চট্টগ্রামে আবাসন শিল্পের একাল সেকাল

তানভীর শাহরিয়ার রিমন

রবিবার , ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:২৩ পূর্বাহ্ণ
114

সেই কবে কোন কালে অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতির যাত্রা শুরু হয় তার স্বচ্ছ কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি এখনো। তবে এটুকু জানা গেছে, আজকের সংস্কৃতির সাথে এর গোড়াপত্তনের মিল নেই একদম। আজকের অ্যাপার্টমেন্ট মানেই বিলাসী অনুভব। নিতান্ত আশ্রয়ের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছে তা আধুনিক জীবন ধারার ট্রেডমার্ক। যার শহরের বুকে আপন বাড়ি আছে সেও কিনছে অ্যাপার্টমেন্ট। কেউ কেউ কিনছেন একাধিক।
অথচ বিস্ময়কর হল এক সময় ইউএসএ তে অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল তাদের জন্য যারা সমাজের অংশ নয়। অর্থাৎ এপার্ট (বিচ্ছিন্ন) ফ্রম সোসাইটি। ওখানে বেশ কিছু ওয়াক আপ (হেঁটে ওঠা) অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প তৈরি হয়। সেখানে এখনকার মত লিফটের ব্যবস্থা ছিল না, ছিল না জেনারেটর কিংবা সাবস্টেশনের সুবিধা। তারপর সময়ের বিবর্তনে মানুষ কমিউনিটি লিভিংয়ে অভ্যস্ত হয়েছে। সেই সাথে আস্তে আস্তে অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে গেছে তাদের জন্য যারা পার্ট (অংশ) অব দি সোসাইটি। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন। সেই সাথে বদলে গেছে অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে মানুষের ভ্রান্ত ধারণাও।
চট্টগ্রামে অ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসার সূচনাটা আইডিয়েল হোমের হাত ধরে। পূর্ব নাসিরাবাদে আপন নিবাস নামে একটি প্রকল্প দিয়ে ১৯৮৪ সালে চট্টগ্রামে প্রথম কোনো এপার্টমেন্ট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
এরপরই নব্বই দশকের শেষ ভাগে এসে নতুন করে চট্টগ্রামে আবাসন ব্যবসার পালে লাগে সুবাতাস, ইকুইটি এবং সানমারের হাত ধরে। তখনও অবশ্য অনেকেই অ্যাপার্টমেন্ট আর ভাড়া বাসাকে গুলিয়ে ফেলতেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিশেষ এক শ্রেণীর কাছে অ্যাপার্টমেন্ট মানে তখনও মডার্ন স্লাম (বস্তি!)।
আর মধ্যবিত্তরাও অতটা অভ্যস্ত ছিলেন না এ সংস্কৃতির সাথে। আমাদের তখনও খুব বেগ পেতে হত। বর্গফুট কি? ইউটিলিটি কি? ভেন্টিলেশন কি? এসব বোঝাতে রীতিমত ঘাম ঝরত আমাদের। তবু আমরা চেষ্টা চালাতাম নিরলস। একবার এক ভদ্রলোককে ফয়ার বুঝাতে গিয়ে পড়তে হয়েছিল তার ফায়ারে! সময় বদলাতে অবশ্য সময় লাগেনি বেশিদিন।
বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট ডাইরেক্টরিকে (বিডি রেড) এজন্য ধন্যবাদ জানাতে হয়। তারাই প্রথম ২০০২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামে আয়োজন করে আবাসন মেলার। এতে চট্টগ্রামের ডেভেলপারদের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করেন রাজধানীর অনেক স্বনামধন্য ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানও। বিস্ময়করভাবে মেলাটি সফল হলে নিয়ম করে প্রতিবছরই তারা এ মেলাটি আয়োজন করতে থাকেন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত মোট ৫ বছর তারা এটি আয়োজন করেন । ২০০৭ সাল থেকে রিহ্যাব (রিয়েল এস্টেট হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রামে মেলা আয়োজন শুরু করে । আমরাও পেতে থাকি আশ্চর্য সাড়া। প্রথম দিকে যেটা হয়েছে তা হলো মানুষের মাঝে অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতিকে ঘিরে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছে অ্যাপার্টমেন্টও হতে পারে একেকটি স্বতন্ত্র বাড়ি। অ্যাপার্টমেন্টের জানালায়ও নামতে পারে এক ফালি আকাশ। খেলতে পারে নান্দনিক প্রকৃতি। এখানেও থাকে বাচ্চাদের ছোটাছুটির জায়গা। নিরাপত্তায় আর বিলাসিতায় স্বতন্ত্র বাড়িগুলোকেও হার মানায়। কেউ কেউ আবার ডে কেয়ার সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, লন্ড্রি, সেলুন, ব্যাংক বুথ, সুইমিংপুলের সুবিধাও তৈরি করে দিচ্ছেন বড় বড় প্রকল্পে। আর কমিউনিটি হল এবং জিমনেসিয়াম তো থাকছেই। চট্টগ্রামে বেশ ভাল কিছু অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স তৈরি হলো তখন। মানুষ বুঝলো এবং বুঝাল সবাইকে। আস্তে আস্তে তৈরি হল এক বড় শিল্প।
এখন আর এত গভীরে কাউকে বোঝাতে হয় না কিছু। সবাই চান একটা সেরা লোকেশন, উন্নতমান, ডেভেলপারদের বিশ্বস্ততা, সততা ও কমিটমেন্ট। এসব কিছু থাকলে বাজেটে আজকাল অনেকেই এদিক সেদিক করেন ভালো সেবা পাবার আশায়। যারা এসব বিষয় ঠিক রেখে কাজ করতে পেরেছেন তারা ঠিকই পেয়েছেন গ্রাহকদের আস্থা। আর যারা পারেননি তারা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছেন।
প্রকৃতপক্ষে চট্টগ্রামে নব্বই দশকের শেষ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ছিল আবাসন শিল্পের উত্তরণের সময় । বিশেষ করে ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়টা চিহ্নিত হবে এই শিল্পের পয়মন্ত সময় হিসাবে । এসময় চট্টগ্রামভিত্তিক অনেক ডেভলপার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক বড় বড় আবাসন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের রিয়েল এস্টেট শিল্পে বিনিয়োগ করে । ২০০১-২০০২সালে চট্টগ্রামে প্রতি বর্গফুট অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি হয়েছিল ১৫শ’-১৬শ’ টাকা দরে। আর এখন বিক্রি হচ্ছে এলাকাবেধে ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা প্রতি বর্গফুট।
২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আবাসন ব্যবসায় মন্দা দেখা দেয়। এই মন্দাভাব অব্যাহত থাকে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত। ১/১১ পরবর্তী সরকার আমলেও আবাসন ব্যবসার এই কঠিন অবস্থা ছিল না। অবশ্য দেশজুড়ে হরতাল অবরোধ বন্ধ হওয়ার পর আবারও ঘুরে দাঁড়ায় আবাসন শিল্প। এই সময় অনেক ভুঁইফোড় কোম্পানি পালিয়ে যায়, টিকে থাকে প্রকৃত আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো । এসময় অবশ্য মূল্য সংশোধনও ঘটে । এবং জমির দাম অনেকটাই যৌক্তিক পর্যায়ে নেমে আসে ।
আমাদের এ শিল্পটা এখন যে অবস্থায় আছে তাতে অনেক দূর পাড়ি দেবার কথা আমাদের। আমরা অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও মানুষের একটা আপন ঘরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলছি। প্রতিদিনই নির্মাণ সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি হচ্ছে, নানা অজুহাতে। সেই সাথে বাড়ছে ব্যাংক সুদের হারও। আমাদের এ শিল্পের অগ্রগতির স্বার্থে এ সরকার আমাদের বড় সমস্যাগুলো সমাধান করবেন এই বিশ্বাস আমাদের। কারণ ভৌগোলিক অবস্থাগত কারণে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে চট্টগ্রামের গুরুত্ব বাড়ছে। আগামী ১৫ বছরের মধ্যে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি বাণিজ্য কেন্দ্রের মধ্যে চট্টগ্রাম নিজ অবস্থান তৈরি করে নেবে। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। বতর্মান সরকার চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার-মিয়ানমার হয়ে চীনের কুম্বিং পর্যন্ত এশিয়ান হাইওয়েতে যুক্ত হতে যাচ্ছে। দেশে চলমান উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে বিশ্বে উন্নত নগরী হিসেবে দোহা, দুবাই, মাকাটি’র সাথে চট্টগ্রামের তুলনা করবে বিশ্ববাসী। তবে এই ৮/ উন্নয়ন ধরে রাখতে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন ।
চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক বিজনেস হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ইতোমধ্যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ শুরু করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার লেইনের কাজ শেষ হয়েছে। কর্ণফুলীতে বঙ্গবন্ধু টানেল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, কক্সবাজার-ঘুনদুম রেললাইন নির্মাণ শেষ হলে চট্টগ্রামে আসলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হবে।
চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আমরা জানি চট্টগ্রামে আবাসনের সম্ভাবনা কত বেশি। দেশে এখন বিরাজ করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। পাশাপাশি উন্নয়নের সূচক ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আস্থা ফিরে পাচ্ছেন। চীন চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে যাচ্ছে। সরকার মীরসরাইতে গড়ে তুলেছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। এখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান করা হচ্ছে। মহেশখালীতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ হলে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল পাল্টে দেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। কক্সবাজারে গড়ে উঠবে শিল্পাঞ্চল। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
চট্টগ্রামের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করেই সরকার চট্টগ্রামে গড়ে তুলেছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। চট্টগ্রামের এই অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আবাসন শিল্পেও বিনিয়োগ প্রয়োজন ।
বর্তমানে দেশে প্রতিবছর ৩০ হাজার কোটি টাকার টার্নওভার হচ্ছে রিয়েল এস্টেট খাতে। তার প্রায় ২০ শতাংশ হচ্ছে চট্টগ্রামে। আগামী দশ বছরে সেটা বেড়ে যাবে। এতে শুধু চট্টগ্রামে আগামী ১০/১২ বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার লেনদেনের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে রিয়েল এস্টেট খাতে।
এছাড়া বর্তমানে যে সমস্ত আবাসিক ভবন তৈরি হচ্ছে, তার অধিকাংশই দশ-বিশ কাঠা জায়গার মধ্যেই তৈরি হচ্ছে। আগামীতে এর পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়ে তা স্যাটেলাইট টাউনশিপে রূপ নেবে। চট্টগ্রামে যে ধরণের কানেক্টিভিটি তৈরি হচ্ছে, তাতে করে বাণিজ্যিক প্রয়োজনে আগামী দশ বছরে শুধুমাত্র আগ্রাবাদ ও জিইসি মোড়েই ৪০ লাখ বর্গফুট বাণিজ্যিক জায়গার চাহিদা তৈরি হবে। এই চাহিদা পূরণে আমরা ভার্টিক্যালি গ্রো করব । এবং এই সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ ।
লেখক : তানভীর শাহরিয়ার রিমন, সিইও, র‌্যাংকস এফসি প্রোপার্টিস লি.

x