্বাভাবিক প্রেসার অত্যন্ত কমে গেছে। প্রয়োজনীয় গ্যাসের সংস্থান করাটা কঠিন হয়ে উঠছে।
গ্যাসের প্রেসার ২০০ বার-এর কমে গেলে প্রবাহ কমে যায়। পুরো চট্টগ্রাম জুড়ে এখন প্রবাহে সংকট চলছে। এতে করে সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনগুলোতে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসার না থাকায় কোন কোন সিএনজি স্টেশনে গ্যাসই থাকছে না। কোন কোনটিতে থাকলেও প্রেসার কম থাকায় গাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাস ঢুকছে না। ফলে কমে গেছে গাড়ির মাইলেজ। আগে যে গ্যাস দিয়ে কোন গাড়ি ১২০ কিলোমিটার চলতে পারতো এখন তা ৮০/৯০ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।
মোহাম্মদ ফোরকান নামের একজন সিএনজি চালক দামপাড়াস্থ সিটি কর্পোরেশনের সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে দৈনিক আজাদীকে বলেন, গাড়ির গ্যাস দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। গ্যাস ভরছে কম। এতে করে দফায় দফায় গ্যাস স্টেশনে গিয়ে লাইন ধরতে হচ্ছে। আবার বিকেল তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন বন্ধ থাকায় গ্যাস নেয়া সম্ভব হয় না। ফলে অসহায়ভাবে বসে থাকা ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকছে না।
এদিকে গ্যাসের প্রেসার কম থাকায় চুলা জ্বলছে না নগরীর বহু এলাকায়। ভোর থেকে সকাল এগারটা বারোটা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না অনেক এলাকায়। ফলে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে গ্যাস নির্ভর সব কাজই বন্ধ থাকে। নগরীর ইপিজেড এবং হালিশহরের মতো ঘনবসতি এলাকায় গ্যাসের অভাব চরম আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন পোষাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক ভোরে উঠে রান্না করেন। কিন্তু ভোর থেকে দুপুর চুলা না জ্বলায় তারা পড়েছেন সমস্যায়। ফলে অনেকেরই জীবনধারা পাল্টাতে হচ্ছে। রাতের রান্না করা খাবার পরদিন দুপুরেও খেতে হচ্ছে। শুধু পোষাক শিল্পের শ্রমিক কর্মচারীই নয়, ইপিজেড হালিশহর এলাকার মতো নগরীর বাকলিয়া, পাথরঘাটা, ঘাটফরহাদাবেগ, খুলশী, নাসিরাবাদ, মুরাদপুর, লালখানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। শীতের দিনে গ্যাসের অভাবে গ্যাস নির্ভর নানা কাজই ব্যাহত হচ্ছে। শীতে শিশু, বয়ষ্ক এবং অসুস্থ মানুষদের একটু গরম পানিতে গোসল করানোসহ প্রাত্যহিক অতি প্রয়োজনীয় কাজও সারা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন অনেকেই। হালিশহর এলাকার মোহাম্মদ কামাল উদ্দীন আহমেদ গতকাল দৈনিক আজাদীকে বলেন, গ্যাস নিয়ে বহু কথা বলা হয়েছিল। এলএনজি আসলে আর কোন সংকট থাকবে না বলেও আমাদের শোনানো হয়েছিল। অথচ এখন কি হচ্ছে!!
চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে আছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রানাধীন এই কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেছেন, এলএনজি নিয়ে বেশ সংকট চলছে। এলএনজি রেশনিং করতে হচ্ছে। কাতার থেকে প্রয়োজনীয় এলএনজি না আসা পর্যন্ত এই সংকট চলবে। তবে শীতের সময় গ্যাসের প্রবাহে কিছুটা সমস্যা হয়। শীত চলে গেলে সংকট এত থাকবে না। আগামী জুনের আগে এলএনজি সংকট ঘোচার কোন সম্ভাবনা নেই বলে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ওমান এখন এলএনজি দিতে পারছে না। শুধু কাতার থেকে এখন এলএনজি আসছে। ইতোমধ্যে তিন জাহাজ এলএনজি শেষ হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে চতুর্থ জাহাজটি আসার কথা রয়েছে। ওই জাহাজটি আসলে এলএনজি সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো যাবে। তবে দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএলজি পেতে আগামী জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।
কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খায়ের আহমদ মজুমদার বলেন, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না থাকায় প্রেসার কিছুটা কমেছে। এতে কোন কোন এলাকায় সামান্য সমস্যা হচ্ছে। আমাদের প্রকৌশলীরা চেষ্টা করছেন প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

x